ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

কাঠগড়ায় সাই পল্লবী

রেজাউল করিম খোকন
প্রকাশিত: মে ৯, ২০২৬, ০১:২৭ এএম

পর্দায় যখন সে আসে, তখন কোনো কৃত্রিম প্রসাধন নয়, বরং এক চিলতে অকৃত্রিম রোদ খেলা করে। তিলমাখা গালে তার যে স্নিগ্ধ হাসি, তা যেন শরতের শিউলি ঝরা সকালের মতো পবিত্র। ঝকঝকে রুপালি পর্দার গ্ল্যামারকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে সে বেছে নিয়েছে আড়ম্বরহীন এক আভিজাত্য।

তার নাচের ছন্দে যেন পাহাড়ি ঝরনার চঞ্চলতা, আর চোখের চাহনিতে আজন্ম লালিত সারল্য। দক্ষিণী সিনেমার সেই চেনা মুখটি আজ হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছে কোনো রাজকীয় সাজে নয়, বরং স্রেফ এক টুকরো সাধারণ সুতির শাড়ি আর এক বুক আত্মবিশ্বাসের জোরে। সাই পল্লবী কেবল একজন অভিনেত্রী নন; তিনি যেন কৃত্রিমতার ভিড়ে এক ফালি তাজা বাতাস, যিনি বারবার মনে করিয়ে দেনÑ স্বাভাবিক হওয়াই আসলে সবচেয়ে সুন্দর।

সম্প্রতি এই অভিনেত্রী ‘একদিন’ সিনেমার প্রচারণা অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে ভাষা নিয়ে বিতর্কে জড়িয়েছেন। পহেলা মে মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমাটিতে আমিরপুত্র জুনাইদ খানের বিপরীতে অভিনয় করেছেন সাই পল্লবী। সিনেমাটি মুক্তির আগে প্রচারণা অনুষ্ঠানের একপর্যায়ে আমন্ত্রিত অতিথি ও পাপারাজ্জিদের সঙ্গে হিন্দিতে কথা বলার চেষ্টা করেন সাই। তবে কথা বলতে গিয়ে কিছুটা অস্বস্তিবোধ করায় তিনি নিজেই হাসিমুখে স্বীকার করেন যে, তার হিন্দি খুব একটা ভালো নয়। সাই পল্লবীর এই সরল স্বীকারোক্তির ভিডিও ভাইরাল হতেই শুরু হয় ট্রলিং।

বিশেষ করে নীতেশ তিওয়ারির আসন্ন মেগা প্রজেক্ট ‘রামায়ণ’ সিনেমায় তার ‘সীতা’ চরিত্রে অভিনয় নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন অনেকে। কেউ কেউ নীতেশ তিওয়ারির কাস্টিং নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করে বলছেন, সিনেমার হিন্দি সংস্করণে হয়তো তার কণ্ঠ ডাব করতে হবে। তবে সমালোচনার বিপরীতে সাই পল্লবীর পাশে দাঁড়িয়েছেন তার ভক্তরা।

তাদের মতে, ভারতীয় সিনেমায় ভাষাগত সীমাবদ্ধতা নতুন কিছু নয়। অনেকেই উদাহরণ টেনে বলেছেন, ক্যাটরিনা কাইফ কিংবা জ্যাকুলিন ফার্নান্দেজও শুরুতে হিন্দিতে দুর্বল ছিলেন, কিন্তু তবুও সফল হয়েছেন। সাই পল্লবী নিজেই হাসিমুখে স্বীকার করেছেন যে, তার হিন্দিতে দখল খুব একটা ভালো নয়। এই ঘটনার ভিডিওটি দ্রুত সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে সমালোচনার ঝড় ওঠে। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন যে, যিনি সাধারণ কথা বার্তাতেই হিন্দিতে সাবলীল নন, তিনি নীতিশ তিওয়ারির মতো পরিচালকের ‘রামায়ণ’-এ ‘সীতা’র মতো গম্ভীর ও গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে সংলাপ দেবেন কীভাবে? নেটিজেনদের একাংশ এই কাস্টিং নিয়ে পরিচালকের সিদ্ধান্তকেও কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন। তবে ট্রোলের বিপরীতে সাই পল্লবীর সমর্থনেও সরব হয়েছেন অনেকে।

তাদের দাবি, একজন দক্ষ অভিনেত্রীর জন্য ভাষাজ্ঞানই সব নয়। দক্ষিণী এই অভিনেত্রীর অভিনয় ক্ষমতার ওপর আস্থা রেখে তারা বলছেন, বহু অভিনেতা ভিন্ন ভাষায় কাজ করেন এবং সংলাপ শেখা বা ডাবিংয়ের মাধ্যমে সেই সমস্যা সহজেই মেটানো সম্ভব। তাই শুধু উচ্চারণ বিচার করে তার অভিনয় প্রতিভাকে ছোট করা উচিত নয়।

