কিছু বছর আগে মানুষের আদর্শ ছিলেন পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠ সদস্য, শিক্ষক, সাহিত্যিক কিংবা সমাজের কোনো বিশিষ্ট ব্যক্তি। তাদের জীবন সংগ্রাম, মূল্যবোধ এবং সফলতা নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করত। কিন্তু প্রযুক্তির উন্নয়নে সেই চিত্র অনেকটা বদলে গেছে। এখন ঘুম থেকে উঠেই তরুণ-তরুণীরা প্রথমে স্মার্টফোন হাতে তুলে নেয়। সেখানে তারা দেখতে পায়, কেউ বিলাসবহুল জীবনযাপন করছে, কেউ বিদেশে ভ্রমণের ছবি প্রকাশ করছে, আবার কেউ নিখুঁত সৌন্দর্য ও জীবন-যাপনের ভিডিও প্রদর্শন করছে। বাস্তব জীবনের সঙ্গে এই সাজানো জীবনের যে বিস্তর ফারাক তা অধিকাংশ মানুষ অনুধাবন করতে পারেন না কিংবা করতেও চান না। এসবকে আরও জটিল করে তুলেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি ভার্চুয়াল ইনফ্লুয়েন্সররা। তারা বাস্তবে মানুষ না হলেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে স্বাভাবিক মানুষের মতো আচরণ করে। ডিজিটাল প্রযুক্তিতে নির্মিত এসব চরিত্র ছবি পোস্ট করে, ভিডিও তৈরি করে, বিভিন্ন পণ্যের বিজ্ঞাপন দেয় এবং অনুসারীদের সঙ্গে এমনভাবে যোগাযোগ করে যেন তারা রক্ত মাংসের মানুষ।
ব্যবসায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি একটি নতুন সম্ভাবনা দ্বার খুলেছে ঠিকই কিন্তু এর সামাজিক ও মানসিক প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ ক্রমে বেড়েই চলেছে। ভার্চুয়াল ইনফ্লুয়েন্সেরদের সবচেয়ে বড় শক্তি তারা কখনো ক্লান্ত হয় না এবং সব সময় এরা নিখুঁত দেখায়। ফলে একজন সাধারণ তরুণ অথবা তরুণী যখন নিজের বাস্তব জীবনের সঙ্গে এসবের তুলনা করে তখন তার মধ্যে অপ্রাপ্তি, হতাশা এবং আত্মবিশ্বাসের সংকট তৈরি হয়। বাস্তব জীবনে যেখানে সংগ্রাম ও ব্যর্থতা থাকে সেখানে ভার্চুয়াল জগতে দেখা যায় কেবল সাফল্য, সৌন্দর্য ও সুখের প্রদর্শনী। এই বৈপরীত্য তরুণদের মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। শুধু ভার্চুয়াল ইনফ্লুয়েন্সারি নয়, এআই এর সহায়তায় তৈরি কনটেন্ট অনেক সময় মানুষের কাছে বাস্তব বলে মনে হয়।
যার ফলে যাচাই-বাছাই ছাড়াই নানা গল্প, অনুপ্রেরণামূলক বক্তব্য এবং সাফল্যের কাহিনি চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এর একটি অতি পরিচিত উদাহরণ দেখা যায় বিসিএস পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ভরে যায় নানা সংগ্রামের গল্পে। কেউ দাবি করেন তিনি মোমবাতি আলোতে পড়ে সফল হয়েছেন। কেউ বলেন দিনে ১৬ ঘণ্টা পড়াশোনা করেছেন। কেউ আবার এমন গল্প শোনান যা বাস্তবের তুলনায় অনেক বেশি নাটকীয়। অথচ খোঁজ নিলে দেখা যায় অনেক ক্ষেত্রেই এই সফলতার পেছনে ছিল পরিবারের আর্থিক সহায়তা, মানসিক সমর্থন কিংবা দীর্ঘদিনের পরিকল্পিত প্রস্তুতি।
কিন্তু এসব পরিশ্রম আড়ালে থেকে যায়, আর ভার্চুয়াল জগতে সামনে আসে নাটকীয় অংশ। এসব একপেশে উপস্থাপনা নতুন প্রজন্মকে বিভ্রান্ত করে। অনেক তরুণ-তরুণী মনে করে সফল হতে হলে এমন জীবন-যাপন করতে হবে অথবা ওরকম কষ্টের গল্প থাকতে হবে। ফলে তারা নিজের বাস্তবতাকে অবমূল্যায়ন করতে শুরু করে এবং অন্যের সাজানো গল্পকে নিজের জীবনের মানদ- বানিয়ে ফেলে। আরেকটি বিপজ্জনক দিক হলো আত্মমূল্যায়নের মানদ-ের পরিবর্তন। বর্তমানে অনেক তরুণ-তরুণী নিজের যোগ্যতা, ব্যক্তিত্ব কিংবা সাফল্যের চেয়ে লাইক, কমেন্ট, শেয়ার ও অনুসারী সংখ্যাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। প্রত্যাশিত সাড়া না পেলে তারা হতাশ হয়ে পড়ে।
