একদার টিভি অভিনেত্রী মেহের আফরোজ শাওন শেখ হাসিনার চেয়েও বেশি শক্তিশালী একজন আওয়ামী লীগার নাকি? বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের একজন নেতা আবু হোরায়রা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সামনে প্রশ্ন রেখে বলেছেন, মেহের আফরোজ শাওন জুলাই যোদ্ধাদের অপমান করেছেন। তিনি এই দুঃসাহস কোথায় পেলেন?’ সম্প্রতি জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহিদদের স্মরণে আয়োজিত ‘জুলাই জাতীয় সম্মেলন’-এ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপস্থিতিতে বক্তব্য দিতে গিয়ে এসব কথা বলেছেন এই ছাত্রনেতা। ইদানীং আমরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মেহের আফরোজ শাওনের একটি পোস্টে অনেক মর্মাহত হয়েছি। আমাদের বিস্মিত করেছে তার অশালীন মন্তব্য। তার কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য প্রমাণ করেছে সৃজনশীল জগতের একজন মানুষ, একজন শিল্পী হিসেবে নিজেকে দাবি করা এই মহিলা আসলেই কতটা নি¤œ রুচির মানুষ। তার মধ্যে মানবতাবোধ বলতে কিছুই নেই। আছে শুধু পতিত স্বৈরাচারের প্রতি অন্ধ আনুগত্য। আমাদের মনে প্রশ্ন জেগেছে, তিনি কি শেখ হাসিনার চেয়ে বেশি পাওয়ারপুল? এখনো এত ক্ষমতা কোথায় পেলেন তিনি! তিনি কোন স্পর্ধায় জুলাই যোদ্ধাদের অশালীন ভাষায় অপমান করেছেন? তিনি এ দুঃসাহস কোথায় পেলেন? আমরা অবশ্যই তার বিচার চাই। অতি দ্রুত তার বিচার দেখতে চাই। জুলাই নিয়ে কিছু কথা বলতে গেলে বলতে হয় পতিত স্বৈরাচার আওয়ামী লীগের নিজেদের লাভজনক সেটআপ ভেঙে যাওয়া ফ্রাস্টেটেড বুদ্ধিজীবীদের ব্যাখ্যা দিয়ে জুলাইকে ষড়যন্ত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।
জুলাইয়ের অবিনাশী চেতনা মুছে দেওয়া এত সহজ নয়। যারা ১৬ বছরের আওয়ামী দুঃশাসনের যন্ত্রণা ভোগ করেছে। আধিপত্যবাদী শক্তির এদেশীয় দোসরদের আস্ফালন ঔদ্ধত্য দেখেছে, যারা আধিপত্যবাদী শক্তির আগ্রাসন, যড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে কথা বলার জন্য আবরার ফাহাদের মতো মেধাবী বুয়েট শিক্ষার্থীকে আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠনের সন্ত্রাসী সদস্যদের হাতে নির্মমভাবে নিহত হতে দেখেছে, যাদের পরিবারের কোনো সদস্য বিএনপি, জামায়াতের কর্মী সদস্য হওয়ার কারণে কিংবা সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলার জন্য গুম খুন নিপীড়ন পৈশাচিকতা নির্মমতার শিকার হয়েছেনÑ তারা কোনোভাবেই সেই সব দুঃসহ স্মৃতি ভুলতে পারবেন না। অনন্তকাল ধরে মনে রাখবেন। জুলাইয়ের আন্দোলনে শামিল হওয়া শক্তিদের মধ্যে হয়তো গত কিছুদিনে মতবিরোধ, মতভিন্নতা সৃষ্টি হয়েছে বিভিন্ন কারণে। কিন্তু এটা দেখে পালিয়ে থাকা পতিত স্বৈরাচারের দোসর, পরাজিত শক্তির আনন্দিত হওয়ার, উল্লসিত হওয়ার কিছু নেই। জীবন বাজি রেখে লড়ে যাওয়া সহযোদ্ধারা এত সহজে একক শত্রু ভুলে যায় না। সবাই আজও পলাতক, পতিত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ রয়েছে। এটা প্রমাণিত হয়েছে বারবার। আওয়ামী ফ্যাসিস্টদের বিরুদ্ধে এখনো বিএনপি, জামায়াত, এনসিপিসহ জুলাই অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক শক্তি ঐক্যবদ্ধ আছে। আগামীতেও থাকবে।
