ঢাকা শনিবার, ৩০ আগস্ট, ২০২৫

গাজা সংকট ও বৈশ্বিক শান্তি : চীনের কূটনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি

মো. ওবায়দুল্লাহ
প্রকাশিত: আগস্ট ৩০, ২০২৫, ১১:৪৬ এএম
মো. ওবায়দুল্লাহ

ইসরায়েলি আগ্রাসনের ফলে গাজা অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরে মানবিক সংকটের মধ্যে রয়েছে। ইসরায়েলের সেনাবাহিনী নতুন করে গাজা সিটি দখলের পরিকল্পনা করার কারণে বর্তমানে অঞ্চলটি আরও একবার বিশ্বের শীর্ষ আলোচনার কেন্দ্রে। এই পরিকল্পনাটি সম্প্রতি ইসরায়েলের নিরাপত্তা মন্ত্রিসভা অনুমোদন করেছে। কিন্তু এই ভয়ানক পরিকল্পনা শুধুই কেবল গাজার জনগণের জন্য একটি নতুন বিপর্যয় ডেকে আনবে তা নয়, বরং এই পরিস্থিতি মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতার পাশাপাশি, বৈশ্বিক শান্তির জন্যও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। চীন এই সংকটের প্রেক্ষাপটে তার অবস্থান স্পষ্ট করেছে এবং ইসরায়েলকে তার ‘বিপজ্জনক পদক্ষেপ’ অবিলম্বে বন্ধ করতে আহ্বান জানিয়েছে।

চীনের অবস্থান: দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান এবং গাজার মানবিক সংকট

চীন গাজার দখল এবং এর সঙ্গে সম্পর্কিত সংঘাতের অবসান সম্পর্কে একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুয়া জিয়াকুন বলেছেন, ‘গাজা ফিলিস্তিনের জনগণের অধিকার, এটি ফিলিস্তিনিদের ভূখ-ের অবিচ্ছেদ্য অংশ।’ চীন মনে করে যে, গাজার সংকটের স্থায়ী সমাধান শুধুমাত্র একটি ‘দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান’ এর মাধ্যমে সম্ভব। ফিলিস্তিনিরা একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে পারবে, যেখানে তাদের সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক অধিকার পূর্ণাঙ্গভাবে রক্ষিত হবে। এই দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান কেবল রাজনৈতিক নয়, বরং মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। 

গাজার পরিস্থিতি বর্তমানে অত্যন্ত উদ্বেগজনক। জাতিসংঘের রিপোর্ট অনুযায়ী, গাজার ৫০ শতাংশ মানুষ বর্তমানে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে, এবং ৬০ শতাংশ শিশুর মধ্যে পুষ্টির অভাব রয়েছে। এর মধ্যে, যুদ্ধ এবং সংঘাতের কারণে হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছে, এবং লক্ষাধিক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। এই সংকটের ফলে গাজার জনগণের জীবনযাত্রার মান মারাত্মকভাবে সংকুচিত হয়েছে।

আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি ইসরায়েলের অবজ্ঞা

চীন গাজার দখল এবং যুদ্ধের ফলে ইসরায়েলের আচরণকে আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি অবজ্ঞা হিসেবে বিবেচনা করছে। আন্তর্জাতিক আদালত ইতোমধ্যে ইসরায়েলকে গাজার দখল অবিলম্বে শেষ করার জন্য নির্দেশ দিয়েছে। তবে ইসরায়েল এই নির্দেশ উপেক্ষা করে তার আক্রমণাত্মক পরিকল্পনা বাস্তবায়নে এগিয়ে যাচ্ছে। চীন মনে করে, এই ধরনের কর্মকা- আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন এবং এটি মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দৃষ্টিতে যুদ্ধাপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে।

