চট্টগ্রামের সীতাকু-ে জাহাজভাঙা শিল্পে দীর্ঘস্থায়ী মন্দার প্রভাব এবার স্পষ্টভাবে পড়েছে অক্সিজেন উৎপাদন খাতে। চাহিদা কমে যাওয়া, ঘন ঘন লোডশেডিং এবং উৎপাদন ব্যয় বাড়ার কারণে একের পর এক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে অক্সিজেন কারখানা। এতে বিপাকে পড়েছেন উদ্যোক্তারা আর কর্মহীন হয়ে পড়ছেন শত শত শ্রমিক।
সমুদ্র উপকূলীয় সীতাকু-ে গড়ে ওঠা শিপইয়ার্ডগুলোতে জাহাজ কাটাকাটি এবং ইস্পাত শিল্পে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বোতলজাত অক্সিজেন ব্যবহৃত হয়। অক্সিজেন ছাড়া এ দুই শিল্পের কার্যক্রম প্রায় অচল। একসময় এই চাহিদাকে কেন্দ্র করেই এলাকায় অন্তত ১৫টি অক্সিজেন কারখানা গড়ে ওঠে।
তবে জাহাজভাঙা শিল্পে মন্দা শুরু হওয়ার পর পরিস্থিতি বদলে যেতে থাকে। একের পর এক শিপইয়ার্ড বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অক্সিজেনের চাহিদাও উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে। শিল্পসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, গত চার বছরে ১৫টির মধ্যে অন্তত ৮টি অক্সিজেন কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে।
বন্ধ হওয়া কারখানাগুলোর মধ্যে রয়েছে রিগ্যাল অক্সিজেন লিমিটেড, এআরএল অক্সিজেন লিমিটেড, এসএল অক্সিজেন লিমিটেড, মাজুন অক্সিজেন লিমিটেড, রাইজিং অক্সিজেন লিমিটেড, ব্রাদার্স অক্সিজেন, সীমা অক্সিজেন, ফয়জন অক্সিজেন, গোল্ডেন অক্সিজেন, মানতি অক্সিজেন, রিফাত অক্সিজেন, পাখিজা অক্সিজেন ও শীতলপুর অক্সিজেন। পাঁচ বছর আগে বন্ধ হয়ে যাওয়া ব্রাদার্স অক্সিজেন লিমিটেডে মাসে প্রায় আড়াই হাজার সিলিন্ডার অক্সিজেন উৎপাদন হতো।
বর্তমানে বাণিজ্যিকভাবে চালু রয়েছে মাত্র চারটি কারখানা। এগুলো হলোÑ কেআর অক্সিজেন, মাস্টার অক্সিজেন লিমিটেড, জিরি সুবেদার অক্সিজেন ও অক্সিকো অক্সিজেন। এছাড়া আবুল খায়ের, কেএসআরএম ও বিএসআরএম গ্রুপ নিজেদের শিল্প কারখানার চাহিদা মেটাতে অক্সিজেন উৎপাদন অব্যাহত রেখেছে।
শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের বিধিনিষেধের কারণে শিপইয়ার্ডগুলো ‘কমলা’ থেকে ‘লাল’ শ্রেণিতে উন্নীত হওয়ায় জাহাজভাঙা কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে। অধিকাংশ ইয়ার্ড বন্ধ থাকায় অক্সিজেনের ব্যবহারও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
সীতাকু-ের অন্যতম বৃহৎ প্রতিষ্ঠান অক্সিকো অক্সিজেন লিমিটেডে আগে প্রতিদিন গড়ে ২ হাজার ৭০০ সিলিন্ডার অক্সিজেন উৎপাদন হতো। বর্তমানে তা নেমে এসেছে ৯০০ থেকে ১ হাজার সিলিন্ডারে। ফলে প্রতিষ্ঠানটির মাসে ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত লোকসান হচ্ছে। একই সঙ্গে শ্রমিকের সংখ্যা ১০০ থেকে কমে ৫৫ জনে নেমে এসেছে।
প্রতিষ্ঠানটির ফিল্ড ম্যানেজার মো. সিরাজ বলেন, ‘আগে একটি ইয়ার্ডে জাহাজ কাটতে ৫ থেকে ১০ হাজার সিলিন্ডার অক্সিজেন প্রয়োজন হতো। এখন সেই চাহিদা কমে ১ থেকে ৩ হাজার সিলিন্ডারে নেমে এসেছে। ফলে উৎপাদনও কমাতে বাধ্য হচ্ছি।’
অন্যদিকে শ্রমিকেরা বলছেন, অক্সিজেন ও এলপি গ্যাস ছাড়া জাহাজ কাটিং সম্ভব নয়। কিন্তু শিপইয়ার্ড বন্ধ থাকায় তাদের অনেকেই কাজ হারিয়ে বেকার জীবন কাটাচ্ছেন।
অক্সিকো লিমিটেডের ম্যানেজার আব্দুল হালীম জানান, কারখানার মাসিক ব্যয় ৬০ থেকে ৬৫ লাখ টাকা হলেও উৎপাদন কমে যাওয়ায় প্রতি মাসে ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে। তিনি বলেন, লোডশেডিংও বড় সমস্যা। ২০২৪ সালে বিদ্যুৎ সমস্যার কারণে প্রায় ৬০ লাখ এবং ২০২৫ সালে ৮৫ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে। মাসের অন্তত ১০ দিন বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক থাকে না, ফলে উৎপাদন ব্যাহত হয়।
সংশ্লিষ্টদের মতে, জাহাজভাঙা শিল্প দ্রুত সচল না হলে অক্সিজেন উৎপাদন খাত আরও গভীর সংকটে পড়বে। প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা ও শিল্পবান্ধব উদ্যোগ না নিলে এ খাতে বিনিয়োগ, উৎপাদন ও কর্মসংস্থান আরও সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