আজকাল বিএনপি সরকারের উদারতার সুযোগ নিয়ে পতিত স্বৈরাচারের দোসর একটি গোষ্ঠী জুলাই বিপ্লব নিয়ে কটাক্ষ, কটূক্তি, তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে যাচ্ছে। তারা জুলাই নিয়ে অশালীন মন্তব্য করতে দ্বিধা করছে না। তাদের স্পর্ধা, ঔদ্ধত্য ও দুঃসাহস দেখে অবাক হয়ে যাই। এরা কীভাবে এত বড় মানবতাবিরোধী অপরাধ করে এখন বুক ফুলিয়ে কথা বলার সাহস দেখাতে পারে? চব্বিশের জুলাই আগস্টে বাংলাদেশে ইতিহাসের জঘন্যতম মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। এর আগে একটানা ১৬ বছর ধরে পতিত স্বৈরাচার আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের মানুষের ওপর নির্মমতা, পৈশাচিকতা, অমানবিকতার স্টিমরোলার চালিয়েছে। তারা কত মায়ের বুক খালি করেছে, এর হিসাব নেই। কত মানুষকে চিরতরে অন্ধ করে দিয়েছে, কতজনকে পঙ্গু, অচল করে দিয়েছে। তার সংখ্যা অগণিত। জুলাই শহিদদের কতবার শহিদ হওয়া আমরা সহ্য করব? সম্প্রতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহোদয় দলগত অপরাধের বিচারের প্রসঙ্গে স্পষ্ট কথা বলেছেন। তাকে ধন্যবাদ। কিন্তু ফ্যাসিবাদের সম্মতি উৎপাদন যারা করেছেন এবং এখনো যারা খুব দুর্বল কিছু কৌশলে ফ্যাসিবাদকে ঢাল দেওয়ার চেষ্টা করছেন তাদের ক্ষেত্রে কি করণীয়? সিনিয়র সাংবাদিক, শিল্পী, মডেল এ রকম নানা রকমারি নামের আড়ালে বেশকিছু আওয়ামী ফুট সোলজার এসব কাজ করে যাচ্ছে। এরা জুলাই এবং ১৬ বছরে মানবতাবিরোধী অপরাধের ভিকটিমদের নিয়ে কটাক্ষ করলে করণীয় কী? এমন পরিস্থিতিতে আমরা কি ওই সন্তানহারা মা, বাবা, স্ত্রী, পরিবার পরিজনদের অনুভূতিকে কোনো গুরুত্ব দিব না? নাকি আমরা এসব ল্যান্সপেন্সারদের এভাবে ছুরি হাতে অবলীলায় ঘুরে বেড়াতে দেব? আর তারা সেই ছুরি দিয়ে শহিদদের স্মৃতিকে কেটে ফালা ফালা করবে। আর বলবে ‘জুলাইতে কিছু হয় নাই, সব মেটিকিউলাস ডিজাইন’? শহিদ ইয়ামিনরা যেমন শেষ একবার দম নেওয়ার জন্য দুনিয়ার সব বাতাস টেনে ভেতরে নেওয়ার চেষ্টা করছিল, অন্যায় অবিচার জুলুম নির্যাতনের বিরুদ্ধে লড়াই করতে করতে নিজেদের মূল্যবান, সম্ভাবনাময় জীবন অকাতরে বিসর্জন দিয়েছে। ১৬ বছরের সব শহিদের বিচারের ব্যবস্থাই শুধু করলে হবে তা নয়, শহিদদের স্মৃতি ও তাদের পরিবারকে এসব ফ্যাসিবাদের সম্মতি উৎপাদনকারীদের হাত থেকে রক্ষা করতে হবে রাষ্ট্রকেই।
এটা এক রক্তক্ষয়ী বিপ্লবের পরবর্তী পর্যায়! এটাকে স্বাভাবিক সময় হিসাবে বিবেচনা করলে হবে না। যদি দরকার হয় আইন করা হোক ফ্যাসিবাদের সম্মতি উৎপাদনকারীদের বিচারের জন্য। নিদেনপক্ষে ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন করা হোক। পাশাপাশি আইন করা হোক ভিকটিমদের স্মৃতিকে অশ্রদ্ধা করে এমন কোনো কিছু প্রচার নিষিদ্ধ করার লক্ষ্যে। অন্ততপক্ষে ক্ষত শুকানোর সময়টা পর্যন্ত ভিকটিমদের পরিবারকে এই প্রটেকশন দেওয়া হোক। একবার ভাবেন তোÑ মুক্তিযুদ্ধের পর কেউ কি মুক্তিযোদ্ধা কিংবা মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কটাক্ষ করে টিভি পর্দায় কিছু বলার সাহস করত? তরুণ প্রজন্ম কোনোভাবেই সেই পালিয়ে যাওয়া পতিত স্বৈরাচারকে ফিরে আসতে দেবে না এদেশে। যতবার দরকার ততবার জুলাই নেমে আসবে এই দেশের বুকে। