প্রকৃতির প্রতিকূল পরিবেশের সঙ্গে যুদ্ধ করে জয় ছিনিয়ে আনা এক যোদ্ধার নাম কৃষক। যাদের ঘামঝরা শরীরের প্রতিটি ফোঁটায় পরোক্ষভাবে মিশে আছে বহুতল কংক্রিটের মসৃণ দেওয়াল। আমরা অনুভূতির চোখ হারিয়ে ফেলেছি। হারিয়ে ফেলেছি মায়ের আঁচলের ঘ্রাণ, দিগন্ত নীল আকাশের নিচে সবুজ ধান খেতের দোল। চৈত্রের খর দুপুরে সেই মাতুলি মাথায় দিয়ে কৃষকের পাট নিড়ানোর দৃশ্য। গ্রামীণ উনুনে পাটখড়ির জ্বালানি এখন নতুন প্রজন্মের কাছে যেন রূপকথার গল্প। আধুনিকতায় কৃষি খাতে নতুনত্ব চাষাবাদের অন্তরালে চাপা পড়ে গেছে সোনাখ্যাত, বাংলার শেকড়ের সঙ্গে মিশে থাকা সোনার বাংলার অর্থকরী ফসল, সোনালি আঁশ পাট।
পাট এক সময়ের শুধু অর্থকরী ফসলই নয় এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলা ও বাঙালির সংস্কৃতি। বোনকে দিব পাটের শাড়ি, মাকে দিব রঙিন হাঁড়ি। কবি আহসান হাবিবের ‘ইচ্ছা’ নামক কবিতায় বলে দেয়, সে সময়ে পাটের গুরুত্ব ও বাঙালির সংস্কৃতির কথা। পাটের ইতিহাস অতি আদি। প্রাচীন শাস্ত্রের ইতিহাস বলছে, প্রাচীন মিসরে পাটগাছ খাদ্য হিসেবে ব্যবহার হতো। সিন্ধু সভ্যতার সময় হতে পাটের চাষাবাদ শুরু হয়। পাট বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতির একটি অবিচ্ছেদ অংশ বিশেষ। সপ্তদশের দিকে ব্রিটিশরা পাটের বাণিজ্য শুরু করে। এবং ধীরে ধীরে এটি মৌসুমি ফসল হতে রূপান্তরিত হয় বৃহৎ শিল্পে। লাভের মুখ দেখতে শুরু করলে, চাষের প্রতি ও আগ্রহ বাড়তে থাকে কৃষকের।
এ ভূ-খ-ে পাটকল গড়ে উঠতে শুরু করে পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের দিকে। সে সময় তথা ১৯৫১ সালে ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল আদমজী জুটমিল। পরে ধারাবাহিকভাবে ঢাকা, রাজশাহীসহ খুলনা অঞ্চলে একাধিক পাটকল চালু হতে শুরু করে। যার বেশির ভাগ পাটকলগুলোই ছিল লাভজনক। স্বাধীনতা পরবর্তী সময় ১৯৭২ সালে প্রথম ৬৭টি পাটকলকে সরকারি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। এরপর আরও অনেকগুলোর সমন্বয়ে মোট ৮২টি পাটকল সরকারি করে বিজেএমসির আওতায় নেওয়া হয়। এর কিছুদিন পর ১৯৭৭ সালের দিকে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোকে বেসরকারিভাবে ছেড়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়। এরপর জেনারেল এরশাদের আমলে ৩৫টি পাটকল বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া হয়। এবং সরকার পুঁজি প্রত্যাহার করে নেয় আরও ৮টি পাটকল থেকে। ১৯৯৩ সালে সংস্কার কর্মসৃষ্টির আওতায় বন্ধ করা হয় আরও ১১টি কারখানা এরপর বিএনপির সময়কালে বন্ধ হয়ে যায় আদমজী জুট মিল নামে বড় কারখানাটি। অবশিষ্ট যে ২৫টি পাটকল কোনো রকমে চলছিল সেগুলোও বন্ধ করে দেয় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