বিশ্ব সম্প্রদায়ের উচিত, এই ধরনের পদক্ষেপের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া এবং ইসরায়েলকে আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলতে বাধ্য করা। গাজার জনগণের জীবনযাত্রা শুধুমাত্র তাদের মানবিক অধিকার রক্ষা করা নয়, বরং আন্তর্জাতিক শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চীন জানিয়েছে, গাজার সংকটের একমাত্র সমাধান হচ্ছে যুদ্ধবিরতি এবং দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান, যেখানে ফিলিস্তিনিরা তাদের স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে পারবে এবং ইসরায়েল নিরাপদে তার অস্তিত্ব বজায় রাখতে পারবে।

চীনের উদ্যোগ: ফিলিস্তিনিদের ঐক্য এবং আন্তর্জাতিক সমাধান

চীন শুধু গাজার দখল বন্ধ করার আহ্বান জানাচ্ছে না, বরং এটি ফিলিস্তিনিদের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠার জন্যও কাজ করছে। চীন সম্প্রতি ১৪টি ফিলিস্তিনি গ্রুপকে একত্রিত করার জন্য একটি ঐতিহাসিক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে, চীন ফিলিস্তিনি গ্রুপগুলোকে বেইজিংয়ে আমন্ত্রণ জানিয়ে একটি জাতীয় ঐক্য পরিকল্পনা প্রস্তুত করার জন্য আলোচনা শুরু করেছিল। চীন বিশ্বাস করে যে, ফিলিস্তিনিদের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা হলে, তাদের শান্তিপূর্ণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথ আরও সুগম হবে।

এ ছাড়া, চীন ফিলিস্তিনিদের জন্য জাতিসংঘের পূর্ণ সদস্যপদ গ্রহণের জন্যও চাপ সৃষ্টি করছে, যা তাদের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এবং স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে। 

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া এবং ইসরায়েলের একক সিদ্ধান্ত

গাজা সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে চীনের অবস্থান শুধু একক নয়, বরং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বিভিন্ন দেশ এই বিষয়ে তাদের মতামত প্রকাশ করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং বেশ কিছু আরব দেশ ইতোমধ্যে ইসরায়েলের এই পদক্ষেপকে আন্তর্জাতিক আইনের বিরোধী হিসেবে ঘোষণা করেছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, ইসরায়েলের এই পদক্ষেপটি ‘যুদ্ধাপরাধ’ হিসেবে চিহ্নিত করা যেতে পারে এবং আন্তর্জাতিক আদালতে অভিযোগ দায়ের করা উচিত।

তবে, আন্তর্জাতিক চাপ সত্ত্বেও ইসরায়েল তার পরিকল্পনা চালিয়ে যাচ্ছে, যা বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলোকে উদ্বিগ্ন করেছে। বিশেষ করে, যুক্তরাষ্ট্র সাধারণত ইসরায়েলের পক্ষ নিলেও এবার কিছুটা দ্বিধায় আছে এবং তাদের যুদ্ধ কৌশল নিয়ে ভিন্নমত জানিয়েছে।

গাজার সংকট একটি গুরুতর মানবিক ও রাজনৈতিক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। চীনের পদক্ষেপ, যা দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান এবং ফিলিস্তিনিদের অধিকার রক্ষায় জোর দিয়েছে, তা অবশ্যই প্রশংসনীয়। তবে, এটি কেবল চীনের একক উদ্যোগ নয়, বরং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত, এই সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধান খুঁজে বের করার জন্য একযোগে কাজ করা। গাজার মানুষের জন্য শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে হলে, ইসরায়েলের আক্রমণ থামানো এবং একটি স্থায়ী দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান প্রতিষ্ঠা করা অপরিহার্য।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, বিশেষত শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো, তাদের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে গাজার শান্তির জন্য কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে পারে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যেমন বলেছে, ‘গাজার সংকটের অবসান কেবল শান্তিপূর্ণ সমাধান এবং মানবিক সহায়তার মাধ্যমে সম্ভব।’ আমাদের এই সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধান করতে হবে, যাতে গাজার জনগণের শান্তি নিশ্চিত করা যায় এবং ভবিষ্যতে এই অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।