× UCB Sticker Card
শুক্রবার, ০৫ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

ওমর ফারুক

প্রকাশিত: জুন ৫, ২০২৬, ০৫:৫১ এএম

চলে গেলেন মা, দিয়ে গেলেন লজ্জা

ওমর ফারুক

প্রকাশিত: জুন ৫, ২০২৬, ০৫:৫১ এএম

চলে গেলেন মা, দিয়ে গেলেন লজ্জা

একজন মা চলে গেলেন। নিঃশব্দে, নিঃসঙ্গভাবে। পৃথিবীর সমস্ত কোলাহল, ব্যস্ততা, অর্জন আর আত্মপ্রচারের ভিড়ে তার বিদায়টি ছিল এতটাই নীরব যে, মৃত্যুর পরও কয়েকদিন কেউ তা টের পেল না। রাজধানীর মিরপুরের একটি ফ্ল্যাটে পড়ে ছিল তার গলিত মরদেহ। চারপাশে ছিল দেয়াল, দরজা, জানালা, ছিল নগর সভ্যতার অসংখ্য চিহ্ন। শুধু ছিল না মানুষের স্পর্শ, ছিল না সন্তানের খোঁজ, ছিল না কোনো আপনজনের উদ্বিগ্ন ডাক, ‘মা, কি করছো?  তুমি ভালো আছো তো?’

এ যেন এক মৃত্যু নয়, যে সভ্যতার আয়নায় ভেসে ওঠা বিকৃত মুখ।

আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যখন মানুষ মহাকাশে বসতি গড়ার স্বপ্ন দেখে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে ভবিষ্যৎ নির্মাণের কথা বলে, পৃথিবীকে হাতের মুঠোয় এনে ফেলে প্রযুক্তির জাদুতে। অথচ সেই মানুষই নিজের বৃদ্ধ মায়ের নিঃসঙ্গতার খবর রাখে না। একজন মা দিনের পর দিন মরে পড়ে থাকেন, আর আমরা বিস্মিত হওয়ার অভিনয় করি। অথচ সত্য হলো, এই মৃত্যুর বীজ বপন হয়েছে অনেক আগে, যেদিন আমরা সম্পর্কের চেয়ে সাফল্যকে বড় করেছি, দায়িত্বের চেয়ে সুবিধাকে মূল্য দিয়েছি, আর মানবিকতার চেয়ে আত্মকেন্দ্রিকতাকে জীবনদর্শন বানিয়েছি।

নুরজাহান বেগমের মৃত্যুর সংবাদ প্রথমে বুকের ভেতর কষ্ট জমে। কিন্তু একটু পরেই সেই কষ্ট রূপ নেয় লজ্জায়। কারণ তিনি কোনো ভবঘুরে ছিলেন না, সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো মানুষও ছিলেন না। তার সন্তানরা শিক্ষিত, প্রতিষ্ঠিত, সম্মানজনক পেশায় নিয়োজিত। সমাজের প্রচলিত সংজ্ঞায় তারা সফল মানুষ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সাফল্যের সংজ্ঞা কি সত্যিই এত সংকীর্ণ?

একজন মানুষ যত বড়ই কর্মকর্তা হন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হন, বড় ব্যবসায়ী হন কিংবা খ্যাতিমান ব্যক্তিত্ব হন না কেন, যদি নিজের মায়ের একাকিত্ব অনুভব করতে না পারেন, তার প্রয়োজন বুঝতে না পারেন, তবে সেই সাফল্যের মূল্য কতটুকু? পদ-পদবি মানুষকে সম্মানিত করতে পারে, কিন্তু মানবিক করে তুলতে পারে না। প্রকৃত শিক্ষা মানুষকে জ্ঞান দেয়, কিন্তু সেই জ্ঞানের আলো যদি মায়ের ঘর পর্যন্ত পৌঁছাতে না পারে, তবে সেই আলোর উজ্জ্বলতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার অধিকার সমাজের আছে।

মায়ের সঙ্গে সন্তানের সম্পর্ক পৃথিবীর সবচেয়ে আদিম, সবচেয়ে নির্মল। একজন মা সন্তানের জন্য নিজের ঘুম, নিজের স্বপ্ন, নিজের যৌবন পর্যন্ত বিসর্জন দেন। সন্তানের সামান্য জ্বরেও তার রাত কেটে যায় নির্ঘুম। সন্তানের হাসিতে তিনি সুখ খুঁজে পান, সন্তানের কান্নায় তার বুক ভেঙে যায়। সেই মা যখন বৃদ্ধ হন, যখন তার হাত কাঁপে, চোখ ঝাপসা হয়ে আসে, হাঁটার গতি কমে যায়, তখন তার সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হয়ে ওঠে একটু খোঁজখবর, একটু সঙ্গ, একটু ভালোবাসা। কিন্তু আধুনিক জীবনের ব্যস্ততায় আমরা সেই সামান্য দায়িত্বটুকুও পালন করতে ভুলে যাচ্ছি।

