রাষ্ট্রের যেসব প্রতিষ্ঠান সরাসরি নাগরিক সেবার সঙ্গে যুক্ত, সেসব প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থা থাকা অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু যখন সেই সেবা পেতে নাগরিককে নিয়মের চেয়ে দালালের ওপর বেশি নির্ভর করতে হয়, তখন শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তিই ক্ষতিগ্রস্ত হয় না, প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে পুরো প্রশাসনিক ব্যবস্থার কার্যকারিতা।
সোমরার রূপালী বাংলাদেশের বিশেষ প্রতিবেদনে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) ঢাকা মেট্রো সার্কেল-৩ (উত্তরা-দিয়াবাড়ি) কার্যালয়কে ঘিরে দালাল চক্রের সক্রিয়তা, অতিরিক্ত অর্থ আদায় এবং ফিটনেস সনদ প্রদানে অনিয়মের যে অভিযোগ উঠেছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, সরকারি নির্ধারিত ফি জমা দিয়েও সাধারণ সেবাগ্রহীতাদের নানা অজুহাতে হয়রানি করা হচ্ছে। ফাইল বারবার ফেরত দেওয়া, অকারণে বিলম্ব ঘটানো কিংবা অপ্রয়োজনীয় জটিলতা সৃষ্টি করার মাধ্যমে অনেককে কার্যত দালালের কাছে যেতে বাধ্য করা হচ্ছে। অথচ অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধ করলে একই কাজ কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সম্পন্ন হয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। যদি এমন চিত্র বাস্তবে হয়ে থাকে, তবে এটি নিছক প্রশাসনিক দুর্বলতা নয়, এটি রাষ্ট্রীয় সেবাকে জিম্মি করে গড়ে ওঠা একটি দুর্নীতির কাঠামোরই বহির্প্রকাশ।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, অর্থের বিনিময়ে যান্ত্রিক ত্রুটিযুক্ত বা অনুপযুক্ত যানবাহনও ফিটনেস সনদ পাচ্ছে, এমন অভিযোগও রয়েছে। একটি ফিটনেস সনদ কেবল কাগজের আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি সড়কে চলাচলকারী একটি যানবাহনের নিরাপত্তার সরকারি স্বীকৃতি। যদি সেই সনদ অর্থের বিনিময়ে দেওয়া হয়, তাহলে তা শুধু আইন লঙ্ঘন নয়, সরাসরি মানুষের জীবন নিয়ে খেলা। দেশে সড়ক দুর্ঘটনা এমনিতেই ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। সেখানে অযোগ্য যানবাহনকে বৈধতার সনদ দেওয়া দুর্ঘটনার ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
দুঃখজনক হলেও সত্য, বিআরটিএকে ঘিরে দালাল ও ঘুষের অভিযোগ নতুন নয়। বছরের পর বছর ধরে বিভিন্ন গণশুনানি, অনুসন্ধানী প্রতিবেদন এবং গণমাধ্যমে একই ধরনের অভিযোগ উঠে এসেছে। কিন্তু বিচ্ছিন্ন কিছু অভিযান বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা ছাড়া সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়নি।
দালাল কখনো একা শক্তিশালী হয়ে ওঠে না। কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠানের ভেতরের অসাধু ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ সহযোগিতা ছাড়া দিনের পর দিন প্রকাশ্যে দালালদের এমন তৎপরতা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। তাই শুধু দালাল ধরার অভিযান চালালেই হবে না, তাদের পেছনের প্রভাবশালী ব্যক্তি, দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং অর্থ লেনদেনের পুরো নেটওয়ার্ক চিহ্নিত করে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। অন্যথায় দালাল বদলাবে, কিন্তু দালালির সংস্কৃতি থেকে যাবে।
পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর সেবাব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। আবেদন থেকে শুরু করে পরিদর্শন, অনুমোদন ও সনদ প্রদান পর্যন্ত প্রতিটি ধাপ ডিজিটালভাবে পর্যবেক্ষণের আওতায় আনতে হবে। পরিদর্শন কার্যক্রমে সিসিটিভি, ভিডিও রেকর্ডিং এবং স্বয়ংক্রিয় তথ্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা থাকলে অনিয়মের সুযোগ অনেকটাই কমে আসবে। সরকারি অফিসে নাগরিকের প্রথম ভরসা হওয়া উচিত আইন ও নিয়ম, কোনো দালাল নয়। যে রাষ্ট্র ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠনের কথা বলে, সেই রাষ্ট্রে সরকারি সেবা পেতে যদি এখনো দালালের শরণাপন্ন হতে হয়, তবে সেটি উন্নয়নের দাবিকে প্রশ্নের মুখে ফেলে।
আমরা আশা করব, সরকার বিআরটিএকে ঘিরে ওঠা এসব অভিযোগকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের ব্যবস্থা করবে। সেই সঙ্গে দালালচক্র ও তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি সরকারি সেবা যেন কোনোভাবেই দালালের মাধ্যমে নয়, নিয়ম ও আইনের ভিত্তিতেই নিশ্চিত হয়, এটা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয় সকল উদ্যোগ গ্রহণ করবে। কেননা, দালালমুক্ত বিআরটিএ শুধু সুশাসনের প্রতীকই নয়, নিরাপদ সড়ক ও জনস্বার্থ রক্ষারও অন্যতম পূর্বশর্ত।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন