বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে সাম্প্রতিক সময়ে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) কর্তৃক কথিত ‘পুশ ইন’-এর একের পর এক প্রচেষ্টা উদ্বেগজনক। বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় নারী, পুরুষ ও শিশুসহ বহু মানুষকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা শুধু দুই দেশের মধ্যকার বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় সমঝোতার পরিপন্থি নয়, বরং আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের মৌলিক নীতিরও সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, এসব ঘটনায় বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবিকে প্রায় প্রতিদিনই সতর্ক অবস্থানে থেকে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
এখানে প্রথমেই বিজিবির পেশাদারিত্ব ও দায়িত্বশীলতা প্রশংসাপ্রাপ্য। সীমান্তে একাধিক পয়েন্টে দ্রুত প্রতিক্রিয়া, গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি, স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে প্রতিরোধ গড়ে তোলা এবং কোনো ধরনের উসকানিতে না জড়িয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা নিঃসন্দেহে একটি বড় সাফল্য। দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রশ্নে বিজিবি যে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছে, তা প্রশংসার দাবিদার। একই সঙ্গে কোস্ট গার্ডসহ অন্যান্য বাহিনীর সতর্ক তৎপরতাও জাতীয় নিরাপত্তাব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করেছে।
তবে বিষয়টি কেবল সীমান্ত নিরাপত্তার নয়, এর পেছনে রয়েছে বৃহত্তর রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বাস্তবতা। ভারতে নির্বাচনের সময় কিংবা রাজনৈতিক মেরুকরণের মুহূর্তে ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ ইস্যু নতুন নয়। দীর্ঘদিন ধরেই এই ইস্যুকে ভোটের রাজনীতিতে ব্যবহার করা হচ্ছে। কোনো ব্যক্তির প্রকৃত নাগরিকত্ব যাচাই ছাড়া তাকে বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা নিঃসন্দেহে একটি দায়িত্বজ্ঞানহীন পদক্ষেপ। এটি সমস্যার সমাধান নয়, বরং নতুন সংকট সৃষ্টি করে।
ভারতের মনে রাখা উচিত হবে যে, আন্তর্জাতিক সীমান্ত কোনো একতরফা সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্র নয়। যদি কোনো ব্যক্তি বাংলাদেশি নাগরিক হয়ে থাকেন, তবে তার পরিচয় যাচাই, প্রয়োজনীয় নথিপত্র বিনিময় এবং উভয় দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সম্মতির ভিত্তিতেই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে হবে। এটাই আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পদ্ধতি। রাতের অন্ধকারে কিংবা সীমান্তের শূন্যরেখায় মানুষ ফেলে রেখে দায় এড়ানোর চেষ্টা সভ্য রাষ্ট্রের আচরণ হতে পারে না।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, এই ধরনের পুশ ইন প্রচেষ্টার শিকার হচ্ছেন নারী ও শিশুরাও। তারা দিনের পর দিন শূন্যরেখায় অনিশ্চয়তার মধ্যে মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছেন। মানবাধিকারের প্রশ্নে এটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। সীমান্ত রাজনীতির বলি হয়ে সাধারণ মানুষের জীবন বিপন্ন হওয়া উচিত নয়।
বাংলাদেশ সরকারের কূটনৈতিক তৎপরতা এরই মধ্যে শুরু হয়েছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে আরও সক্রিয় ও দৃশ্যমান উদ্যোগ প্রয়োজন। বিজিবি-বিএসএফের নিয়মিত পতাকা বৈঠক, যৌথ সীমান্ত ব্যবস্থাপনা কমিটির কার্যকর ভূমিকা এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জোরদার করতে হবে। প্রয়োজনে বিষয়টি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ফোরামেও তুলে ধরা যেতে পারে। কারণ সীমান্ত ব্যবস্থাপনার প্রশ্নে একতরফা আচরণ ভবিষ্যতে আরও বড় অস্থিরতার জন্ম দিতে পারে।
একই সঙ্গে সীমান্ত এলাকায় আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, তথ্য বিনিময় ব্যবস্থা এবং নাগরিকত্ব যাচাইয়ের যৌথ প্রক্রিয়া শক্তিশালী করা জরুরি। এতে ভুল বোঝাবুঝি কমবে এবং অবৈধ অনুপ্রবেশ ও মানবপাচারের মতো অপরাধও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।
বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক ইতিহাস, ভূগোল ও পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে। সেই সম্পর্ককে টেকসই ও সম্মানজনক রাখতে হলে উভয় দেশকেই আন্তর্জাতিক আইন, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং মানবিক মূল্যবোধের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ থাকতে হবে। সীমান্তে মানুষ ঠেলে দেওয়া কোনো সমাধান নয়, সমাধান হলো স্বচ্ছতা, সংলাপ এবং আইনের শাসন।
আমরা আশা করি, ভারত এই বাস্তবতা অনুধাবন করবে এবং সীমান্তকে সংঘাতের নয়, সহযোগিতার ক্ষেত্র হিসেবে গড়ে তুলতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে। আর বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বিজিবির সতর্কতা, পেশাদারিত্ব ও দৃঢ় অবস্থান অব্যাহত থাকবে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন