ঢাকা রবিবার, ১৪ জুন, ২০২৬

বিএনপির ভোটব্যাংকে জামায়াত ইসলামী আন্দোলনের চ্যালেঞ্জ

মশিউর রহমান রাসেল, নলছিটি
প্রকাশিত: জানুয়ারি ২৮, ২০২৬, ০৬:৫৮ এএম

ঝালকাঠি-২ সংসদীয় আসনে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক অঙ্গনে বাড়ছে উত্তেজনা। ব্যতিক্রমীভাবে এবারে তিন প্রধান প্রার্থীর বাড়িই একই উপজেলা- নলছিটি। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলনের এই প্রার্থীরা সবই পরিচিত, ক্লিন ইমেজধারী এবং স্থানীয়ভাবে জনপ্রিয়।

নলছিটির সাধারণ ভোটারদের মধ্যে এ নিয়ে ব্যাপক মিথস্ক্রিয়া লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিশেষ করে যারা কোনো দলের সক্রিয় কর্মী নন-এমন একটি বড় ভোটারগোষ্ঠী এখন পড়েছে দ্বিধায়। অনেক ভোটারের বক্তব্য, তিনজন প্রার্থীই আলাদা আলাদা জায়গা থেকে যোগ্য; কাউকে কারো তুলনায় অযোগ্য বলা কঠিন। ফলে ‘কাকে ভোট দেবেন’Ñএই প্রশ্নের উত্তর এখনো অনেকেই খুঁজে পাচ্ছেন না।

বিএনপি মনোনীত প্রার্থী সাবেক সংসদ সদস্য ইসরাত সুলতানা ইলেন ভুট্টো প্রয়াত সাংসদ মরহুম জুলফিকার আলী ভুট্টোর সহধর্মিণী। নলছিটির রাজনীতিতে ‘ভুট্টো’ নামটি দীর্ঘদিন ধরেই সম্মান, আবেগ ও আস্থার প্রতীক। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশের কাছে প্রয়াত সাংসদ ভুট্টো এবং তার পরিবার এখনো জনপ্রিয়। দীর্ঘ বছর ধরে নলছিটি উপজেলা ইলেন ভুট্টোর শক্ত ভোটব্যাংক হিসেবে পরিচিত। তবে এবারের নির্বাচনে সেই ভোটব্যাংকে জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলনের সক্রিয় উপস্থিতি বিএনপি শিবিরে কিছুটা দুশ্চিন্তার সৃষ্টি করেছে। স্থানীয় পর্যায়ে লক্ষ্য করা যাচ্ছে, ইসলামপন্থি দলগুলোর প্রতি একটি অংশের ভোট ঝুঁকে পড়ায় নলছিটিতে বিএনপির ব্যবধান কমে যেতে পারে-এমন আশঙ্কাও করছেন দলের সমর্থকরা। তবে এসব শঙ্কার মাঝেও আত্মবিশ্বাসী বিএনপি নেতাকর্মীরা। তাদের দাবি, নলছিটিতে কিছু ভোট কমলেও ঝালকাঠি সদর উপজেলা থেকে সেই ঘাটতি পুষিয়ে নেওয়ার সুস্পষ্ট পরিকল্পনা অনুযায়ী মাঠপর্যায়ে কাজ চলছে। সদর উপজেলায় দলীয় সংগঠন তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী হওয়ায় সেখানে ভালো ফলের ব্যাপারে তারা আশাবাদী।

এ ছাড়াও ইলেন ভুট্টোর পক্ষে বড় শক্তি হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে তার অতীত রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা। ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা আমির হোসেন আমুকে বিপুল ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। সেই সময় তিনি এই অঞ্চলের সড়ক যোগাযোগ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেনÑযার প্রভাব এখনো এলাকায় দৃশ্যমান বলে দাবি বিএনপি নেতাদের। এই অভিজ্ঞতা, পারিবারিক গ্রহণযোগ্যতা এবং অতীত উন্নয়ন কর্মকা-ের স্মৃতিকে পুঁজি করেই ইলেন ভুট্টো শিবির শতভাগ জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী।

জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী শেখ নেয়ামুল করিম তুলনামূলক তরুণ হলেও রাজনৈতিকভাবে পরিচিত মুখ। তিনি বরিশাল বিএম কলেজের সাবেক এজিএস ছিলেন। ছাত্রজীবনে নলছিটির অসংখ্য শিক্ষার্থীর পাশে দাঁড়ানোর জন্য আজও অনেকেই কৃতজ্ঞতার সঙ্গে তার নাম স্মরণ করেন। এ ছাড়াও বিদেশি অর্থায়নে এলাকায় মসজিদ নির্মাণ ও নিরাপদ পানীয় জলের জন্য গভীর নলকূপ স্থাপনের মাধ্যমে সামাজিক কর্মকা-ে তার সক্রিয় ভূমিকা রয়েছে। ক্লিন ইমেজ, সাংগঠনিক দক্ষতা ও সাবেক ছাত্রনেতা পরিচয়ের কারণে তার অবস্থানকেও বেশ শক্ত বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী ডা. সিরাজুল ইসলাম সিরাজী নও মুসলিম একজন ধর্মীয় বক্তা হিসেবে দেশজুড়ে পরিচিত। দীর্ঘদিন ধরেই তিনি নলছিটিতে বসবাস করছেন এবং এলাকাবাসীর সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে।

গরিব-ধনী নির্বিশেষে সব শ্রেণির মানুষের সঙ্গে তার সুসম্পর্ক, মিষ্টভাষী স্বভাব ও হাস্যোজ্জ্বল আচরণ তাকে সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয় করে তুলেছে। স্থানীয়দের মতে, তিনি সব সময় মানুষের চোখের সামনেই থেকেছেনÑযা তার বড় রাজনৈতিক শক্তি।

অনেক সাধারণ ভোটারের মতে, জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলনের মধ্যে যে জোটের সম্ভাবনা ছিল, তা অটুট থাকলে ইসলামপন্থি ভোট একত্রিত হয়ে এই আসনে আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারত। জোট ভেঙে যাওয়ায় দলীয় রাজনীতির বাইরে থাকা ভোটারদের মধ্যে এক ধরনের আক্ষেপও লক্ষ্য করা গেছে।

সব মিলিয়ে ঝালকাঠি-০২ আসনের নির্বাচন এবার হয়ে উঠেছে ব্যক্তি-ইমেজ, অতীত অভিজ্ঞতা, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা ও আবেগের এক জটিল সমীকরণ। প্রচারণার শেষ মুহূর্ত থেকে শুরু করে ভোটের দিন পর্যন্ত কোন প্রার্থী কতটা ভোটারকে নিজের পক্ষে টানতে পারেন- সেই দিকেই তাকিয়ে আছে পুরো এলাকা।