টিজার প্রকাশের পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘রামায়ণ’ সিনেমাটি নিয়ে চলছে ব্যাপক আলোচনা। বিশেষ করে রণবীর কাপুরের লুক দর্শকদের মধ্যে নতুন করে কৌতূহল তৈরি করেছে। যদিও এখনো সীতা ও রাবণের পূর্ণাঙ্গ লুক প্রকাশ করা হয়নি, তবুও একঝলক দেখেই ভক্তদের আগ্রহ বেড়েছে কয়েকগুণ। সম্প্রতি টিজার প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে সহ-অভিনেত্রী সাই পল্লবীকে নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন রণবীর কাপুর। তিনি বলেন, ‘আমরা সবাই জানি সাই পল্লবী একজন অসাধারণ অভিনেত্রী। যেদিন প্রথম তাকে সীতা হিসেবে দেখি, তখনই মনে হয়েছিল এই চরিত্রের জন্য তার চেয়ে উপযুক্ত কাউকে পাওয়া সম্ভব নয়।’

দক্ষিণী সিনেমার মেধাবী এবং ইনোসেনট চেহারা ও ইমেজের জন্য জনপ্রিয় এই অভিনেত্রীর হিন্দি সিনেমায় অভিষেক হয়েছে ‘একদিন’ সিনেমার মাধ্যমে। সম্প্রতি সিনেমার প্রিমিয়ার প্রদর্শনী চলাকালীন আমির খানকে বেশ আবেগপ্রবণ দেখায়। অভিনয় নিয়ে তিনি ভরপুর প্রশংসা করেন, বিশেষ করে সাই পল্লবীর কাজ তাকে মুগ্ধ করেছে।

নীলগিরির কোটাগিরির এক সাধারণ পরিবারের মেয়ে, যার স্বপ্ন ছিল হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ হওয়া। সেই মেয়েই আজ দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমার অন্যতম শক্তিশালী অভিনেত্রী। তিনি সাই পল্লবী। ১৯৯২ সালের ৯ মে তামিলনাড়ুর কোয়েম্বাটুরে জন্ম সাই পল্লবীর। ছোটবেলা কেটেছে নীলগিরির কোটাগিরিতে। নাচের প্রতি ঝোঁক ছিল ছোট থেকেই, যদিও কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ছিল না। স্কুলজীবনে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার পর তিনি টেলিভিশনের নাচের রিয়্যালিটি শোতেও অংশ নেন। তবে সেখান থেকে তেমন জনপ্রিয়তা না পেলেও, তার প্রতিভা নজর কাড়ে। এরপর তিনি জর্জিয়ার তিবলিসি স্টেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাশাস্ত্র পড়তে যান। লক্ষ্য ছিল চিকিৎসক হওয়া। সেই সময়েই এক চলচ্চিত্র পরিচালকের নজরে আসেন তিনি। প্রথমে প্রস্তাব ফিরিয়ে দিলেও পরে অডিশনের পর রাজি হন অভিনয়ে।

২০১৫ সালে মুক্তি পায় তার প্রথম সিনেমা ‘প্রেমাম’। কোনো প্রচার ছাড়াই মুক্তি পাওয়া এই সিনেমা ব্যাপক সাফল্য পায়। সিনেমাতে তার স্বাভাবিক ও অনাড়ম্বর অভিনয় দর্শকদের মন জয় করে নেয়। কলেজের ছুটিতে শুটিং শেষ করে তিনি। ২০১৬ সালে নিজের চিকিৎসাবিজ্ঞানের ডিগ্রিও সম্পূর্ণ করেন। তবে এরপর আর চিকিৎসক হিসেবে পেশায় যোগ দেননি। ‘প্রেমাম’-এর পর তার ক্যারিয়ার গড়ে ওঠে একেবারে আলাদা পথে। ২০১৬ সালে ‘কালী’ সিনেমাতে অভিনয় করেন। ২০১৭ সালে তেলুগু সিনেমা ‘ফিদা’ তাকে বিপুল জনপ্রিয়তা এনে দেয়। একই বছরে ‘মিডল ক্লাস আব্বাই’ সিনেমাতেও দেখা যায় তাকে।

২০১৮ সালে ‘মারি ২’ সিনেমার ‘রাউডি বেবি’ গান ইউটিউবে এক বিলিয়ন ভিউ ছাড়িয়ে যায়, যা দক্ষিণ ভারতের প্রথম ভিডিও হিসেবে নজির গড়ে। ২০১৯ সালে ‘অথিরণ’ সিনেমাতে এক অটিজম আক্রান্ত তরুণীর চরিত্রে অভিনয় করে প্রশংসা কুড়ান তিনি। একই বছরে ‘এনজিকে’ সিনেমাতেও অভিনয় করেন। ২০২০ সালে ‘পাভা কাধাইগল’ সংকলনে তার অভিনয় নজর কাড়ে। ২০২১ সালে ‘লাভ স্টোরি’ এবং ‘শ্যাম সিংহ রায়’ দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ঘরানার সিনেমাতে অভিনয় করে নিজের দক্ষতার প্রমাণ দেন।