পাটকলগুলো বন্ধ হওয়ার নানা কারণ দেখানো হলেও একাধিক তথ্য বলছে পাটের সাফল্যের বিষয়ে, ক্ষমতায় থাকা প্রায় প্রতিটি সরকারের সময়েই ছিল না দীর্ঘমেয়াদি কোনো পরিকল্পনা এবং সঠিক ব্যবস্থাপনা। এই প্রধান অর্থকরী শিল্পকারখানাগুলো বন্ধ হওয়ার ফলে শুধু ঐতিহ্যকেই হারায়নি। হারিয়েছে অসংখ্য শ্রমিক, কর্মকর্তা কর্মচারী তাদের একমাত্র চাকরি। যে চাকরিটা ছিল বেঁচে থাকার অবলম্বন। ইস্টার্ন জুটমিলে তিন দশকের অধিক সময় ধরে কাজ করা শ্রমিক আব্দুল মজিদ ১১ জুলাই ২০২০ সালে প্রকাশিত নিউজ বাংলার এক সাক্ষাৎকারে বলেন, একসময় পটকলের চাকরি ছিল সোনার হরিণের মতো। আমি ১৯৭৫ সালে প্রথম চাকরিতে যাই সে সময় আমার বয়স ছিল ২২ বছর। মিলকে কেন্দ্র করে রঙিন স্বপ্ন দেখতাম। অন্য চাকরিতে বোনাস পেত না আমরা জুটমিলে বোনাস পেতাম। এ ছাড়া আরও নানা আর্থ-সামাজিক সুযোগ-সুবিধা পেতাম। তাই আগ্রহ নিয়ে চাকরি করতাম আরও ভালো কিছু হবে বলে। ছেলে-মেয়েদের মানুষ করতে পারব, এমন বুকভরা আশা নিয়ে চাকরিতে ঢুকেছিলাম আর এখন হাজার হাজার শ্রমিক চাকরি হারিয়ে পথে নেমেছে।
কালের পরিক্রমায় অযতœ অবহেলায় অনেক ইতিহাস মাটির নিচে চাপা পড়ে গেছে। ঠিক তেমনিভাবে প্রাচীনতম পাটের ইতিহাসও এক সময় মিশে যাবে। তবে প্রযুক্তির খাতিরে সংরক্ষিত থাকবে নতুন প্রজন্মের জন্য। যেমনটা আদমজী জুটমিল এখন সময়ের স্রোতধারায় আদমজী ইপিজেড। এ ছাড়া একাধিক মিল পরিত্যক্ত অবস্থায় পরে আছে, যা বোঝার কোনো উপায় নেই এটা এক সময়ে পাটকল ছিল। প্রথম প্রতিষ্ঠিত বাওয়া জুটমিলের পরেই ১৯৫০ সালে নরায়ণগঞ্জ সিদ্ধিরগঞ্জে আদমজী জুটমিল গড়ে তুলেছিল সে সময়ে পাকিস্তানের শীর্ষ শিল্পপতি এবং ধনী পরিবারে বংশধর আব্দুল ওয়াহিদ আদমজী।
পাটের চাষাবাদ আমাদের দেশ হতে কমে যাওয়ার পেছনে বর্তমান সময়ে যেসব কারণ দেখানো হচ্ছে আদৌ কি তাই? আমাদের দেশে যত পেশাজীবী মানুষ রয়েছে তাদের মধ্যে কৃষকরা তুলনামূলক সহজ সরল তাদের বুঝিয়ে বলে একটু প্রণোদনা দিলেই তাদের দিয়ে অনায়াশে কিছু করানো সম্ভব। এমন পদ্ধতি বর্তমান সময়ে কৃষি অধিদপ্তরগুলো চালিয়ে গেলেও পাট চাষে কৃষকের আগ্রহ বাড়ছে না কেন? তাহলে খুব সহজে ধরেই নেওয়া যায় আলোচনা আর সামান্য প্রণোদনায় কৃষক দেখতে পাচ্ছে না লাভের মুখ। তাহলে এর জন্য করণীয় কি, কোনো ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত। এমন চেতনার প্রত্যাক্ষ প্রকাশ আমরা আজও দেখতে পাইনি। শুধু শুনতে পাই রঙিন স্বপ্ন আর আশ্বাসের গল্প। আবেগে নদীতে গা ভাসিয়ে দেওয়া যায় কিন্তু তা বেশিক্ষণ ধরে রাখা যায় না। কৃষকেরা বলছে বীজ বোপন থেকে শুরু করে বাজারজাত করা পর্যন্ত যে পরিমাণ খরচ হয় সে তুলনায় পাওয়া যায় না নায্যমূল্য। পাশাপাশি শ্রমিক সংকট থেকে শুরু করে আঁশ ছাড়ানো পর্যন্ত পোহাতে হয় নানা বিড়ম্বনা।
