× UCB Sticker Card
শনিবার, ০৬ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

প্রফেসর ড. মো. আবু তালেব, গবেষক ও কলামিস্ট এবং অধ্যাপক, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশিত: জুন ৬, ২০২৬, ০৬:২৬ এএম

মায়ের নিঃসঙ্গ লাশের কাছে হেরে গেল শিক্ষা

প্রফেসর ড. মো. আবু তালেব, গবেষক ও কলামিস্ট এবং অধ্যাপক, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশিত: জুন ৬, ২০২৬, ০৬:২৬ এএম

মায়ের নিঃসঙ্গ লাশের কাছে হেরে গেল শিক্ষা

একজন মা তার সন্তানের জন্য যা করেন, পৃথিবীর আর কোনো সম্পর্ক তার সমকক্ষ নয়। সন্তানের জন্মের আগে থেকে শুরু করে নিজের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত তিনি সন্তানের সুখ, নিরাপত্তা ও সাফল্যের জন্য নিরলস সংগ্রাম করে যান। কিন্তু সেই মায়ের জীবনের শেষ অধ্যায় যদি হয় নিঃসঙ্গতা, অবহেলা এবং করুণ মৃত্যু, তাহলে প্রশ্ন জাগেÑ আমরা কি সত্যিই শিক্ষিত হচ্ছি, নাকি কেবল সনদধারী মানুষ তৈরি করছি?

সম্প্রতি রাজধানীর একটি বহুতল ভবন থেকে এক প্রবীণ নারীর পচাগলা মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা পুরো দেশকে নাড়া দিয়েছে। তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার প্রকৃত কারণ ও দায় নির্ধারিত হবেÑ এটাই আইনের দাবি। কিন্তু ঘটনাটি আমাদের সামনে যে নির্মম বাস্তবতা তুলে ধরেছে, তা হলো সমাজে প্রবীণ মা-বাবার প্রতি অবহেলার ক্রমবর্ধমান প্রবণতা। যে নারী একদিন সন্তানদের মানুষ করতে নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন, তার শেষ সময় যদি কাটে নিঃসঙ্গতা ও অযতেœ, তাহলে সেই ব্যর্থতা শুধু একটি পরিবারের নয়, সমগ্র সমাজের।

বাংলাদেশে শিক্ষার হার গত কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী দেশের সাক্ষরতার হার বর্তমানে ৭৫ শতাংশেরও বেশি। উচ্চশিক্ষায় শিক্ষার্থীর সংখ্যাও অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি। দেশে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ১৭৫টি। প্রতি বছর হাজার হাজার শিক্ষার্থী দেশ-বিদেশের উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করছেন। কিন্তু একটি মৌলিক প্রশ্ন ক্রমেই জোরালো হচ্ছেÑ এই শিক্ষা কি আমাদের মানবিকতা, নৈতিকতা ও পারিবারিক দায়িত্ববোধ বাড়াচ্ছে?

আজকের সমাজে অনেক সন্তান বড় বড় পদে অধিষ্ঠিত। কেউ আমলা, কেউ অধ্যাপক, কেউ প্রকৌশলী, কেউ আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা। কিন্তু তাদের মধ্যে অনেকেই বৃদ্ধ মা-বাবার প্রতি ন্যূনতম দায়িত্ব পালন করছেন নাÑ এমন অভিযোগ সমাজে ক্রমশ বাড়ছে। অর্থনৈতিক সাফল্য অর্জন করলেও মানবিক মূল্যবোধে পিছিয়ে পড়ার এই প্রবণতা উদ্বেগজনক।

জাতিসংঘের জনসংখ্যা তহবিল এবং বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ৬০ বছর ও তদূর্ধ্ব মানুষের সংখ্যা ইতোমধ্যে দেড় কোটির বেশি। ২০৫০ সালের মধ্যে এই সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি হতে পারে। অর্থাৎ বাংলাদেশের জনসংখ্যা দ্রুত বার্ধক্যের দিকে এগোচ্ছে। ফলে প্রবীণদের নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা, মানসিক সুস্থতা এবং পারিবারিক সহায়তার প্রশ্ন আগামী দিনের অন্যতম বড় সামাজিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠবে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বব্যাপী প্রতি ৬ জন প্রবীণের মধ্যে অন্তত ১ জন কোনো না কোনো ধরনের অবহেলা, মানসিক নির্যাতন বা আর্থিক শোষণের শিকার হন। বাস্তবে এই সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে, কারণ অধিকাংশ প্রবীণ নিজেদের সন্তান বা পরিবারের বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে চান না। বাংলাদেশেও একই প্রবণতা বিদ্যমান। বহু প্রবীণ বাবা-মা সন্তানদের কাছে অবহেলিত হলেও সামাজিক লজ্জা কিংবা পারিবারিক সম্পর্কের কথা চিন্তা করে নীরবে কষ্ট সহ্য করেন।

