ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন, ২০২৬

ভোলা চরফ্যাশন

প্রযুক্তিনির্ভর মৎস্য অভয়াশ্রমে নতুন সম্ভাবনা

এআর সোহেব চৌধুরী, চরফ্যাশন
প্রকাশিত: জুন ১৮, ২০২৬, ০৬:৪০ এএম

ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার আসলামপুর ইউনিয়নের বেতুয়া খালে মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণ ও জলজ জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এক যুগান্তকারী উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হয়েছে। পরিবার উন্নয়ন সংস্থা (এফডিএ) ও পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) যৌথ উদ্যোগে স্থাপিত এই প্রযুক্তি-নির্ভর মৎস্য অভয়াশ্রমটি স্থানীয় মৎস্য খাতের উন্নয়নে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। পুষ্টির চাহিদা পূরণ ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্য নিয়ে পরিচালিত এই প্রকল্পটি বর্তমানে উপকূলীয় অঞ্চলে দেশি প্রজাতির মাছের বিলুপ্তি রোধে মাইলফলক হিসেবে দেখা দিচ্ছে।

প্রকল্প সূত্রে জানা যায়, উন্মুক্ত জলাশয়ে মাছের নিরাপদ প্রজনন, বিচরণ ও বংশবিস্তার নিশ্চিত করাই এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য। এখানে মাছ ধরার ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের পাশাপাশি বিভিন্ন প্রাকৃতিক উপকরণ ব্যবহার করে মাছের জন্য অত্যন্ত উপযোগী ও নিরাপদ আবাসস্থল তৈরি করা হয়েছে। প্রকল্পের সবচেয়ে আধুনিক সংযোজন হলো সিসি ক্যামেরা পর্যবেক্ষণব্যবস্থা। অভয়াশ্রমের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে স্থাপিত এই ক্যামেরার মাধ্যমে সার্বক্ষণিক নজরদারি চালানো হচ্ছে। এর ফলে অবৈধ মাছ আহরণ, অনুপ্রবেশ কিংবা অভয়াশ্রমের পরিবেশ বিনষ্ট করার ঝুঁকি অনেকাংশে কমে এসেছে। প্রযুক্তিনির্ভর এই ব্যবস্থাপনা দেশীয় মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণে একটি নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

এই প্রকল্পের সফল দিক হলো স্থানীয় জেলেদের সরাসরি সম্পৃক্তকরণ। অভয়াশ্রম এলাকায় জেলে সম্প্রদায়ের বর্ষীয়ান জেলে শাজাহান মিয়া বলেন, ‘আগে আমরা মাছের প্রজনন ও অভয়াশ্রমের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন ছিলাম না। এফডিএ-এর এই উদ্যোগের ফলে মাছের বংশ বাড়ছে, যা আমাদের ভবিষ্যতের জন্য আশীর্বাদ হয়ে আসবে।’

আরেক জেলে সেলিম মিয়া জানান, অভয়াশ্রমটি মাছের নিরাপদ প্রজননক্ষেত্র হিসেবে কাজ করায় খাল ও পার্শ্ববর্তী জলাশয়ে মাছের প্রাপ্যতা ভবিষ্যতে অনেক বাড়বে বলে আশা করছেন তারা।

এফডিএ-এর সিনিয়র প্রোগ্রাম সমন্বয়কারী শংকর চন্দ্র দেবনাথ এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘মৎস্য সম্পদ সংরক্ষণে শুধু অবকাঠামো নির্মাণই যথেষ্ট নয়, স্থানীয় জনগণের মালিকানা নিশ্চিত করাও জরুরি। আমরা জেলে, কৃষক ও জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করে অভয়াশ্রম ব্যবস্থাপনাকে একটি অংশগ্রহণমূলক মডেলে পরিণত করেছি।’ স্থানীয়রা বলছেন, এই অভয়াশ্রমের সুফল ভোগ করবে পরবর্তী প্রজন্ম, যা উপকূলের অর্থনীতিকে আরও গতিশীল করবে।

এফডিএ-এর মৎস্য কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. সাইদুর রহমান জানান, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে অবৈধ শিকার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়েছে। অন্যদিকে এফডিএ-এর নির্বাহী পরিচালক মো. কামাল উদ্দিন বলেন, ‘আমরা উপকূলীয় অঞ্চলে টেকসই মৎস্য ব্যবস্থাপনার একটি উদ্ভাবনী মডেল বাস্তবায়ন করছি। মাছের নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিত করতে সেন্সর-ভিত্তিক মনিটরিং ও ওয়াটার-এফিসিয়েন্ট ফার্মিংয়ের মতো প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের উদ্যোগ আরও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।’

চরফ্যাশন উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা জয়ন্ত কুমার অপু এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, এটি একটি বৈজ্ঞানিক ও পরীক্ষিত পদ্ধতি। সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের এমন সমন্বিত প্রচেষ্টা উপকূলীয় এলাকার মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধিতে ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।’