ঢাকা শনিবার, ২০ জুন, ২০২৬

ঘুম বেঁচে সংসার চালান চা বিক্রেতা শামীম

আক্কেলপুর (জয়পুরহাট) প্রতিনিধি
প্রকাশিত: জুন ২০, ২০২৬, ০২:১৪ এএম

গভীর রাত। আক্কেলপুর রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্মে ট্রেনের অপেক্ষায় থাকা যাত্রীদের আনাগোনা। কেউ বেঞ্চে বসে সময় কাটাচ্ছেন, কেউ মালপত্র পাহারা দিচ্ছেন। স্টেশনের নীরবতার মাঝে কেতলিতে ফুটতে থাকা চায়ের সুবাস আর যাত্রীদের আড্ডায় প্রাণ ফিরে পায় একটি ছোট্ট দোকান। সেই দোকানের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটির নাম শামীম। প্রায় ১২ বছর ধরে রাত জেগে চা বিক্রি করেই চলছে তার সংসার।

২০১৪ সালে অল্প পুঁজি নিয়ে স্টেশন ক্যান্টিনে একটি ছোট দোকান দিয়ে ব্যবসা শুরু করেন শামীম। তখন দোকানে ছিল শুধু চা, বিস্কুট ও পান। সময়ের সঙ্গে ব্যবসার পরিধি কিছুটা বাড়লেও পরিশ্রমের মাত্রা কমেনি। বর্তমানে প্রতিদিন বিকেল ৪টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত দোকান খোলা রাখেন তিনি। ট্রেন বিলম্বিত হলে কখনো কখনো ভোর ৭টা পর্যন্তও জেগে থাকতে হয়।

শামীম জানান, দিনে গড়ে ২০০ থেকে ৩০০ কাপ চা বিক্রি হয়। শীত মৌসুমে সেই সংখ্যা ৪০০ কাপ পর্যন্ত পৌঁছে যায়। তবে আগের তুলনায় স্টেশনে যাত্রীদের অপেক্ষার সময় কমে গেছে। মোবাইল ফোনে ট্রেনের অবস্থান জেনে অনেকেই নির্দিষ্ট সময়েই স্টেশনে আসেন। ফলে আগের মতো দীর্ঘ আড্ডা বা অপেক্ষার পরিবেশ আর নেই।

তিনি বলেন, সারা রাত জেগে কাজ করি, সকালে বাড়ি গিয়ে ঘুমাই। কষ্ট হয়, কিন্তু সংসারের কথা ভাবলেই আবার শক্তি পাই। প্রতিদিন ভোরে দোকানের দায়িত্ব ভাই ও বাবার কাছে বুঝিয়ে দিয়ে বাড়ি যাই। এরপর খাওয়া-দাওয়া শেষে কয়েক ঘণ্টা ঘুমিয়ে আবার কাজে ফিরতে হয়।

দীর্ঘদিন রাত জেগে কাজ করার কারণে শারীরিক সমস্যাও দেখা দিয়েছে। শামীমের ভাষ্য, প্রায়ই মাথাব্যথা, চোখ জ্বালাপোড়া ও শারীরিক দুর্বলতা অনুভব করেন। চিকিৎসক বিশ্রামের পরামর্শ দিলেও জীবিকার তাগিদে নিয়মিত দোকানে আসতে হয়।

রেলস্টেশন সূত্রে জানা যায়, প্রতিদিন বিভিন্ন রুটের ১২ থেকে ১৫টি ট্রেন আক্কেলপুর স্টেশনে যাত্রাবিরতি করে। এসব ট্রেনের যাত্রী, পরিবহন শ্রমিক, হকার ও পথচারীরাই শামীমের দোকানের প্রধান ক্রেতা। আগে যেখানে দোকান ভাড়া ছিল ২৫০ টাকা, বর্তমানে তা বেড়ে ৫৫০ টাকায় পৌঁছেছে।

প্রতিদিন দোকানে প্রায় ৩ কেজি চিনি, ৮ থেকে ১০ লিটার দুধ এবং প্রায় ১ কেজি চা-পাতা ব্যবহার হয়। চায়ের পাশাপাশি বিস্কুট, কেক, পাউরুটি, কলা, সিগারেট ও কোমল পানীয়ও বিক্রি করেন তিনি।

তবে ব্যবসার খরচ আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে বলে জানান শামীম। তার ভাষ্য, চা-পাতা, দুধ, চিনি ও গ্যাসের দাম কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। ২০১৪ সালে যে চা ২ টাকায় বিক্রি করতেন, বর্তমানে সেটি ৫ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। আগে দিনে ৫০০ টাকার পণ্য কিনে দোকান চালানো যেত, এখন ৪ থেকে ৫ হাজার টাকার মাল তুলতে হয়। খরচ বাড়লেও লাভের পরিমাণ সে অনুপাতে বাড়েনি।

স্থানীয় ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম বলেন, স্টেশনের পুরোনো ব্যবসায়ীদের মধ্যে শামীম অন্যতম। রাতের ট্রেন ধরতে আসা মানুষের কাছে তার দোকান একটি নির্ভরতার নাম। অনেকের বিশ্বাস, উপজেলার অন্য দোকান বন্ধ থাকলেও শামীমের দোকান খোলা থাকবে।

নিয়মিত যাত্রী সাইফুল ইসলাম বলেন, রাতের ট্রেন ধরতে এলে বা কাউকে বিদায় দিতে এলে শামীমের দোকানে বসে এক কাপ চা খাওয়া যেন অভ্যাস হয়ে গেছে। অনেক সময় ট্রেনের খবরও তার কাছ থেকেই জানা যায়।

১২ বছর ধরে রাতভর জেগে চা বিক্রি করা শামীম আজ শুধু একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী নন; তার পরিবারের প্রধান অবলম্বনও তিনি। স্ত্রী-সন্তানসহ পুরো পরিবারের ভরণপোষণ, সন্তানের পড়াশোনা এবং নিত্যদিনের ব্যয় নির্বাহ হয় এই ছোট্ট চায়ের দোকানের আয় থেকেই। ট্রেনের হুইসেল, কেতলির ধোঁয়া আর রাতজাগা পরিশ্রমের মধ্যেই এগিয়ে চলছে তার জীবনের গল্প।