একসময় আমাদের সমাজে যৌথ পরিবার ছিল প্রবীণদের নিরাপত্তার প্রধান আশ্রয়। দাদা-দাদি, নানা-নানি, বাবা-মা ও সন্তানরা একসঙ্গে বসবাস করতেন। পারিবারিক বন্ধন ছিল দৃঢ়। কিন্তু নগরায়ণ, কর্মসংস্থানের পরিবর্তন, বিদেশমুখী জীবনধারা এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক সংস্কৃতির প্রভাবে সেই কাঠামো দ্রুত ভেঙে পড়ছে। এখন অনেক প্রবীণ মানুষ একই শহরে সন্তানদের থাকার পরও একাকিত্বে ভোগেন।

সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় হলো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমরা প্রায়ই মা-বাবার প্রতি ভালোবাসার বাহারি প্রদর্শন দেখি। মা দিবস এলে অসংখ্য আবেগঘন পোস্ট, ছবি ও স্মৃতিচারণায় ভরে যায় ফেসবুকের টাইমলাইন। কিন্তু বাস্তব জীবনে কতজন সন্তান প্রতিদিন মায়ের খবর নেন? কতজন নিশ্চিত করেন যে তার মা-বাবা নিরাপদ, সুস্থ এবং সম্মানজনক পরিবেশে আছেন? সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত আবেগ আর বাস্তব জীবনের দায়িত্বের মধ্যে যে ব্যবধান তৈরি হয়েছে, সেটিই আজকের সমাজের অন্যতম বড় সংকট।

বাংলাদেশে আইন প্রণয়ন করা হয়েছে বাবা-মায়ের অধিকার নিশ্চিত করার জন্য। এই আইনে সন্তানদের ওপর মা-বাবার ভরণপোষণের দায়িত্ব স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু আইন কখনো সন্তানের হৃদয়ে ভালোবাসা সৃষ্টি করতে পারে না। আইন শাস্তি দিতে পারে, কিন্তু বিবেক জাগিয়ে তুলতে পারে না। তাই সমস্যার মূল সমাধান আইনগত ব্যবস্থার পাশাপাশি নৈতিক ও সামাজিক শিক্ষার পুনর্গঠনে নিহিত।

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় জিপিএ, র‌্যাংকিং, চাকরি ও পেশাগত দক্ষতার ওপর যত গুরুত্ব দেওয়া হয়, মানবিক মূল্যবোধের শিক্ষা ততটা গুরুত্ব পায় না। ফলে আমরা দক্ষ পেশাজীবী তৈরি করছি, কিন্তু সবসময় দায়িত্বশীল মানুষ তৈরি করতে পারছি না। শিক্ষা যদি মানুষকে নিজের মা-বাবার প্রতি দায়িত্ববোধ না শেখায়, তবে সেই শিক্ষা অসম্পূর্ণ।

প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নৈতিক শিক্ষা, পারিবারিক মূল্যবোধ ও সামাজিক দায়বদ্ধতার বিষয়গুলোকে আরও গুরুত্ব দিতে হবে। ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠনগুলোকেও প্রবীণদের সম্মান ও যতেœর বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়াতে ভূমিকা রাখতে হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় সরকার, সমাজকল্যাণ বিভাগ এবং কমিউনিটি পর্যায়ে একাকী প্রবীণদের খোঁজখবর নেওয়ার কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।

একটি সভ্য সমাজের পরিচয় তার আকাশচুম্বী ভবন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বা প্রযুক্তিগত অগ্রগতিতে নয়; বরং সে সমাজ তার সবচেয়ে দুর্বল ও নির্ভরশীল মানুষদের কতটা মর্যাদা দেয়, তার মধ্যে নিহিত। প্রবীণ মা-বাবারা সেই শ্রেণির মানুষ, যাদের প্রতি আমাদের দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি।

‘মায়ের নিঃসঙ্গ লাশের কাছে হেরে গেল শিক্ষা’Ñ এই শিরোনাম কেবল একটি ঘটনার প্রতিফলন নয়, বরং আমাদের সময়ের এক গভীর সামাজিক ব্যর্থতার প্রতীক। যদি একজন মা জীবনের শেষ সময়ে অবহেলা, একাকিত্ব ও অযতেœর শিকার হন, তাহলে তার সন্তানের ডিগ্রি, পদমর্যাদা বা সামাজিক অবস্থান কোনো গৌরবের বিষয় হতে পারে না। কারণ উচ্চ শিক্ষা মানুষকে বড় চাকরি দিতে পারে, কিন্তু মহান করে তোলে মানবিকতা, দায়িত্ববোধ এবং কৃতজ্ঞতা।

আজ সময় এসেছে নিজেদের কাছে প্রশ্ন রাখারÑ আমরা কি সত্যিই শিক্ষিত হচ্ছি, নাকি শুধু সনদ সংগ্রহ করছি? কারণ যে শিক্ষা মায়ের মুখে হাসি ফোটাতে পারে না, যে শিক্ষা বৃদ্ধ বাবা-মায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না, সেই শিক্ষা শেষ পর্যন্ত এক নিঃসঙ্গ লাশের কাছেই পরাজিত হয়।

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!