ক্যানসার ধরা পড়লেই খুলনা অঞ্চলের রোগীদের সামনে ভেসে ওঠে ঢাকার দীর্ঘ পথ কিংবা ভারতের ব্যয়বহুল চিকিৎসার চিন্তা। সেই ভোগান্তি কমাতে প্রায় ২৮১ কোটি টাকা ব্যয়ে পাঁচ বছর আগে শুরু হয়েছিল খুলনা বিভাগীয় ক্যানসার হাসপাতাল নির্মাণ প্রকল্প। কিন্তু একাধিকবার প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হলেও এখনো শেষ হয়নি নির্মাণকাজ, চালু হয়নি হাসপাতালটি। ফলে আধুনিক ও সাশ্রয়ী ক্যানসার চিকিৎসার প্রত্যাশায় থাকা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের লাখো মানুষ আজও বঞ্চিত হচ্ছেন কাক্সিক্ষত স্বাস্থ্যসেবা থেকে। দফায় দফায় সময় বাড়লেও নির্মাণকাজ কবে শেষ হবে আর রোগীরা কবে পাবেন প্রতীক্ষিত চিকিৎসাসেবা সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০২১ সালের ৩১ অক্টোবর খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল চত্বরে ক্যানসার, কিডনি ও হৃদরোগের বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল নির্মাণ প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। হাসপাতালের বহির্বিভাগের পেছনে প্রায় ২৩ হাজার ২৫০ বর্গমিটার জমির ওপর নির্মাণাধীন হচ্ছে দুটি বেজমেন্ট ও ১৫ তলাবিশিষ্ট আধুনিক ভবন। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব পায় এমবিপিএল ও এসএনবিপিএল (জেভি) নামের যৌথ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২৩ সালের জুনের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে কাজ সম্পন্ন না হওয়ায় প্রথমে মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর, পরে ২০২৫ সালের জুন এবং সর্বশেষ ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়। তবুও প্রকল্পটি শেষ না হওয়ায় আরও এক বছর সময় বাড়ানোর প্রক্রিয়া চলছে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, মূল ভবনের অবকাঠামোগত নির্মাণকাজ প্রায় ৯৮ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। তবে হাসপাতালটির ২২টি প্যাকেজের সামগ্রিক বাস্তবায়ন অগ্রগতি মাত্র ৬৩ শতাংশ। অর্থাৎ ভবনের কাঠামো প্রায় শেষ হলেও চিকিৎসা সরঞ্জাম, অভ্যন্তরীণ স্থাপনাসহ গুরুত্বপূর্ণ অনেক কাজ এখনো বাকি। প্রায় ২৮০ কোটি ৬৯ লাখ টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়নাধীন এই প্রকল্প চালু হলে মোট ৪৫০ শয্যার চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। এর মধ্যে ১৮২টি শয্যা থাকবে ক্যানসার রোগীদের জন্য। বাকি শয্যাগুলো হৃদরোগ ও কিডনি রোগীদের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হবে।
স্বাস্থ্যসেবা বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে ক্যানসার আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। অথচ রাজধানীর বাইরে বিশেষায়িত ক্যানসার চিকিৎসা অবকাঠামো এখনো সীমিত। এমন বাস্তবতায় খুলনা বিভাগীয় ক্যানসার হাসপাতাল দ্রুত চালু হওয়া জরুরি। দীর্ঘসূত্রতার কারণে শুধু সরকারি অর্থ ব্যয়ই বাড়ছে না, চিকিৎসা বঞ্চনার শিকার হচ্ছেন হাজারো রোগী।
বটিয়াঘাটার বাসিন্দা স্বরূপ ম-ল বলেন, ‘ক্যানসারের চিকিৎসার জন্য অনেককে ভারত যেতে হয়। ঢাকায় চিকিৎসা করাতেও অনেক খরচ। খুলনায় যদি এই হাসপাতাল চালু হতো, তাহলে সাধারণ মানুষ অনেক উপকৃত হতো। কয়েক বছর ধরে শুধু কাজ চলছে বলে শুনছি, কিন্তু হাসপাতাল চালু হওয়ার খবর আর পাচ্ছি না।’
একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানালেনÑ প্রকৌশলী মেহেদী হাসান। তিনি বলেন, ‘আমার এক আত্মীয় ক্যানসারে আক্রান্ত। চিকিৎসার জন্য নিয়মিত ঢাকায় যেতে হচ্ছে। খুলনায় হাসপাতালটি চালু হলে রোগী ও স্বজনদের এই ভোগান্তি অনেকটাই কমে যেত।’
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা শিক্ষার্থী সাকিব রায়হান বলেন, ‘অনেক দিন ধরেই হাসপাতালের কাজ চলছে বলে শুনেছি। হাসপাতালটি চালু হলে আমাদের ভোগান্তি কমত। আমি চাই, এটি দ্রুত চালু হোক। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।’
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি, দ্রুত নির্মাণকাজ শেষ করে হাসপাতালটি চালু করা হোক। কারণ আধুনিক ক্যানসার চিকিৎসার জন্য এখনো রাজধানীনির্ভরতা কমেনি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি বাড়ানো গেলে খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, যশোর, নড়াইল, ঝিনাইদহসহ এ অঞ্চলের লাখো মানুষের চিকিৎসাসেবায় নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।
খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার বলেন, ‘চলমান ক্যানসার হাসপাতালের নির্মাণকাজ দ্রুত সম্পন্ন হলে খুলনার চিকিৎসা সেবায় নতুন মাত্রা যোগ হবে। কিন্তু প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি এখন এক প্রকার প্রথায় পরিণত হয়েছে। অনিয়ম পরিণত হয়েছে নিয়মে। এই সমস্যা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।’
হাসপাতালটি দ্রুত চালুর দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এটি চালু হলে চিকিৎসার জন্য অর্থ ব্যয় করে আর দূরে যেতে হবে না। পাশাপাশি হৃদরোগ ও কিডনির মতো অনেক জটিল রোগ খুলনাতেই চিকিৎসা করা সম্ভব হবে।’
এ বিষয়ে গণপূর্ত বিভাগ-১ এর নির্বাহী প্রকৌশলী কামরুল হাসান বলেন, ‘ক্যানসার হাসপাতাল নির্মাণ প্রকেল্পর মেয়াদ আরও এক বছর বাড়ানো হবে। তবে আমাদের কাজ চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে সম্পন্ন হবে বলে আশা করছি।’
তিনি বলেন, ‘২২টি প্যাকেজে এই কাজ বাস্তবায়ন হচ্ছে। প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে পূর্ণাঙ্গ ক্যানসার হাসপাতাল চালু করা সম্ভব বলে।’

