সিলেট এমএজি ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে ঘিরে দীর্ঘদিনের একটি বৈপরীত্য অবশেষে দূর হওয়ার পথে। নামের সঙ্গে ‘আন্তর্জাতিক’ শব্দটি যুক্ত থাকলেও বাস্তবে বহু বছর ধরে এটি পূর্ণাঙ্গ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সুবিধা থেকে বঞ্চিত ছিল। অবকাঠামো উন্নয়ন, রানওয়ে সম্প্রসারণ, আধুনিক টার্মিনাল, নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও আন্তর্জাতিক মানের বিভিন্ন সুবিধা গড়ে তোলার পরও বিদেশি বিমান সংস্থার জন্য এর আকাশ কার্যত বন্ধই ছিল। ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন সিলেট অঞ্চলের লাখো প্রবাসী, ব্যবসায়ী ও সাধারণ যাত্রীরা। এখন যদি সত্যিই বিদেশি বিমান সংস্থার নিয়মিত ফ্লাইট চালু হয়, তবে তা শুধু একটি বিমানবন্দরের নয়, বরং একটি অঞ্চলের দীর্ঘদিনের বঞ্চনার অবসান ঘটাবে।
সিলেট বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ প্রবাসী অধ্যুষিত অঞ্চল। যুক্তরাজ্য, মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত বিপুলসংখ্যক সিলেটি প্রবাসী দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন। বৈদেশিক রেমিট্যান্সের একটি বড় অংশ আসে এই অঞ্চল থেকেই। অথচ সেই মানুষগুলোকেই বছরের পর বছর সীমিত ফ্লাইট, অতিরিক্ত ভাড়া এবং অনাকাক্সিক্ষত ভোগান্তির শিকার হতে হয়েছে। প্রতিযোগিতার অভাবে একক আধিপত্য তৈরি হলে যে ভাড়া বাড়ে, সেবার মান কমে এবং যাত্রী স্বার্থ উপেক্ষিত হয়, সিলেট তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
অবকাঠামোগত সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও বিদেশি বিমান সংস্থাগুলোকে নানা অজুহাতে নিরুৎসাহিত করার অভিযোগ বহুদিনের। এতে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগেরও যথাযথ ব্যবহার হয়নি। হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে বিমানবন্দর উন্নয়ন করা হলেও যদি তার পূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত না হয়, তবে সেই বিনিয়োগের সুফল জনগণ পায় না।
এই প্রেক্ষাপটে সালাম এয়ার, ফ্লাই দুবাই, এয়ার আরাবিয়া, সৌদিয়া এয়ারলাইন্সসহ একাধিক আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থার আগ্রহ অত্যন্ত ইতিবাচক। একই সঙ্গে ইউএস-বাংলার সৌদি আরবে সরাসরি ফ্লাইট পরিকল্পনা এবং ভবিষ্যতে ভারতের বিমান সংস্থাগুলোর সম্ভাব্য সংযোগ সিলেটকে একটি আঞ্চলিক বিমান যোগাযোগ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ সৃষ্টি করেছে। এটি বাস্তবায়িত হলে শুধু যাত্রীসেবা নয়, পর্যটন, বাণিজ্য, কার্গো পরিবহন, বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।
তবে শুধু ঘোষণা বা আশ্বাসে থেমে গেলে চলবে না। অতীতের অভিজ্ঞতা সুখকর নয়। বিভিন্ন সময় বিদেশি বিমান সংস্থাকে অনুমতি দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত নানা প্রশাসনিক জটিলতা ও নীতিগত অস্পষ্টতায় তা থেমে গেছে। তাই এবার সরকারকে স্পষ্ট বার্তা দিতে হবে, বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলো কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা গোষ্ঠীর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণের জায়গা নয়; এগুলো জাতীয় সম্পদ এবং জনগণের স্বার্থেই পরিচালিত হবে।
একই সঙ্গে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষকে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ও প্রতিযোগিতাবান্ধব নীতি অনুসরণ করতে হবে। স্লট বরাদ্দ, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং, জ্বালানি সরবরাহ, নিরাপত্তা ও অন্যান্য সেবায় সব বিমান সংস্থার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। কোনো ধরনের অদৃশ্য বাধা বা বৈষম্যের সুযোগ রাখা যাবে না।
সিলেটের মানুষের এই দাবি কোনো বিশেষ অঞ্চলের দাবি নয়। এটি ন্যায্য অধিকার ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার দাবি। আন্তর্জাতিক মানের বিমানবন্দর যদি আন্তর্জাতিকভাবেই পরিচালিত না হয়, তবে তার অস্তিত্ব কেবল নামেই সীমাবদ্ধ থাকে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর যে সম্ভাবনার দুয়ার খুলছে, সেটিকে আর কোনো অদৃশ্য স্বার্থের কাছে জিম্মি করা যাবে না।
আমরা মনে করি সিলেট এমএজি ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে একটি উন্মুক্ত, প্রতিযোগিতামূলক ও আধুনিক আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পরিণত করলে এতে যেমন প্রবাসীদের দুর্ভোগ কমবে, তেমনি দেশের অর্থনীতি, বাণিজ্য, পর্যটন ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগও নতুন গতি পাবে।
আমাদের প্রত্যাশা থাকবে, সরকার যেন এই উদ্যোগকে ধারাবাহিকতা দেয় এবং আর কখনো কোনো একচেটিয়া স্বার্থের কারণে জনগণের অধিকার ও রাষ্ট্রীয় সম্ভাবনা বাধাগ্রস্ত না হয়।