পাটকল বন্ধের সঙ্গে সঙ্গে পাট চাষ কমে যাওয়ার পেছনে যেসব কারণ তুলে ধরা হয়েছে, তার মধ্যে প্লাস্টিকের বিস্তার একটি যথাযোগ্য কারণ বলে মনে করা হয়। তবে এই কারণ ছাড়াও আরও বিশেষ কিছু কারণ রয়েছে যেমন- দুর্নীতি, লোকসান, বিদ্যুৎবিভ্রাট, কাঁচামালের অভাব, বিকল্প দ্রব্যের ব্যবহার, বেসরকারি খাতে প্রতিযোগিতা, সরকারি সিদ্ধান্ত, অদক্ষতাসহ আরও ছোটখাটো কারণ রয়েছে। তবে এসব কারণগুলোর মধ্যে সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত ও অদক্ষতায় ছিল প্রধানতম কারণ। প্লাস্টিক ও সিনথেটিকের অবাধ ব্যবহারের কথা উল্লেখ হয়েছে কিন্তু বিকল্প কোনো বাজার তৈরির চেষ্টা ও দক্ষতার পরিচয় কোনো সরকারই দেখায়নি। বরং শুধু অবহেলা অবজ্ঞা আর অব্যবস্থাপনার পরিচয়ই দিয়ে গেছে। যার প্রভাবে হারিয়েছে সাধারণ কর্মচারী চাকরি। সেই সঙ্গে হারিয়ে গেছে আমাদের বাঙালির সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সোনালি অতীত।
উপরে উল্লেখিত কারণগুলো ছাড়াও সে সময়ে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার একটা গুরুত্বপূর্ণ কারণ। যার দরুন পাটকলগুলোতে লোকসান আর অবহেলা চরম আকার ধারণ করেছিল। যা ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যায় জাতীয় অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ একটা চাকা। রূপক অর্থে পাটকলকে একটা চাকা হিসেবে ধরা হলেও নেই চাকা শুধু বন্ধই নয় চাকার যাবতীয় যন্ত্রাংশও গায়েব হয়ে যায়। চাকা যে জায়গায় অবস্থান নিয়েছিল সেসব অনেক জায়গা এখনো বেদখল হয়ে গেছে। আবার অনেক জায়গা পরিত্যক্ত অবস্থায় চারণভূমিতে রূপ নিয়েছে।
৫ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের তোপের মুখে পরে আওয়ামী সরকারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তার দলীয় এমপি-মন্ত্রীরা আত্মগোপনে চলে যায় আবার অনেকে আটক হয়। ঠিক সেই মুহূর্তে বাংলাদেশ একটা কঠিন অবস্থার সম্মুখীন হলে প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্বভার কাঁধে নেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। দেশের আইনশৃঙ্খলার স্থিতিশীল করা এবং নানা পরিকল্পনার মাঝে সংস্কার নামক একটি শব্দ নিয়মিত শোনা গেলেও তেমন কোনো সংস্কার প্রত্যাক্ষ দৃশ্যমান হয় না। তবে নিঃসন্দেহে তিনি একজন বিশ্বায়নে পরিচিত মুখ এবং আন্তর্জাতিক ব্যবসা-বাণিজ্যে অভিজ্ঞ একজন ব্যক্তি। সে জায়গা থেকে সম্ভাবনাময় বাংলাদেশকে অর্থনীতির চাকা আরও শক্তিশালী করতে এক সময়ের প্রধান অর্থকরী ফসল পাটের বিশদ বিস্তারসহ বন্ধ পাটকলগুলোকে পূর্ণ সংস্কার এবং নব কৌশলে বিশ্ববাজার তৈরি করে পাটকলগুলো চালু করা হলে আরও একধাপ এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ। সেই সঙ্গে বেকারত্বের বোঝাও কিছুটা হালকা হবে।
খোরশেদ আলম রাজু
লেখক ও সাংবাদিক