বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বের হাওর অঞ্চল তার ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের কারণে যেমন অনন্য, তেমনি ঝুঁকিপূর্ণ; বছরের একটি বড় সময়জুড়ে বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে নিমজ্জিত থাকে আর শুষ্ক মৌসুমে সেই জমিই হয়ে ওঠে দেশের অন্যতম ধানভান্ডার। নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ জেলার হাওর অঞ্চল জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও এখানকার কৃষকের জীবন অনিশ্চয়তায় ঘেরা। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, বাজার ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং অর্থনৈতিক শোষণের নানা চক্র মিলিয়ে হাওরের কৃষক প্রতিনিয়ত বঞ্চনার শিকার হচ্ছেন। হাওর অঞ্চলের জলা জীবনের এমন বাস্তবতায় কৃষক সুরক্ষার একটি কার্যকর ও টেকসই সমাধান হিসেবে কৃষক সমবায়ভিত্তিক পোস্ট-হারভেস্ট হাব গড়ে তোলা জরুরি হয়ে উঠেছে।
হাওরের ভৌগোলিক অবস্থানই কৃষির জন্য একদিকে আশীর্বাদ, অন্যদিকে অভিশাপ। বর্ষা মৌসুমে যখন পুরো এলাকা সাগরের মতো হয়ে যায়, তখন যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েÑ এক একটি গ্রামকে মনে হয় বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। শুষ্ক মৌসুমে কৃষকরা প্রাণপণ পরিশ্রম করে বোরো ধান উৎপাদন করেন কিন্তু ফসল ঘরে তোলার আগেই অকাল বন্যা এসে, প্রায় বছর সেই স্বপ্ন ভেঙে দেয়। অনেক বেশি খরচে, অনেক ক্ষেত্রে ফসল কাটা গেলেও দ্রুত শুকানো, সংরক্ষণ এবং বাজারজাত করার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় কৃষক বাধ্য হন কম দামে ফসল বিক্রি করতে, যা এবারের আগাম বন্যায় ভয়াবহভাবে কৃষকে পথে বসিয়েছে, হাওড় অঞ্চলের কৃষকের এই অবস্থা থেকে আগামী দিনে সুরক্ষা দিতে, আধুনিক পোস্ট-হারভেস্ট ব্যবস্থাপনা না থাকাটা একটি বড় দুর্বলতা হিসেবে দেখা দেয়।
হাওর অঞ্চলে বাঁধ নির্মাণ বহু বছর ধরে একটি আলোচিত বিষয়; অপরিকল্পিত বা দুর্বল বাঁধ প্রায়ই ভেঙে যায়, ফলে হঠাৎ বন্যায় ফসল তলিয়ে যায়। বাঁধ রক্ষণাবেক্ষণে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাব কৃষকের দুর্ভোগ আরও বাড়ায়। একইসঙ্গে, রাস্তা ও পরিবহন ব্যবস্থার দুর্বলতা কৃষিপণ্যের বাজারজাতকরণকে ব্যাহত করে। অনেক এলাকায় এখনো পর্যাপ্ত সড়ক যোগাযোগ নেই, নৌপথই প্রধান ভরসা। বিদ্যুৎ সরবরাহ অনিয়মিত হওয়ায় আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি বা সংরক্ষণ প্রযুক্তি ব্যবহার করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে কৃষক প্রযুক্তিগত সুবিধা থেকে বঞ্চিত থাকেন।
কৃষি অর্থায়নের ক্ষেত্রেও হাওরের কৃষকরা নানা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হন; প্রাতিষ্ঠানিক কৃষিঋণ অনেক সময় সহজলভ্য নয় অথবা প্রক্রিয়াগত জটিলতার কারণে কৃষকরা তা নিতে পারেন না। এমন অব্যবস্থার সুযোগে দাদন ও মহাজনি ঋণের ফাঁদে পড়ে যান অনেক কৃষক। উচ্চ সুদের এই ঋণ তাদেরকে একধরনের ঋণনির্ভর দাসত্বের মধ্যে আটকে ফেলে। ফসল তোলার আগেই নির্ধারিত দামে পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য হওয়ায় তারা বাজারের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হন। বর্গাচাষিরা আরও বেশি ঝুঁকিতে থাকেন, কারণ জমির মালিকানা না থাকায় তারা কোনো ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা পান না অথচ উৎপাদনের পুরো ঝুঁকিটা তাদেরই বহন করতে হয়।
