ঢাকা সোমবার, ১৩ জুলাই, ২০২৬

সবুজের সন্ধিক্ষণে বৃক্ষরোপণ অত্যাবশ্যকীয়

সনেট দেব, প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট
প্রকাশিত: জুলাই ১৩, ২০২৬, ০৬:৪৭ এএম

গ্রীষ্মের দুপুরে সূর্য যখন আগুন ঢালে, তখন একটি মাত্র গাছের ছায়া যে স্বস্তি দেয়, তার তুলনা মেলা ভার। অথচ আমরা প্রতিদিন এই সাধারণ সত্যটি ভুলে যাচ্ছিÑ যে গাছ আমাদের নিঃশ্বাস দেয়, ছায়া দেয়, খাদ্য দেয়, এমনকি জীবনের শেষ আশ্রয়টুকুও জোগায়, তাকেই আমরা নির্বিচারে কেটে ফেলছি। প্রশ্ন হলো, এই আত্মঘাতী প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসার পথ কী? উত্তরটা জটিল নয়Ñ আরও বেশি গাছ লাগানো, আর যা আছে তা রক্ষা করা।

মানবসভ্যতার ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, বন-জঙ্গলের কোলেই মানুষ প্রথম আশ্রয় খুঁজেছিল। খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থানÑ সবকিছুর জোগানদাতা ছিল প্রকৃতি, আর প্রকৃতির প্রাণকেন্দ্রে ছিল বৃক্ষ। আজকের এই কংক্রিটের নগরসভ্যতাতেও সেই নির্ভরতা এতটুকু কমেনি, বরং বহুগুণ বেড়েছে। শুধু পার্থক্য এটুকুইÑ তখন মানুষ প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থান করত, এখন মানুষ প্রকৃতিকে জয় করতে গিয়ে নিজের পায়ের নিচের মাটিটাই কেটে ফেলছে। একটি পরিণত বৃক্ষ একদিকে যেমন বাতাস থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড শুষে নিয়ে অক্সিজেন ছাড়ে, তেমনি মাটির ক্ষয় ঠেকায়, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর রক্ষা করে, বৃষ্টিপাত নিয়ন্ত্রণ করে এবং জীববৈচিত্র্যের আশ্রয়স্থল হয়ে ওঠে। একটিমাত্র বৃক্ষের এই বহুমুখী অবদানের আর্থিক মূল্য নির্ধারণ করতে গেলে বিজ্ঞানীরা হিসাব কষে দেখিয়েছেন, পঞ্চাশ বছর ধরে বেঁচে থাকা একটি গাছ যে পরিমাণ অক্সিজেন, ছায়া, মাটি সংরক্ষণ ও জলবায়ু নিয়ন্ত্রণের সেবা দেয়, তার আর্থিক মূল্য লাখ টাকা ছাড়িয়ে যায়। অথচ আমরা এই ‘বিনামূল্যের সেবা’কে এতটাই হালকাভাবে নিয়েছি যে, সামান্য কাঠের প্রয়োজনে বা জমি দখলের লোভে শত বছরের গাছও কেটে ফেলতে দ্বিধা করি না।

বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান এমনই যে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতির তালিকায় আমাদের নাম সবসময় ওপরের দিকে থাকে। ষড়ঋতুর দেশ বলে আমরা গর্ব করি, কিন্তু বাস্তবতা হলো, ঋতুচক্র এখন আর আগের মতো স্পষ্ট নয়। শীত ছোট হয়ে আসছে, বর্ষা অনিয়মিত হয়ে পড়ছে, আর গ্রীষ্মের তাপমাত্রা প্রতি বছর নতুন রেকর্ড গড়ছে। এসবের পেছনে বহু কারণ থাকলেও বনভূমি ধ্বংস একটি প্রধান নিয়ামকÑ এ কথা অস্বীকারের উপায় নেই। একটি দেশের সুস্থ পরিবেশের জন্য মোট আয়তনের অন্তত পঁচিশ শতাংশ বনভূমি থাকা প্রয়োজন বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। বাংলাদেশে সেই হার এখনো কাক্সিক্ষত মাত্রার অনেক নিচে। নগরায়ণের চাপ, শিল্পায়নের প্রয়োজন, আবাসনের সংকটÑ এসব যুক্তি দিয়ে প্রতিনিয়ত বনভূমি কমিয়ে ফেলা হচ্ছে। অথচ উন্নয়ন আর পরিবেশ রক্ষা যে পরস্পরবিরোধী কিছু নয়, বরং একে অপরের পরিপূরক হতে পারেÑ এই সহজ সত্যটি আমরা যেন ভুলে যাচ্ছি। ঢাকার মতো মহানগরের দিকে তাকালে চিত্রটি আরও উদ্বেগজনক। বায়ুদূষণের তালিকায় বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় শহরগুলোর একটি এই ঢাকা। প্রায় দুই কোটি মানুষের এই শহরে খোলা জায়গা, পার্ক আর সবুজের পরিমাণ দিন দিন কমছে। ফলাফলÑশ্বাসকষ্ট, অ্যালার্জি, হৃদরোগসহ নানা জটিল স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন নগরবাসী। এই বাস্তবতা বদলাতে হলে ছাদবাগান, রাস্তার পাশে বৃক্ষরোপণ, পার্ক ও উদ্যান সংরক্ষণের মতো উদ্যোগগুলোকে আরও জোরদার করতে হবে।

