প্রায় দেড় দশক পর বলিউডের বরেণ্য নির্মাতা প্রিয়দর্শন আর অভিনেতা অক্ষয় কুমার জুটির পুনর্মিলন। একসময় যাদের হাতে ‘হেরা ফেরি’, ‘গরম মসালা’, ‘ভুলভুলাইয়া’র মতো হাস্যরসের ক্লাসিক সিনেমা তৈরি হয়েছিল, সেই জুটি আবার ফিরেছে ‘ভূত বাংলো’ নিয়ে। টিজার আর ট্রেলার প্রকাশের পর থেকেই দর্শকের মনে একটি প্রশ্ন উঠেছিল- এটা কি শুধুই পুরোনো ফর্মুলার আধুনিক সংস্করণ, নাকি এই ঘরানাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করার এক আন্তরিক চেষ্টা?
‘ভূত বাংলো’ সিনেমার গল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে আছে মঙ্গলপুর নামে এক গ্রাম। নাম শুনলেই বোঝা যায়, এটি সাধারণ কোনো গ্রাম নয়। এখানে বাস্তবতার সঙ্গে মিশে আছে লোককথা, কুসংস্কার এবং ভয়াবহ কিছু বিশ্বাস। গ্রামের সবচেয়ে ভয়ংকর গল্পগুলোর একটি হলো– বিয়ের সানাই বাজলেই নাকি জেগে ওঠে এক অশুভ শক্তি, ‘বধাসুর’। সেই শক্তির উপস্থিতি শুধু আতঙ্কই নয়, পুরো সমাজ ব্যবস্থাকেই যেন স্থবির করে দেয়। যার কারণে গ্রামের মানুষরা যেন এক অদৃশ্য কারাগারে রাগারে বন্দি, যেখানে বিবাহ উৎসব মানেই মৃত্যুর অশনিসংকেত।
এই সিনেমার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ অক্ষয় কুমার। তার কমেডি টাইমিং একসময় বলিউডের অন্যতম শক্তিশালী ফর্মুলা ছিল। বিশেষ করে প্রিয়দর্শনের পরিচালনায় তিনি যে ধরনের ‘অ্যাবসার্ড সিচুয়েশনাল কমেডি’ তৈরি করেছেন। দ্রুত সংলাপ, শারীরিক কমেডি, ভুল বোঝাবুঝির ওপর ভিত্তি করে গড়া পরিস্থিতি। তা আজও দর্শকের স্মৃতিতে জীবন্ত। ‘ভূত বাংলো’য় তার চরিত্র ঘিরে যে বিশৃঙ্খলা তৈরি হবে, তা সম্ভবত একাধিক স্তরে কাজ করবে।
তবে বড় প্রশ্ন হলো– আজকের দর্শকের রুচি কি সেই পুরোনো স্টাইলকে আগের মতো উৎসাহের সঙ্গে গ্রহণ করবে? ওটিটি প্ল্যাটফর্মে আন্তর্জাতিক মানের কনটেন্টে অভ্যস্ত দর্শক এখন আর শুধু ‘অতিরঞ্জিত অভিনয়’ আর ‘চিৎকারে’ হাসেন না। তারা চান স্মার্ট কমেডি, প্রাসঙ্গিক সংলাপ এবং আপডেটেড হাস্যরস। প্রিয়দর্শন-অক্ষয়কে সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। এই সিনেমার আরেকটি বড় শক্তি হলো এর অভিনয়শিল্পীদের তালিকা।
পরেশ রাওয়াল, রাজপাল যাদব এবং আসরানি। এই তিনজনই ভারতীয় সিনেমায় কমেডির ভিন্ন ভিন্ন ধারার প্রতিনিধিত্ব করেন। পরেশ রাওয়াল সাধারণত ‘রিয়েলিস্টিক কমিক রিঅ্যাকশন’ দিয়ে দৃশ্যকে ভর ও বাস্তবতা দেন। তার সংযত অভিনয় অক্ষয়ের উন্মাদনার সঙ্গে চমৎকার কনট্রাস্ট তৈরি করে। রাজপাল যাদব বিশৃঙ্খলা ও অতিরঞ্জনের মাধ্যমে হাস্যরস তৈরি করেন। তার অপ্রেডিক্টেবল টাইমিং এবং অদ্ভুত শারীরিক ভঙ্গি প্রায়শই সিনেমার সবচেয়ে হাসির মুহূর্ত তৈরি করে।
আসরানি পুরোনো বলিউড কমেডির সেই আইকনিক রিদম বহন করেন, যেখানে অভিনয়ের চেয়ে উপস্থিতি ও ডায়লগ ডেলিভারি বেশি কাজ করে। এই তিনজন একসঙ্গে থাকলে কমেডির সম্ভাবনা প্রায় ‘এক্সপ্লোসিভ’। তবে সঠিক নিয়ন্ত্রণ ও পর্দা ভাগ না থাকলে সেটি আবার অতিরিক্ত কোলাহল ও অপ্রয়োজনীয় ‘ওভারঅ্যাক্টিংয়ে’ পরিণত হতে পারে। প্রিয়দর্শনের চ্যালেঞ্জ হলো এই তিনটি ভিন্ন কমিক স্টাইলকে একটি সুসংহত সুরে বাঁধা।