উৎপাদন পর্যায়েও নানা সমস্যা রয়েছে; সার ও কীটনাশকের সঠিক ব্যবহার সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান না থাকায় অনেক সময় উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়, আবার পরিবেশ ও স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। নকল বা নি¤œমানের কৃষি উপকরণও কৃষকদের ক্ষতির একটি বড় কারণ এসব সমস্যা সমাধানে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ, যেখানে উৎপাদন থেকে শুরু করে সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণ পর্যন্ত একটি সম্পূর্ণ ভ্যালু চেইনকে শক্তিশালী করা হবে।
হাওর অঞ্চলের কৃষকের বছর বছর এমন দূর্দশার প্রেক্ষাপটে বিবেচনায় স্থানীয় কৃষক সমবায়ভিত্তিক পোস্ট-হারভেস্ট হাব গড়ে তোলা একটি কার্যকর সমাধান হিসেবে সামনে আসে। পোস্ট হার্ভেস্ট হাবগুলোতে আধুনিক ড্রায়ার, গুদাম বা সাইলো, শীতল সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং প্রাথমিক প্রক্রিয়াজাতকরণ সুবিধা থাকবে, যা কৃষকদের ফসল সংরক্ষণে কার্যকর সহায়তা করবেÑ ফলে তারা তাৎক্ষণিকভাবে কম দামে ফসল বিক্রি করতে বাধ্য হবেন না। সমবায়ের মাধ্যমে হাওরের কৃষকরা যৌথভাবে এই গ্রেইন হাব পরিচালনা করলে খরচ কমবে এবং ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত হবে।
কৃষি ফসল সংরক্ষণের এ ধরনের হাব কৃষকের বাজার ক্ষমতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে; মধ্যস্বত্বভোগীর ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সরাসরি বাজারে পণ্য সরবরাহের সুযোগ তৈরি হবে। ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার করে বাজার তথ্য সহজলভ্য করা গেলে কৃষকরা আরও সচেতনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। একইসঙ্গে, এই গ্রেইন হাবগুলো হাওরের কৃষকদের জন্য প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবেও কাজ করতে পারে, যেখানে আধুনিক কৃষি পদ্ধতি, সঠিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার, জৈব সারের ব্যবহার উৎসাহিত করণ এবং জলবায়ু সহনশীল কৃষি সম্পর্কে তথ্য প্রদান করা যাবে।
গ্রামীণ অর্থনীতিতেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে; হাওর অঞ্চলের স্থানীয় যুবকদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, নারীদের অংশগ্রহণ বাড়বে এবং নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হবে। কৃষি বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে জৈব সার, ভাসমান কৃষি, বায়োগ্যাস বা পশুখাদ্য উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হবে, যা একটি সবুজ সার্কুলার অর্থনীতির ভিত্তি গড়ে তুলতে পথ সুগম করবে।
সরকার যদি ভিশনারী ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ নেয় এবং তা সফল করতে হলে সরকারের বাস্তব নীতিগত সহায়তা অপরিহার্য; সহজ শর্তে কৃষিঋণ প্রদান, পিপিপি বা সমবায় মডেলে অবকাঠামো উন্নয়ন, মাইক্রোগ্রিড বিদ্যুৎ উৎপাদন-বিতরণ ও এলাকার পরিবহন ব্যবস্থার উন্নতি এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা নিশ্চিত করা দরকার। পাশাপাশি বেসরকারি খাত ও উন্নয়ন সংস্থাগুলোর অংশগ্রহণ বাড়ানোর দিকে দৃষ্টিপাত করতে হবে, যাতে একটি টেকসই ও কার্যকর মডেল তৈরি করা যায়।
হাওর অঞ্চলের কৃষকরা শুধু উৎপাদক নন, তারা দেশের খাদ্য নিরাপত্তার প্রহরী; তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা মানে দেশের ভবিষ্যৎকে সুরক্ষিত করা। সমবায়ভিত্তিক গ্রেইন পোস্ট-হারভেস্ট হাব গড়ে তোলার মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ হাওর অঞ্চলের কৃষকদের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ও ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব হবেÑ এখন প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, সমন্বিত পরিকল্পনা এবং দ্রুত বাস্তবায়ন। যে উদ্যোগে হাওরের কৃষক বাঁচবে, সুরক্ষিত হবে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন