এ সময়ের ছোটপর্দার দর্শকপ্রিয় অভিনেত্রী সাদনিমা বিনতে নোমান। শিশুশিল্পী হিসেবে পর্দায় যাত্রা শুরু করলেও মাঝে পড়াশোনার জন্য চার বছরের একটি দীর্ঘ বিরতি নিয়েছিলেন। সেই বিরতি ভেঙে অভিনয়ে নতুনভাবে দর্শকদের মন জয় করছেন তিনি। এরই মধ্যে নাম লেখিয়েছেন বড় পর্দায়ও। সম্প্রতি রূপালী বাংলাদেশের সঙ্গে আলাপকালে তিনি কথা বলেছেনÑ তার বর্তমান ব্যস্ততা, অভিজ্ঞতা এবং বিনোদন ইন্ডাস্ট্রির নানা দিক নিয়ে।
গত রোজার ঈদে নতুনভাবে দর্শকপ্রিয়তা পেলেও এবারের ঈদে সাদনিমার কাজ নিয়ে অনুরাগী ও দর্শকদের মধ্যে বাড়তি আগ্রহ ছিল। দর্শকদের ইতিবাচক প্রতিক্রিয়ায় উচ্ছ্বসিত সাদনিমা বলেন, ‘খুবই ভালো সাড়া পেয়েছি। স্বল্প সময়ে দর্শকরা আমার কাজের বেশ প্রশংসা করেছেন। রোজার ঈদের পর থেকেই মানুষ আমাকে নতুন লুকে গ্রহণ করতে শুরু করেছিল, আর এবারের ঈদে তারা আমার নতুন কাজের জন্য রীতিমতো অপেক্ষায় ছিলেন।’
বর্তমানে তিনি চাকরি ও অভিনয়Ñ দুই মাধ্যমেই সময় দিচ্ছেন। ঈদের আগে বেশ কাজের চাপ থাকলেও ঈদের পর নাটক নিয়ে ব্যস্ততা কিছুটা কম। তবে কয়েকটি নতুন প্রজেক্ট নিয়ে আলোচনা চলছে এবং আগস্ট মাস থেকে আবার পুরোদমে শুটিংয়ের ব্যস্ততা শুরু হবে বলে জানান তিনি। শিশুশিল্পী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা শিল্পীদের জন্য প্রাপ্তবয়স্ক চরিত্রে অভিনয় শুরু করার ক্ষেত্রে এক ধরনের ‘ইমেজ সংকট’ তৈরি হয়। তবে সাদনিমার ক্ষেত্রে বিষয়টি ঘটেছে বেশ স্বাভাবিক ও সহজভাবে। তিনি মনে করেন, পড়াশোনার জন্য চার বছরের বিরতি নেওয়াটা তার ক্যারিয়ারের জন্য দারুণ একটি সিদ্ধান্ত ছিল।
সাদনিমার ভাষায়, ‘প্রথমে মনে হয়েছিল হয়তো বিরতি নিয়ে ভুল করে ফেলেছি। কিন্তু এখন বুঝি, সিদ্ধান্তটা একদম সঠিক ছিল। চার বছরে চেহারায় একটা প্রাপ্তবয়স্ক ভাব এসেছে, কোনো অতিরিক্ত বা কৃত্রিম চেষ্টা চালাতে হয়নি। দর্শকরাও এখন আগের সেই ছোট্ট মেয়েটির সঙ্গে বর্তমানের সাদনিমাকে সহজেই মিলিয়ে নিতে পারছেন।’
চলতি বছরের শুরুর দিকে ‘রাক্ষস’ সিনেমার শুটিংয়ের জন্য প্রথমবার বিদেশে (শ্রীলঙ্কা) সফর করেছিলেন সাদনিমা। সেখানে বেশ বড় পরিসরে সুসংগঠিতভাবে কাজের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিয়ে তিনি জানান, পুরো আয়োজন ছিল অত্যন্ত পরিপাটি। বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার যৌথ দলের সমন্বয়ে কাজটি খুব মসৃণভাবে সম্পন্ন হয়েছে। পাঁচ দিনের এই সফরে তিন দিন শুটিং করেছেন এবং বাকি দুই দিন শ্রীলঙ্কার সৌন্দর্য উপভোগ করেছেন তিনি।
সমসাময়িক অন্যান্য কাজের ভিড়ে নিজের চরিত্রগুলোকে কীভাবে আলাদা করেন। এমন প্রশ্নে সাদনিমা স্পষ্ট জানান, তিনি গল্পভিত্তিক কাজে বিশ্বাসী। চিত্রনাট্য পাওয়ার পর বাসায় কয়েকবার পড়ার পাশাপাশি নির্মাতার ভাবনাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেন। কারণ তার মতে, চরিত্রের রূপায়ণে নির্মাতার দৃষ্টিকোণ বুঝে কাজ করাটাই আসল।