পৃথিবীর ইতিহাসে এমন বহু দৃষ্টান্ত আছে, যেখানে নির্বিচার বৃক্ষনিধনের মাশুল গুনতে হয়েছে গোটা একটি সভ্যতাকে। হাজার হাজার বছর আগে সিন্ধু উপত্যকার সমৃদ্ধ সভ্যতা যে ধীরে ধীরে মরুকরণের শিকার হয়ে বিলীন হয়ে গিয়েছিল, তার পেছনে অতিরিক্ত বৃক্ষনিধন ও তজ্জনিত খরা-বন্যার প্রকোপকে অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেন ইতিহাসবিদরা। আফ্রিকার সাহেল অঞ্চল কিংবা দক্ষিণ আমেরিকার আমাজন অববাহিকায়ও একই চিত্র বারবার ফিরে এসেছেÑ বন উজাড়, মাটির উর্বরতা হ্রাস, অনাবৃষ্টি, আর শেষ পর্যন্ত মানুষের বাস্তুচ্যুতি। এই ইতিহাস আমাদের জন্য একধরনের সতর্কবার্তা। প্রকৃতি ধ্বংস করে যে উন্নয়ন, তা কখনোই টেকসই হতে পারে না; বরং তা একদিন বুমেরাংয়ের মতো ফিরে এসে সেই সভ্যতাকেই গ্রাস করে।

বাংলাদেশও এই ঝুঁকির বাইরে নয়। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার একাধিক প্রতিবেদনে বারবার সতর্ক করা হয়েছে যে, বনভূমি হ্রাসের এই ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী দশকগুলোতে আমাদের উপকূলীয় অঞ্চল, কৃষিজমি ও মিঠাপানির উৎসগুলো মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততার বিস্তার, আর অনিয়মিত বৃষ্টিপাতÑ এসব সমস্যার সবগুলোরই একটি সাধারণ প্রতিষেধক আছে, আর তা হলো সুবিস্তৃত সবুজ আচ্ছাদন। উপকূলীয় অঞ্চলে ম্যানগ্রোভ বনায়নের মাধ্যমে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের তীব্রতা কমিয়ে আনার যে দৃষ্টান্ত সুন্দরবন-সংলগ্ন এলাকায় দেখা গেছে, তা প্রমাণ করেÑ প্রকৃতির সঙ্গে বন্ধুত্ব করলে প্রকৃতিও আমাদের রক্ষা করে।

একটি বিষয় স্পষ্ট করে বলা দরকারÑ শুধু বছরে একবার সরকারি বৃক্ষরোপণ অভিযান বা বৃক্ষমেলার মধ্যে এই কর্মযজ্ঞ সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। গাছ লাগানোকে আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের সংস্কৃতির অংশ করে তুলতে হবে। ভাবুন তো, প্রতিটি সন্তানের জন্মদিনে যদি একটি করে গাছ লাগানো হয়, প্রতিটি বিবাহবার্ষিকীতে যদি নতুন একটি চারা রোপণ করা হয়, কিংবা পরীক্ষার ফল প্রকাশের দিনে যদি একজন শিক্ষার্থী নিজের নামে একটি গাছ লাগায়Ñ তাহলে বছর ঘুরতেই দেশজুড়ে কোটি কোটি নতুন গাছের সমারোহ দেখা যেতে পারে। এই ধরনের ব্যক্তিগত উদ্যোগ শুধু পরিবেশের উপকার করে না, একটি গাছের প্রতি মানুষের যে মানসিক টান তৈরি হয়, তা দীর্ঘমেয়াদে গাছটির পরিচর্যা ও রক্ষণাবেক্ষণকেও নিশ্চিত করে। তরুণ প্রজন্মকে এই আন্দোলনের কেন্দ্রে নিয়ে আসাটাও জরুরি। স্কুল-কলেজে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে, যেখানে প্রতিটি শিক্ষার্থী নিজের হাতে একটি চারা লাগাবে এবং তার বেড়ে ওঠার দায়িত্ব নেবে। এতে শুধু বনভূমি বাড়বে না, শিশু-কিশোরদের মধ্যে প্রকৃতির প্রতি একটি দায়বদ্ধতার বোধও তৈরি হবে, যা তাদের ভবিষ্যৎ জীবনযাপনের ধরনকেও প্রভাবিত করবে।