আবার যখন অতিরিক্ত সাড়া পায় তখন তারা জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে বিকৃত আচরণ শুরু করে। ধীরে ধীরে বাস্তব পরিচয়ের চেয়ে ভার্চুয়াল পরিচয় তাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এই প্রবণতা মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি। অনেকে মনে করেন অন্য সবার জীবন নিখুঁত শুধু তার জীবনেই সমস্যা। এ ধারণা থেকে ধীরে ধীরে উদ্বেগ, হতাশা আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি দেখা দেয়। এমনকি মানসিকভাবেও অসুস্থ করে তুলে। অথচ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমরা মানুষের জীবনের একটি বাছাই করা অংশ দেখি, পুরো জীবন দেখিনা। বাংলাদেশের স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের সহযোগিতার ফলে ডিজিটাল প্লাটফর্মের ব্যবহার দ্রুত বেড়েছে। এখন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সময় কাটানো দৈনন্দিন অভ্যাস।
কিন্তু ডিজিটাল কন্টেন্টকে পুরোপুরি বিশ্বাস করা যাবে না। অনেক তরুণ ভার্চুয়াল ইনফ্লুয়েন্সের জীবনকে বাস্তব জীবনের আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করছে। ফলে এর প্রভাব পড়ছে পড়াশোনায়, পারিবার সম্পর্ক এবং ব্যক্তিগত মূল্যবোধের ওপর। বর্তমান সময়ের তরুণ-তরুণেরা পোশাক, ভাষা ও জীবন-যাপনে অন্ধ অনুকরণে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। আমাদের এসব সমস্যা সমাধান করা প্রয়োজন। প্রযুক্তিকে দোষারোপ করাই সমাধান নয়। বরং প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটাল প্রযুক্তি মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করা সম্ভব যদি সেগুলোকে সচেতনভাবে কাজে লাগানো যায়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সঠিকভাবে ব্যবহারের জন্য পরিবারের সন্তানদের সঙ্গে নিয়মিত আলোচনা করতে হবে এবং এসবের ক্ষতিকর দিকগুলো তুলে ধরতে হবে। তাদেরকে বোঝাতে হবে ইনফ্লুয়েঞ্জারদের জীবন একটি পরিকল্পিত উপস্থাপনা। সেটাকে নিজের জীবনের মানদ- বানানো যাবে না। মূলত সফলতা আসে পরিশ্রম, ব্যর্থতা, শিক্ষা এবং ধারাবাহিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে। প্রযুক্তি আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু প্রযুক্তি যেন মানুষের আত্মপরিচয়, আত্মমর্যাদা ও মানসিক সুস্থতার বিকল্প হয়ে না দাঁড়ায় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
নতুন প্রজন্মকে এমন একটি ডিজিটাল সংস্কৃতি উপহার দিতে হবে যেখানে ভার্চুয়াল জনপ্রিয়তার চেয়ে বাস্তব সম্পর্ক, মানবিক মূল্যবোধ ও সত্যিকারের সাফল্য বেশি গুরুত্ব পাবে। কারণ ভার্চুয়াল জগতে পর্দার ঝলমলে আলো থাকে ঠিকই কিন্তু তার থেকে বাস্তব মানুষের সংগ্রামের মাধ্যমে গঠিত জীবনের সৌন্দর্য অতুলনীয়। তার জন্য পরিবার থেকে শুরু করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রশাসন এবং সমাজকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।
পাশাপাশি সবার সামনে প্রযুক্তির নেতিবাচক দিকগুলো তুলে ধরতে হবে এবং সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। সবাইকে মনে রাখতে হবে প্রযুক্তিকে আমরা ব্যবহার করব, প্রযুক্তি যেন আমাদের ব্যবহার করতে না পারে। এই উপলব্ধিটাই হতে পারে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মানসিক সুস্থতা রক্ষার সবচেয়ে বড় শক্তি। যথাযথ নীতিমালা ও প্রযুক্তিগত সচেতনতা নিশ্চিত করা গেলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ভার্চুয়াল ইনফ্লুয়েন্স মানুষের প্রতিদ্বন্দ্বী নয় বরং উন্নয়নের সহযাত্রী হয়ে উঠতে পারে। ভবিষ্যতের পৃথিবীকে আরও উন্নত এবং নিজেদের সঠিক পথে পরিচালনা করার জন্য প্রযুক্তি সঠিক ব্যবহার করতে হবে।