চলচ্চিত্র ও নাট্যাঙ্গনের অনুপ্রেরণা হিসেবে তিনি গুণী অভিনেত্রী জয়া আহসানের নাম উল্লেখ করেন। দীর্ঘ সময় ধরে নিজেকে মানসম্মত কাজের মাধ্যমে প্রাসঙ্গিক রাখা এবং নিজের ব্যক্তিত্ব বজায় রাখার যে গুণ জয়া আহসানের রয়েছে, তা সাদনিমাকে সবসময় অনুপ্রাণিত করে। এ ছাড়া গল্প ও চরিত্র যদি প্রভাব ফেলার মতো হয়, তবে রোমান্টিক বা নাটকের বাইরে থ্রিলার কিংবা ডার্ক ঘরানার চরিত্রেও অভিনয় করতে তিনি প্রস্তুত।
ইন্ডাস্ট্রিতে সিন্ডিকেট বা স্বজনপ্রীতি (নেপোটিজম) নিয়ে আলোচনা থাকলেও নিজের অভিজ্ঞতায় এমন কিছুর মুখোমুখি হননি বলে জানান সাদনিমা। শিশু বয়স থেকেই অভিভাবকের সহায়তায় কাজ করায় এবং বর্তমানেও সিনিয়রদের থেকে স্নেহ-ভালোবাসা পাওয়ায় কাজের পরিবেশ নিয়ে তিনি ইতিবাচক।
‘সাদনিমা’ নামের উচ্চারণ নিয়ে শৈশব থেকেই নানা মজার ও বিরক্তিকর অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছেন তিনি। হাসিমুখে এই অভিনেত্রী বলেন, ‘ছোটবেলায় শিক্ষক বা সহপাঠীরা নাম ভুল উচ্চারণ করলে খুব রাগ হতো বা কষ্ট পেতাম। কিন্তু এখন অভ্যস্ত হয়ে গেছি। এমনকি কোনো নাটকের পোস্টার বা ট্রেলার এলে আমি নিজের ছবির বদলে আগে দেখি নামের বানানটা ঠিক লেখা হয়েছে কি না! এখনো অনেক সময় নাম ভুল টাইপ করা হয়, তবে আশা করি দর্শকরা ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হয়ে যাবেন।’
করপোরেট জগৎ এবং শোবিজÑ দুই মাধ্যমেই কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে সাদনিমার। সমাজে কর্মজীবী নারীদের নানা অনাকাক্সিক্ষত প্রস্তাব বা প্রতিকূলতার সম্মুখীন হওয়া নিয়ে খোলামেলা কথা বলেন তিনি। তার মতে, এটি কেবল গ্ল্যামার ওয়ার্ল্ড বা মিডিয়া জগতের সমস্যা নয়, বরং পুরুষতান্ত্রিক সমাজে সব সেক্টরেই নারীদের টিকে থাকার লড়াই করতে হয়। মিডিয়া ব্যক্তিত্বদের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে সাধারণ মানুষের কৌতূহল বেশি থাকে বলেই হয়তো এখানকার কথাগুলো বেশি চর্চায় আসে।
অবাঞ্ছিত পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়া এবং তা সামলানোর কৌশল নিয়ে নিজের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে সাদনিমা বলেন, ‘হ্যাঁ, অনাকাক্সিক্ষত প্রস্তাবের মুখোমুখি যে হইনি তা নয়, তবে তা কখনোই সীমা অতিক্রম করার মতো ছিল না। আমি সবসময় চেষ্টা করি কোনো রকম অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি না করে, বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে বিষয়টি না বোঝার ভান করে সেখান থেকে হাসিমুখে সরে আসতে। আমার মনে হয় প্রতিটি নারীরই অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতিতে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটিয়ে সাবলীলভাবে এড়িয়ে যাওয়া উচিত।’
সব মিলিয়ে, নিজস্ব মেধা, ব্যক্তিত্ব এবং বুদ্ধিমত্তা দিয়ে ক্যারিয়ারের প্রতিটি ধাপ পেরিয়ে সাদনিমা বিনতে নোমান এগিয়ে যাচ্ছেন এক সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতের দিকে।