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে যারা সক্রিয় ছিলেন তাদের কাছে জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন হয়ে আছে সেই আন্দোলনের বিজয়। এখন তারা যে দলই করুক, যে মতেরই হোক এই আন্দোলনকে ছোট করতে দেবে না। সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে সম্পৃক্ত করে দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে জুলাইয়ের আকাক্সক্ষা নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া, শহিদদের অবদান স্মরণ করা এবং দেশ গঠনের অঙ্গীকার আরও সুদৃঢ় করাই হবে আমাদের সবার অঙ্গীকার। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহিদ ও আহতদের যথাযথ মূল্যায়ন ও পুনর্বাসন করা সরকারের পবিত্র দায়িত্ব। তাদের হত্যাকারীদের বিচার এ দেশের মাটিতেই হবে। শহিদদের আত্মত্যাগকে স্মরণ করে তারেক রহমান বলেন, জুলাই শহিদদের আত্মত্যাগ এবং আহতদের অবদানকে স্মরণীয় করে রাখতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তাদের পরিবার ও যোদ্ধাদের সর্বোচ্চ সম্মান, স্বীকৃতি ও জীবনমান নিশ্চিতকরণ, পূর্ণাঙ্গ পুনর্বাসন ও সহায়তা প্রদানে সরকার কাজ করছে।
জুলাই বিপ্লব নিয়ে কটাক্ষ-কটূক্তিকারী, তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে টিভি টক শোতে এসে অথবা বিভিন্ন সভা সমাবেশে মন্তব্য করা সেই সব ব্যক্তি ও গোষ্ঠীকে আর সুযোগ দেওয়া নয়। এ বিষয়ে সরকারের বিশেষ হস্তক্ষেপ কামনা করছি। এতদসম্পর্কিত বিশেষ আইন করে উপযুক্ত শাস্তির দাবি জানাচ্ছি। সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলের কার্যকর পদক্ষেপ প্রত্যাশা করছি। অন্যথায় পতিত স্বৈরাচারের দোসরদের দুঃসাহস, স্পর্ধা, ঔদ্ধত্য আরও বেড়ে যাবে। যা বর্তমান বিএনপি সরকারের জন্য বিরাট হুমকি হিসেবে আবির্ভূত হবে। ষড়যন্ত্রকারীদের দুঃসাহস বেড়ে গিয়ে সরকারের নিরাপত্তা ও শান্তি শৃঙ্খলা বিনষ্ট হবে। এ বিষয়ে সবাইকে সচেতন থাকতে হবে। শাওন ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ করেছে। সঙ্গে আরও কয়েকজন। সাংস্কৃতিক এবং বিনোদন জগতে তাদের অবদান এই মহাপাপের ইনডেমনিটি হতে পারে না। জাতিসংঘের হিসাব মতেই ১৪০০ মানুষ হত্যা করেছে পতিত স্বৈরাচার আওয়ামী লীগ সরকার। এই গণহত্যার উসকানিদাতাদের যেভাবে বিচারের আওতায় আনার আয়োজন চলছেÑ একইভাবে বিচারের আওতায় আনতে হবে জুলাইকে চরমভাবে আঘাতকারী এই শাওনকে এবং সেই গণহত্যাকারীর পক্ষে জনমত সৃষ্টির চেষ্টারত অন্যদেরকেও। এদের প্রতি সামান্য অনুকম্পা দেখানোর সুযোগ আর নেই। এরা সাংবাদিক নয়, শিল্পী নয়Ñ এদের পরিচয় এরা গণহত্যাকারীর দোসর।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন