ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

বালিয়াটি জমিদার বাড়িতে দর্শনার্থীদের ঢল

সাটুরিয়া (মানিকগঞ্জ) প্রতিনিধি
প্রকাশিত: জুন ১, ২০২৬, ১১:৫৬ পিএম

ঈদের দীর্ঘ ছুটিতে মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলার ঐতিহাসিক বালিয়াটি জমিদার বাড়িতে দর্শনার্থীদের উপচেপড়া ভিড় দেখা গেছে। ইতিহাস, স্থাপত্যশৈলী ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের টানে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে পরিবার-পরিজন ও বন্ধুদের নিয়ে এখানে ছুটে আসছেন ভ্রমণপিপাসুরা।

ঈদের পঞ্চম দিন সোমবার বিকেলে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, জমিদার বাড়ির চারপাশে উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। বাইরে সারিবদ্ধ মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত যানবাহন, আর প্রবেশপথের টিকিট কাউন্টারে দর্শনার্থীদের ভিড়। প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য প্রবেশমূল্য ৩০ টাকা এবং শিশুদের জন্য ২০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

বালিয়াটি জমিদার বাড়ির সহকারী কাস্টোডিয়ান মোহাম্মদ নিয়াজ মাখদুম জানান, ঈদে শান্তিপূর্ণভাবে কয়েক হাজার দর্শনার্থীরা বালিয়াটি জমিদার বাড়ি বেড়াতে আসেন। পুরাতন অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রয়োজনে সংস্কার বিষয়ে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মিজ আফরোজা খানম রিতা মহোদয়কে  অবগত করা হয়েছে। সংস্কার ও অবকাঠামো উন্নয়ন হলে দর্শনার্থীর সংখ্যা ভবিষ্যতে আরও বাড়বে। 

সাটুরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ অনিক ইসলাম বলেন, ঈদের ছুটিতে শুধু বালিয়াটি জমিদার বাড়িই নয়, উপজেলার ধলেশ্বরী নদী ও নাহার গার্ডেনেও পর্যটকদের ব্যাপক সমাগম ঘটেছে। দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। পাশাপাশি বালিয়াটি জমিদার বাড়িকে আরও আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে বিভিন্ন উন্নয়ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

উল্লেখ্য, সাটুরিয়া উপজেলার প্রায় দুশ’ বছরের ইতিহাস-ঐতিহ্য বুকে লালন করে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে বালিয়াটি জমিদার বাড়ি। আনুমানিক ১৭৯০ খ্রিষ্টাব্দে বালিয়াটি জমিদার বাড়িটির গোড়াপওন হয়। ১৩০০ বঙ্গাব্দের ১ বৈশাখ এই বাড়ির জমিদাররা গৃহে প্রবেশ করে বলে জানা যায়। বালিয়াটি জমিদার বাড়ির পূর্ব পুরুষ গোবিন্দ রায় সাহা ছিলেন একজন স্বনামধন্য লবণ ব্যবসায়ী। এই বাড়ির উওর-পশ্চিম পাশে লবণের একটা বড় গোলাবাড়ি ছিল। এ জন্যই এই বাড়ির নাম রাখা হয়েছিল গোলাবাড়ি।

গোবিন্দ রায় সাহার পরবর্তী বংশধরা হলেনÑ দাধী রাম, প-িত রাম, আনন্দ রাম ও গোলাপ রাম। এই পরিবারের স্মরণীয় অন্যান্য ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন নিত্যানন্দ রায় চৌধুরী, বিন্দাবন চন্দ্র, জগন্নাথ রায়, কানায় লাল, কিশোরি লাল, ঈম্বর চন্দ্র রায় চৌধুরী প্রমুখ।

ঢাকার জগন্নাথ মহাবিদ্যালয় (বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়) প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তাদেরই বংশধর বাবু কিশোরিলাল রায়। বালিয়াটি জমিদার বাড়ি ৫.৮৮ জমির ওপর নির্মিত।  বালিয়াটি জমিদার বাড়ির প্রতিটি প্রবেশ পথের চূড়ায় রয়েছে চারটি সিংহ মূর্তির সামনেই রয়েছে পাকা ঘাট বাঁধা বড় একটি পুকুর। বালিয়াটি জমিদার বাড়িতে সাতটি প্রাসাদতুল্য ইমারতে মোট ২০০টি কক্ষ রয়েছে। প্রবেশ করতেই ভেতরে নানা রকমের ফুলরাজি সমৃদ্ধ প্রাচীন সৌন্দর্য যেন দৃষ্টিনন্দিত।

বালিয়াটি জমিদার বাড়িতে পূর্ববাড়ি, পশ্চিমবাড়ি, উত্তরবাড়ি, মধ্যবাড়ি এবং গোলাবাড়ি নামে ৫টি বড় ভবন রয়েছে। জমিদার বাড়ির প্রথম সারিতে চারটা ভবন রয়েছে। এগুলো নির্মাণশৈলী প্রায় একই রকম। চারটা জমিদারবাড়িই প্রায় ৫০ ফিট উঁচু একটা প্রাসাদ এতই কারুকার্যে ভরা যে, দর্শনার্থীরা প্রতি মুহূতেই বিস্মিত হয়। আট ইঞ্চি করে সিঁড়ির উত্থান আর বিশাল স্তম্ভ চুন, সুরকি ও ইট দিয়ে তৈরি।

১৯৮৭ সালে বাংলাদেশ সরকারের প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তর অধিগ্রহণ করে ব্যাপক সংস্কার করা হয়। প্রতœতত্ত্ব বিভাগের ছোঁয়ায় এখন তা নতুন সাঝে সজ্জিত হয়ে পর্যটকদের দৃষ্টি আকৃষ্ট করছে। দেশ বিদেশের হাজার হাজার পর্যটক এ জমিদার বাড়িতে ঢুকেই কারুকাজ দেখে বিস্ময়ভরা চোখে তাকিয়ে থাকেন। ভূয়সী প্রশংসা করেন সে আমলের ভবন নির্মাণের কারিগরদের।

প্রতœতাত্ত্বিক সূত্র মতে, ১৮৮৫ সালে জমিদার গোবিন্দ লাল সাহা এ বাড়ি তৈরি করেন। ১৯৮৭ সালে গেজেটের মাধ্যমে বড়িটিকে প্রতœতাত্ত্বিক সম্পদ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। পরে ২০০৮ সালে বাড়িটি হস্তান্তর করা হয় প্রতœতাত্ত্বিক বিভাগের কাছে। বর্তমানে এটি ওই বিভাগের আওতায় সুরক্ষিত ও সংরক্ষিত। সামনের চারটি ভবনের মধ্যে পশ্চিম দিকে থেকে দ্বিতীয় ভবনের দোতলা জাদুঘর হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এখানে বিভিন্ন প্রচীন নিদর্শন প্রদর্শন করে রাখা হয়েছে। বর্তমানে টিকিটের বিনিময়ে দর্শনার্থীদের জন্য বাড়িটি খুলে দেওয়া হয়েছে। বালিয়াটির জমিদাররা উনিশ শতকের প্রথমার্ধ থেকে শুরু করে বিশ শতকের প্রথমার্ধ পর্যন্ত প্রায় শতাধিক বছর বহুকীর্তি রেখে গেছেন যা জেলার পুরাকীর্তিকে বিশেষভাবে সমৃদ্ধ করেছে।