২০২২ সালে ‘বিরাটা পর্বম’ এবং ‘গার্গি’ সিনেমাতে অভিনয় করে তিনি আরও একধাপ এগিয়ে যান। বিশেষ করে ‘গার্গি’ সিনেমাতে তার সংযত অভিনয় ব্যাপক প্রশংসিত হয়। ২০২৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘অমরণ’ সিনেমাতে তিনি শহিদ সেনা কর্মকর্তা মেজর মুকুন্দ বরদারাজনের স্ত্রীর চরিত্রে অভিনয় করেন, যা দর্শকদের আবেগতাড়িত করে। অনূর্ধ্ব ৩০ তালিকায় স্থান পান এবং ২০২১ সালে তামিলনাড়ু সরকারের ‘কালাইমামণি’ সম্মানে ভূষিত হন।

সামনে বৃহৎ বাজেটের ‘রামায়ণ’ অবলম্বনে নির্মিত সিনেমাতে সীতার ভূমিকায় দেখা যাবে তাকে। দশ বছর ধরে বেছে বেছে কাজ করে, নিজের শর্তে ক্যারিয়ার গড়ে তুলেছেন ৩৩ বছর বয়সি সাই পল্লবী। তাই বলা যায়, তিনি বলিউডে জায়গা খুঁজতে যাননি, বরং বলিউডই তার কাছে পৌঁছেছে।

‘কল্কি’ সিনেমাতে দীপিকা পাড়ুকোনের জায়গায় অভিনয় করছেন সাই পল্লবী। দীপিকার আট ঘণ্টার কাজের দাবি নিয়ে বহু দিন ধরে তরজা চলেছে বি-টাউনে। এর জেরে হাতছাড়া হয় ‘কল্কি ২৮৯৮ এডি’র সিকুয়েলও। প্রথম সিনেমাতে অতি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন দীপিকা। সেই চরিত্রটি ছাড়া সিকুয়েল প্রায় অসম্ভবই ছিল। কিন্তু সেই সিনেমাতেই দীপিকা অভিনীত চরিত্রে সাই পল্লবীকে দেখা যাবে। ‘কল্কি ২৮৯৮ এডি’র দর্শকদের অবশ্য অনুমান, সিকুয়েলে হয়তো দীপিকার চরিত্রটিকে মৃত হিসাবে দেখানো হবে। নতুন একটি চরিত্রে পরিচয় করানো হবে সাইকে।

দক্ষিণী সিনেমায় স্বাভাবিক ও প্রাণবন্ত অভিনয়ের জন্য আলাদা পরিচিতি পেয়েছেন সাই পল্লবী। এবার তিনি অভিনয় করতে যাচ্ছেন ভারত রতœপ্রাপ্ত কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী এম এস সুব্বুলক্ষ্মীর বায়োপিকে। ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের ইতিহাসে এম এস সুব্বুলক্ষ্মী এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। এমন এক ব্যক্তিত্বকে পর্দায় জীবন্ত করে তোলা নিঃসন্দেহে বড় চ্যালেঞ্জ। সেই চ্যালেঞ্জই গ্রহণ করেছেন সাই পল্লবী। নাম চূড়ান্ত না হওয়া সিনেমাটিতে প্রধান ভূমিকায় অভিনয় করবেন কোন অভিনেত্রী, বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই দক্ষিণী সিনেমাঅঙ্গনে বেশ আলোচনা চলছিল। নির্মাতাদের পক্ষ থেকে শিগগিরই আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসতে পারে বলেও শোনা যাচ্ছে। তবে ঘোষণার আগেই সুব্বুলক্ষ্মীর চরিত্রের প্রস্তুতি শুরু করেছেন সাই পল্লবী।

বরেণ্য এই কণ্ঠশিল্পীর জীবন, পরিবেশনা ভঙ্গি, শাস্ত্রীয় সংগীতের ধারা সব গভীরভাবে গবেষণা করছেন তিনি। সাই পল্লবীর অভিনয় জীবনের দিকে তাকালে দেখা যায়, তিনি চরিত্রের গভীরে প্রবেশ করতে ভালোবাসেন। বাণিজ্যিক সাফল্যের চেয়ে গল্প ও চরিত্রকে বেশি গুরুত্ব দেন। ফলে এম এস সুব্বুলক্ষ্মীর মতো ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বের চরিত্র তার ক্যারিয়ারের অন্যতম চ্যালেঞ্জিং অধ্যায় হয়ে উঠতে পারে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে কণ্ঠভঙ্গি, মুদ্রা, মঞ্চে উপস্থিতি। এসব সূক্ষ্ম বিষয় ফুটিয়ে তুলতে প্রয়োজন দীর্ঘ অনুশীলন।

বর্তমানে ভাষা ও কাস্টিং নিয়ে বিতর্কের কেন্দ্রে থাকলেও সাই পল্লবীর সাবলীল অভিনয়দক্ষতা নিয়ে ভক্তদের মনে কোনো সন্দেহ নেই। এখন দেখার বিষয়, আগামীতে ‘রামায়ণ’র মতো বড় প্রজেক্টে এই সমালোচনা তিনি কীভাবে কাটিয়ে ওঠেন।