রোম্যান্স ও রহস্যের জন্য এই সিনেমায় আরও অভিনয় করেছেন ওয়ামিকা গাব্বি। অক্ষয়ের সঙ্গে তার সম্পর্ক গল্পে একটি হালকা আবেগের স্তর যোগ করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রিয়দর্শনের সিনেমায় রোম্যান্স সাধারণত খুব বেশি থাকে না; বরং এটি কমেডির মধ্যে মানবিকতা ও আবেগের ভারসাম্য তৈরি করতে আসে। খুব বেশি প্রেমের সাব প্লট কমেডির গতিকে ধীর করে দিতে পারে। এই সিনেমায় টাবুর উপস্থিতি আরও জটিল ও আকর্ষণীয় করে তুলেছে বলে অনেকেই মনে করছেন। কারণ ‘ভুলভুলাইয়া’য় তিনি যেমন রহস্যময়ী মনজুলিকার চরিত্রে দর্শকের প্রত্যাশা ভেঙেছিলেন, এখানেও তার চরিত্র ঘিরে রয়েছে রহস্য ও আবেগের এক চমৎকার মিশ্রণ।
প্রিয়দর্শন বরাবরই একটি নির্দিষ্ট সিনেম্যাটিক ভাষার জন্য পরিচিত। তার সিনেমায় ক্যামেরা সাধারণত চরিত্রের গতি অনুসরণ করে, খুব বেশি ভিজ্যুয়াল এক্সপেরিমেন্ট নয়। দ্রুত কাট, ক্লোজআপে চরিত্রের রিঅ্যাকশন এবং লং টেক যেখানে কমেডিক টাইমিং কাজ করে, এটাই তার স্বাক্ষর। তিনি চাকচিক্যের চেয়ে কাহিনি ও অভিনয়ের ছন্দকে বেশি গুরুত্ব দেন। এই সিনেমায় তিনি তাই করেছেন বলে ধারণা করছেন সিনেমাবোদ্ধারা।
‘ভূত বাংলো’য় তিনি কি সেই পুরোনো ভাষাতেই থাকছেন, নাকি নতুন প্রজন্মের দর্শকের জন্য কিছু আধুনিক ভিজ্যুয়াল স্টোরিটেলিং যোগ করেছেন? প্রিয়দর্শন যদি অতিরিক্ত পুরোনো ঢঙে ‘কমেডি’ করেন, তবে তা হয়তো যুব দর্শকের কাছে ‘ব্যাকডেটেড’ মনে হতে পারে। অন্যদিকে, তিনি যদি নিজের মৌলিক শক্তিকে অস্বীকার করে সম্পূর্ণ নতুন কিছু করার চেষ্টা করেন, তবে তা হয়তো পুরোনো ভক্তদের মন ভাঙাবে।
গতকাল সিনেমাটি মুক্তি পেয়েছে। এই সিনেমার গল্পটি বধুসুর এবং এমন একটি গ্রামের ওপর ভিত্তি করে তৈরি, যা দীর্ঘদিন ধরে বধুসুরের আতঙ্কে ভুগছে। এই হরর গল্পের পেছনে একটি ইন্টারেস্টিং ব্যাকস্টোরি রয়েছে, যা ধীরে ধীরে সামনে আসে এবং এরপর গল্পটি আরও গভীর ও আবেগঘন হয়ে ওঠে। এর বিশেষত্ব হল, এখানে ভূত এবং চরিত্রদের মধ্যে একটি অস্বাভাবিক সম্পর্ক দেখানো হয়েছে। অক্ষয় কুমার তার ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা পারফরম্যান্স দিয়েছেন। তার শার্প কমিক টাইমিং থেকে ইন্টেন্স মুহূর্তে যে সুইচ দেখা যায়, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। তার পাঞ্চলাইনগুলো একদম নিখুঁতভাবে বসেছে এবং তিনি পুরো সিনেমাটিকে নিজের কাঁধে তুলে নিয়ে এগিয়েছেন। পরেশ রাওয়াল এবং রাজপাল যাদব-এর দারুণ সাপোর্ট পেয়েছেন অক্ষয় কুমার। ফার্স্ট হাফে তাদের কমিক কেমিস্ট্রি দর্শকদের ভালোই বিনোদন দেবে।
সিনেমার ইন্টারভ্যালের পর থেকে এমন কিছু দৃশ্য আসে, যা দর্শকদের রীতিমতো শিহরিত করবে এবং শেষ পর্যন্ত বেঁধে রাখবে। পরিচালক প্রিয়দর্শন হরর, কমেডি এবং সাসপেন্সের মধ্যে একটি নিখুঁত ভারসাম্য বজায় রেখেছেন। সিনেমার বাকি টিমও ভালো কাজ করেছে। যদি আপনার ভুল ভুলাইয়া পছন্দ হয়ে থাকে, তাহলে এই সিনেমাটি আপনার সেই স্মৃতি আবার ফিরিয়ে আনবে। সামগ্রিকভাবে তিনি সিনেমাটিকে একটি নিখুঁতভাবে তৈরি এন্টারটেইনিং ফিল্ম বলা যায়। প্রথমে এই সিনেমাটি গত ১০ এপ্রিল মুক্তি পাওয়ার কথা ছিল। তবে ১৯ মার্চ মুক্তিপ্রাপ্ত ‘ধুরন্ধর ২’ বক্স অফিসে দারুণ সাফল্য পাওয়ায় সিনেমাটির মুক্তির তারিখ পিছিয়ে ১৭ এপ্রিল করা হয়।

