দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণে সরকার প্রতি বছর বিপুল অর্থ ব্যয় করলেও মাঠ পর্যায়ে সেই উদ্যোগের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে রাঙামাটির রাজস্থলী উপজেলার পাথরবনপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে ঘিরে। শিক্ষার্থী সংকট, শিক্ষক অনুপস্থিতি এবং একাধিক শ্রেণির শিক্ষার্থীদের একসঙ্গে পাঠদানের মতো বাস্তবতা স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
সম্প্রতি বিদ্যালয়টি পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায়, পুরো বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী রয়েছে মাত্র আটজন। এর মধ্যে চতুর্থ শ্রেণিতে রয়েছে দুজন শিক্ষার্থী। বিদ্যালয়ের একটি শ্রেণিকক্ষে একজন শিক্ষককে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের একসঙ্গে পাঠদান করতে দেখা যায়।
বিদ্যালয়ের আরেকটি শ্রেণিকক্ষ তালাবদ্ধ অবস্থায় পাওয়া যায়। এ বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষক জানান, সেটি পঞ্চম শ্রেণির কক্ষ। ওই শ্রেণিতে মাত্র দুজন শিক্ষার্থী রয়েছে এবং তারা সেদিন অনুপস্থিত থাকায় শ্রেণিকক্ষটি বন্ধ রাখা হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিদ্যালয়টিতে মোট চারজন শিক্ষক কর্মরত থাকলেও সরেজমিনে উপস্থিত ছিলেন মাত্র দুজন। উপস্থিত শিক্ষকদের মধ্যে ছিলেন রফিক আহম্মদ ও কাউছার আক্তার। প্রধান শিক্ষকসহ অপর দুই শিক্ষককে দায়িত্বস্থলে পাওয়া যায়নি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, শিক্ষার্থী সংখ্যা কমে যাওয়ার পাশাপাশি শিক্ষকদের উপস্থিতিও নিয়মিত নয়। এতে শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে এবং শিক্ষার্থীরা কাক্সিক্ষত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ছে। স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে শিক্ষার প্রসারে শুধু অবকাঠামো নির্মাণ বা শিক্ষক নিয়োগই যথেষ্ট নয়। শিক্ষার্থী উপস্থিতি বৃদ্ধি, শিক্ষক উপস্থিতি নিশ্চিতকরণ এবং পাঠদানের গুণগত মান উন্নয়নে কার্যকর নজরদারি জরুরি।
একজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, একটি বিদ্যালয়ে মাত্র আটজন শিক্ষার্থী এবং চারজন শিক্ষক থাকা সত্ত্বেও যদি দুজন শিক্ষক অনুপস্থিত থাকেন, তাহলে শিক্ষা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। সরকার বিপুল অর্থ ব্যয় করছে, কিন্তু তার সুফল মাঠ পর্যায়ে কতটা পৌঁছাচ্ছে তা মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।তিনি আরও বলেন, পাহাড়ি এলাকার শিশুদের বিদ্যালয়মুখী করতে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ, অভিভাবকদের সচেতন করা এবং নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় শিক্ষার প্রকৃত লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে।
এ বিষয়ে রাজস্থলী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা তাজুল ইসলাম বলেন, বিদ্যালয়টির বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখা হবে। শিক্ষার্থী অনুপস্থিতি, শ্রেণি কার্যক্রম এবং শিক্ষকদের উপস্থিতি সংক্রান্ত বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হবে। খুব শিগগিরই বিদ্যালয়টি পরিদর্শন করে প্রকৃত অবস্থা যাচাই করা হবে।
তিনি বলেন, প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। পাহাড়ি অঞ্চলের প্রতিটি শিশুর শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করতে শিক্ষা বিভাগ আন্তরিকভাবে কাজ করছে।
স্থানীয়দের দাবি, বিদ্যালয়টির বর্তমান অবস্থা পর্যালোচনা করে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষার্থী ও শিক্ষক উপস্থিতি নিশ্চিত করে শিক্ষা কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করতে বাস্তবমুখী উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি।
সচেতন মহলের মতে, শিক্ষা খাতে বরাদ্দ ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি মাঠ পর্যায়ে কার্যকর মনিটরিং নিশ্চিত করা না গেলে সরকারি ব্যয় বাড়লেও শিক্ষার মান প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছাবে না। পাহাড়ি জনপদের শিশুদের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করতে নীতিমালার পাশাপাশি তার বাস্তব প্রয়োগও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