বৃক্ষকে আমরা প্রায়ই কেবল পরিবেশগত প্রতীক হিসেবে দেখি, কিন্তু এর অর্থনৈতিক গুরুত্বও অত্যন্ত ব্যাপক। গ্রামীণ অর্থনীতির একটি বড় অংশ আজও নির্ভরশীল কাঠ, বাঁশ, ফলমূল ও ভেষজ উদ্ভিদের ওপর। আসবাবপত্র, নৌকা, কাগজশিল্প, দিয়াশলাই, প্যাকেজিংÑ এমন অসংখ্য খাতের কাঁচামাল আসে বন থেকে। ফলদ বৃক্ষ যেমন আম, জাম, কাঁঠাল, পেয়ারা লাগিয়ে একটি পরিবার বাড়তি আয়ের উৎস তৈরি করতে পারে, তেমনি ভেষজ উদ্ভিদ চাষ করে গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবার ব্যয়ও কমানো সম্ভব। অর্থাৎ বৃক্ষরোপণ শুধু পরিবেশ রক্ষার কর্মসূচি নয়, এটি একইসঙ্গে দারিদ্র্যবিমোচনেরও একটি কার্যকর হাতিয়ার।

বৃক্ষরোপণ কোনো একক পক্ষের দায়িত্ব নয়। সরকারের বন বিভাগ চারা উৎপাদন করে বিনামূল্যে বিতরণ করছে, বৃক্ষমেলার আয়োজন করছেÑএসব প্রশংসনীয় উদ্যোগ। কিন্তু শুধু চারা বিতরণ করলেই কাজ শেষ হয় না। রোপণের পরের যতœ, সঠিক পরিচর্যা, আর অপরিণত বয়সে বৃক্ষছেদন বন্ধ করার জন্য কঠোর আইনি কাঠামোÑ এসবও সমান গুরুত্বপূর্ণ। নতুন একটি গাছ লাগানোর আগে যদি পুরোনো একটি গাছ কেটে ফেলা হয়, তাহলে নিট লাভের হিসাব শূন্যই থেকে যায়। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো রাস্তার পাশে, খালি জায়গায় নিয়মিত বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি চালাতে পারে। বেসরকারি সংস্থা ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোও তাদের সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে বৃহৎ পরিসরে বনায়ন কর্মসূচিতে অংশ নিতে পারে। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, সাধারণ মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণÑকারণ সরকারি একক প্রচেষ্টায় এত বড় একটি জাতীয় সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।

জুলাই-আগস্ট মাস বাংলাদেশে বৃক্ষরোপণের জন্য সবচেয়ে উপযোগী সময়। বর্ষার এই মৌসুমে মাটি নরম থাকে, পানির প্রাপ্যতাও থাকে পর্যাপ্তÑ ফলে নতুন চারার বেঁচে থাকার সম্ভাবনা অনেক বেশি। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে প্রত্যেকে যদি নিজের বাড়ির আঙিনায়, ছাদে, কর্মস্থলের আশপাশে অন্তত একটি করে ফলদ, বনজ বা ঔষধি গাছ লাগান, তাহলে এই সম্মিলিত ক্ষুদ্র উদ্যোগগুলোই একদিন বিশাল পরিবর্তনের রূপ নেবে। আমরা প্রায়ই বলি, পরিবর্তন আসবে বড় পরিকল্পনা থেকে, বড় বাজেট থেকে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, পরিবর্তনের শুরুটা হয় ব্যক্তি পর্যায় থেকেই। একটি পরিবার যদি প্রতি বছর দুটি করে গাছ লাগায় এবং তার যতœ নেয়, লাখো পরিবারের এই সম্মিলিত প্রচেষ্টা দেশের সবুজ আচ্ছাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিতে পারে।

আমরা যদি সত্যিই একটি বাসযোগ্য পৃথিবী পরবর্তী প্রজন্মের হাতে তুলে দিতে চাই, তাহলে বৃক্ষরোপণকে আর ঐচ্ছিক কর্মসূচি হিসেবে না দেখে জাতীয় চরিত্রের অংশ করে তুলতে হবে। এই কাজে প্রয়োজন নেই বিশাল অর্থ বিনিয়োগের, প্রয়োজন শুধু সদিচ্ছা আর সামান্য শ্রমের। একটি চারাগাছ রোপণ করা যতটা সহজ, তার যতœ নিয়ে বড় করে তোলা ততটাই দায়িত্বেরÑ আর এই দায়িত্ব পালনেই লুকিয়ে আছে আমাদের ভবিষ্যতের নিরাপত্তা। আসুন, আমরা প্রত্যেকে প্রতিজ্ঞা করিÑ শুধু গাছ লাগাব না, লাগানো গাছটিকে বাঁচিয়েও রাখব। কারণ একটি গাছ শুধু একটি উদ্ভিদ নয়, তা আমাদের আগামীর নিঃশ্বাস, আমাদের সন্তানের নিরাপদ আশ্রয়, আর একটি সবুজ পৃথিবীর প্রতিশ্রুতি। ‘গাছ লাগাই, পরিবেশ বাঁচাই’Ñ এই স্লোগান শুধু দেয়ালে লিখে রাখার জন্য নয়, প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে গেঁথে নেওয়ার জন্য।