আজকের নগরজীবন মানুষকে অনেক কিছু দিয়েছে, কিন্তু কেড়ে নিয়েছে সম্পর্কের উষ্ণতা। একই শহরে থেকেও মানুষ একে অপরের থেকে বহু দূরে। একই ছাদের নিচে থেকেও পরিবারগুলো বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো। বৃদ্ধ মা-বাবারা অনেক সময় জীবিত থেকেও অদৃশ্য হয়ে যান। তাদের প্রয়োজনের কথা কেউ জিজ্ঞেস করে না, তাদের নিঃসঙ্গতার কথা কেউ শুনতে চায় না। তারা ধীরে ধীরে পরিবারের কেন্দ্র থেকে প্রান্তে সরে যান, তারপর একসময় প্রান্ত থেকেও হারিয়ে যান।

এই হারিয়ে যাওয়া কেবল একজন মানুষের নয়, একটি সমাজের নৈতিক পরাজয়।

আমরা সন্তানদের বড় মানুষ হওয়ার শিক্ষা দেই। স্বপ্ন দেখি সন্তান ডাক্তার হবে, ইঞ্জিনিয়ার হবে। কিন্তু আমরা কি যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে মানুষ হতে শেখাই? আমরা কি শেখাই, বৃদ্ধ মা-বাবার পাশে দাঁড়ানোও একটি অর্জন? আমরা কি শেখাই, জীবনের সবচেয়ে বড় ডিগ্রি হলো মানবিকতা?

সমাজের প্রতিটি ট্র্যাজেডি আমাদের কিছু প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়। নুরজাহান বেগমের মৃত্যু আমাদের ডেকে বলে ‘আমরা কি সত্যিই উন্নত হচ্ছি, নাকি শুধু আধুনিক হচ্ছি? উন্নয়ন কি শুধু উঁচু ভবন, প্রশস্ত সড়ক আর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নাম? নাকি উন্নয়নের আরেকটি নাম মানুষের প্রতি মানুষের দায়িত্ববোধ?

ধর্মীয় মূল্যবোধের দিক থেকেও এই ঘটনা গভীরভাবে নাড়া দেয়। ইসলাম মা-বাবার মর্যাদাকে এত উচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত করেছে যে, আল্লাহর ইবাদতের পরই পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণের কথা বলা হয়েছে। জান্নাতকে মায়ের পদতলে রাখা হয়েছে। অথচ আমরা এমন এক সমাজে পৌঁছেছি, যেখানে অনেক মা-বাবা জীবনের শেষ প্রান্তে এসে হয়ে যান অবহেলার প্রতীক। ধর্ম, সংস্কৃতি, শিক্ষা, সবকিছুর আলো যেন তাদের দরজার সামনে এসে থেমে যায়।

এই ঘটনায় রাষ্ট্রের ভূমিকাও আলোচনার দাবি রাখে। প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বাড়ছে। একাকী বসবাসকারী বৃদ্ধ-বৃদ্ধার সংখ্যাও বাড়ছে। তাদের নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা ও নিয়মিত তদারকির জন্য আরও কার্যকর সামাজিক ব্যবস্থা প্রয়োজন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনো রাষ্ট্রই পরিবারের শূন্যস্থান পূরণ করতে পারে না। আইন দায়িত্ববোধ তৈরি করতে পারে না, প্রযুক্তি ভালোবাসা দিতে পারে না, প্রতিষ্ঠান মায়ের কপালে সন্তানের হাতের স্পর্শ পৌঁছে দিতে পারে না। সেই দায়িত্ব আমাদেরই।

নুরজাহান বেগম আজ আর নেই। কিন্তু তার নিঃসঙ্গ মৃত্যু আমাদের সামনে একটি নির্মম সত্য উন্মোচন করে দিয়েছেÑ আমরা ক্রমশ এমন এক সমাজে পরিণত হচ্ছি, যেখানে বৃদ্ধদের জন্য জায়গা সংকুচিত হচ্ছে, অথচ বিলাসিতা ও আত্মগৌরবের জন্য জায়গা বাড়ছে। আমরা অর্জনের সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠছি, কিন্তু মানবিকতার মাটিটুকু হারিয়ে ফেলছি।

হয়তো এই মুহূর্তে দেশের কোনো না কোনো প্রান্তে আরেকজন মা একা বসে আছেন। হয়তো তিনি সন্তানের ফোনের অপেক্ষায় আছেন। হয়তো দরজার দিকে তাকিয়ে ভাবছেন, কেউ আসবে। হয়তো তার বুকেও জমে আছে না বলা শত কষ্ট, শত অভিমান। আমরা যদি আজও না বুঝি, তবে আগামী দিনের সংবাদপত্রে আরও অনেক নুরজাহানের গল্প ছাপা হবে।

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!