ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন, ২০২৬

সম্পাদকীয়

হাম ও ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে প্রস্তুতি জোরদার হোক

রূপালী ডেস্ক
প্রকাশিত: জুন ১৮, ২০২৬, ০৬:০৭ এএম

একটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন, অর্থনীতি কিংবা অবকাঠামোগত অগ্রগতির চেয়েও বড় পরিচয় তার নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সক্ষমতা। আর সেই নিরাপত্তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলোÑ শিশুদের জীবন রক্ষা। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। মাত্র তিন মাসে হামের উপসর্গ ও সংক্রমণে ৬৫৭ শিশুর মৃত্যু এবং ৭২ হাজারের বেশি শিশুর আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা শুধু একটি স্বাস্থ্য সংকট নয়, এটি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার কার্যকারিতা নিয়েও বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।

হাম এমন কোনো নতুন রোগ নয়, যার প্রতিরোধ বা চিকিৎসা পদ্ধতি বিশ্বের অজানা। বহু দেশ কার্যকর টিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমে এই রোগকে প্রায় নির্মূল পর্যায়ে নিয়ে গেছে। বাংলাদেশও একসময় সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) সাফল্যের জন্য আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছিল। তাহলে আজ কেন আবার হাজার হাজার শিশু আক্রান্ত হচ্ছে? কেন শত শত শিশুর প্রাণ ঝরে যাচ্ছে? সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, টিকাদান কর্মসূচি চলমান থাকার পরও কেন সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমছে না?

সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে যে, গত কয়েক বছরে হাম-রুবেলার বিশেষ টিকাদান কার্যক্রমে বড় ধরনের ঘাটতি ছিল। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য খাতে দীর্ঘদিন কার্যকর অপারেশন প্ল্যান না থাকা, টিকা সংগ্রহে সিদ্ধান্তগত জটিলতা এবং পরিকল্পনার অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। যদি সত্যিই স্বাস্থ্য খাতের নীতিগত শূন্যতা ও সমন্বয়হীনতার কারণে লাখো শিশু টিকার আওতার বাইরে থেকে থাকে, তবে তার দায় কে নেবে? শত শত শিশুর মৃত্যুর দায় কি কেবল পরিসংখ্যানের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকবে?

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, টিকাদান কর্মসূচি শুরু হওয়ার তিন মাস পরও সংক্রমণ প্রত্যাশিত হারে কমছে না। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু টিকা দিলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। কোন এলাকায় কত শিশু টিকার বাইরে রয়ে গেছে, কারা ঝুঁকিতে আছে, কোথায় সংক্রমণের কেন্দ্র গড়ে উঠছে, এসব চিহ্নিত করে বাড়ি বাড়ি গিয়ে শিশুদের টিকার আওতায় আনতে হবে।

একই সঙ্গে চিকিৎসা ব্যবস্থার দুর্বলতাও সামনে চলে এসেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আক্রান্ত শিশুদের দ্রুত আইসোলেশন, অক্সিজেন সহায়তা এবং পুষ্টি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে অনেক মৃত্যু এড়ানো সম্ভব ছিল। কিন্তু বাস্তবে হাসপাতালগুলোতে শয্যা সংকট, রোগীর চাপ এবং দেরিতে চিকিৎসা গ্রহণের কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে। প্রশ্ন হলো, কয়েক মাস ধরে সংক্রমণ বাড়তে থাকার পরও কেন প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি যথাসময়ে নেওয়া গেল না?

এদিকে হামের এই সংকটের মধ্যেই সামনে এসে দাঁড়িয়েছে ডেঙ্গুর হুমকি। বর্ষা পুরোপুরি শুরু হওয়ার আগেই ডেঙ্গুতে মৃত্যুর খবর পাওয়া যাচ্ছে। অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, ডেঙ্গু পরিস্থিতি দ্রুত ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। ফলে স্বাস্থ্য খাত এখন দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জের মুখে। একদিকে হামে শিশুদের মৃত্যুমিছিল, অন্যদিকে ডেঙ্গুর সম্ভাব্য বিস্তার। এমন অবস্থায় বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ নয়, প্রয়োজন সমন্বিত ও জরুরি জাতীয় কর্মপরিকল্পনা।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, তারা ভঙ্গুর স্বাস্থ্যব্যবস্থা পেয়েছে এবং পরিস্থিতি মোকাবিলার চেষ্টা করছে। এই বক্তব্য বাস্তবতার একটি অংশ হতে পারে। কিন্তু জনগণ শেষ পর্যন্ত ফলাফলই দেখতে চায়। তারা জানতে চায়, কেন একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগে শত শত শিশুর মৃত্যু ঘটছে? কেন টিকা কর্মসূচি থাকা সত্ত্বেও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আসছে না? কেন এখনো অনেক পরিবার চিকিৎসা ও সচেতনতার বাইরে রয়ে যাচ্ছে?

হাম ও ডেঙ্গুর বর্তমান পরিস্থিতি স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, শুধু নির্দেশিকা প্রকাশ বা বিচ্ছিন্ন কর্মসূচি যথেষ্ট নয়। শিশুদের জীবন রক্ষায় টিকাদান, চিকিৎসা, সচেতনতা ও মাঠপর্যায়ের তৎপরতাকে সমন্বিত করতে হবে। প্রতিরোধযোগ্য রোগে আর একটি শিশুর মৃত্যুও যেন না ঘটে, সে লক্ষ্যেই সরকারকে দ্রুত, কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে হবে।