রুপালি পর্দার আলো-আঁধারিতে কত তারকার আগমন ঘটে, আবার সময়ের নিয়মে হারিয়েও যায়। কিন্তু কিছু মুখ এমনভাবে দর্শকের হৃদয়ে দাগ কেটে যায়, যাদের কোনো বিকল্প তৈরি হয় না। ঢালিউড সিনেমার ইতিহাসের তেমনই এক কালজয়ী ও অদ্বিতীয় নাম দিলদার। আজ ১৩ জুলাই, ঢাকাই চলচ্চিত্রের এই কৌতুক অভিনেতার ২৩তম মৃত্যুবার্ষিকী।
২০০৩ সালের এই বিষাদময় দিনে মাত্র ৫৮ বছর বয়সে কোটি ভক্তকে কাঁদিয়ে না ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন তিনি। দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও ঢালিউডে তার রেখে যাওয়া শূন্যস্থান আজও পূরণ হয়নি।
নব্বইয়ের দশকে প্রেক্ষাগৃহে দিলদারের পর্দায় আগমন মানেই ছিল দর্শকদের করতালি আর হাসির রোল। এমন একটা সময় ছিল যখন শুধু দিলদারের নাম দেখেই সিনেমা হলে টিকিট কাটতেন দর্শক। নায়ক-নায়িকার রোমান্স বা খলনায়কের মারকুটে অ্যাকশনের মাঝেও দর্শক অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতেন দিলদারের ক্ষণিকের উপস্থিতির জন্য। অঙ্গভঙ্গি, সংলাপ প্রক্ষেপণের নিজস্ব ঢং আর নিখুঁত কমিক টাইমিং দিয়ে তিনি সিনেমার অন্যতম মূল আকর্ষণ হয়ে উঠতেন।
১৯৭২ সালে ‘কেন এমন হয়’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে রুপালি পর্দায় অভিষেক হওয়া এই অভিনেতা অভিনয় করেছেন চার শতাধিক চলচ্চিত্রে। ‘বেদের মেয়ে জোসনা’, ‘বিক্ষোভ’, ‘অন্তরে অন্তরে’, ‘কন্যাদান’, ‘চাওয়া থেকে পাওয়া’ কিংবা ‘আম্মাজান’Ñ প্রতিটি সিনেমাতেই তার অভিনয় ছিল অনন্য ও দাগ কাটার মতো।
দিলদারের জনপ্রিয়তা এতটাই তুঙ্গে ছিল যে, কৌতুক অভিনেতার চেনা খোলস ভেঙে তাকে মূল নায়ক করে নির্মাণ করা হয়েছিল ‘আব্দুল্লাহ’ নামের একটি সিনেমা। ঢালিউডের জনপ্রিয় নায়িকা নতুনের বিপরীতে সেই চলচ্চিত্রে দিলদারের অভিনয় শুধু ব্যবসায়িক সফলতাই এনে দেয়নি, বরং তৈরি করেছিল এক নতুন ইতিহাস। সিনেমার গানগুলোও তখন মানুষের মুখে মুখে ফিরত।
২০০৩ সালে ‘তুমি শুধু আমার’ চলচ্চিত্রের জন্য সেরা কৌতুক অভিনেতা হিসেবে ‘জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার’ লাভ করেন তিনি। কিন্তু নিয়তির কী নির্মম পরিহাস, যে বছর তিনি কাজের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পেলেন, সেই বছরই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করতে হলো তাকে।
১৯৪৫ সালের ১৩ জানুয়ারি চাঁদপুরে জন্ম নেওয়া এই গুণী অভিনেতা আজ শারীরিকভাবে আমাদের মাঝে নেই। ডেমরার সানারপাড়ে চিরনিদ্রায় শায়িত থাকলেও তিনি বেঁচে আছেন এ দেশের চলচ্চিত্রপ্রেমীদের মনে।
আজকের প্রজন্মের কাছেও দিলদার সমানভাবে জনপ্রিয়। বর্তমানের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমÑ ফেসবুক রিলস কিংবা টিকটকে তার সিনেমার মজার মজার ক্লিপগুলো এখনো কোটি কোটি ভিউ পায়, যা প্রমাণ করে যে সত্যিকারের প্রতিভা কখনো পুরোনো হয় না।
চলচ্চিত্র অঙ্গনের অনেকেই আক্ষেপ করে বলেন, দিলদারের পর ঢালিউডে কৌতুক ঘরানার অভিনয়ে এক বিশাল খরা তৈরি হয়েছে। অনেকেই তার জায়গা নেওয়ার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু ‘দিলদার’ তো একজনই হয়। মৃত্যুবার্ষিকীতে এই হাসির রাজার প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।

