জিআই (ভৌগোলিক নির্দেশক) স্বীকৃতিপ্রাপ্ত মেহেরপুরের মেহেরসাগর কলার সুনাম ছড়িয়ে পড়েছে দেশজুড়ে। জেলার বিভিন্ন কলার হাট থেকে প্রতিদিন কোটি টাকার কলা যাচ্ছে ঢাকা, সিলেট, চট্টগ্রাম, বরিশালসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। এতে লাভবান হচ্ছেন চাষি ও ব্যবসায়ী-উভয়েই।
গাংনী উপজেলার হেমায়েতপুর কলার হাট এখন জেলার অন্যতম বড় কলা বাণিজ্যকেন্দ্র। প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে শুরু হয় কেনাবেচা। স্থানীয় চাষি ও ব্যবসায়ীরা মাঠ থেকে কলা এনে হাটে জড়ো করেন। পরে ট্রাকভর্তি এসব কলা দেশের বিভিন্ন জেলার উদ্দেশে পাঠানো হয়। শুধু এই হাট থেকেই প্রতিদিন প্রায় অর্ধকোটি টাকার কলা বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া মেহেরপুর সদর ও মুজিবনগর উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রতিদিন ২৫ থেকে ৩০ ট্রাক কলা দেশের বিভিন্ন স্থানে যাচ্ছে।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় প্রায় তিন হাজার হেক্টর জমিতে কলার চাষ হয়েছে। চলতি মৌসুমে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় এক লাখ ৫০ হাজার টন। যার বাজারমূল্য প্রায় ১৫০ কোটি টাকা। মেহেরসাগর কলার পাশাপাশি জেলায় চাপা, সবরি ও রং কলারও ব্যাপক চাষ হচ্ছে।
গাংনীর হেমায়েতপুর গ্রামের কলাচাষি শাজাহান আলী ও নুর মহম্মদ বলেন, স্থানীয়ভাবে কলার হাট গড়ে ওঠায় এখন আর দূরের বাজারে যেতে হয় না। পরিবহন খরচ কমার পাশাপাশি ন্যায্য দামও পাওয়া যাচ্ছে। এতে কৃষকদের মধ্যে কলা চাষের আগ্রহ বাড়ছে।
সোনাপুর গ্রামের আব্দুর রহিম বলেন, একবার কলার গাছ রোপণ করলে একটানা দুই থেকে তিনবার ফলন পাওয়া যায়। এক বিঘা জমিতে ৪০০ থেকে সাড়ে ৪০০ কলার চারা রোপণ করা যায়। এটি লাভজনক হওয়ায় এলাকার কৃষকরা দিন দিন কলা চাষে ঝুঁকছেন।
আশরাফপুর গ্রামের ছাদ আলী জানান, এক সময় এ এলাকার কৃষকরা ধান, পাট ও গম চাষ করতেন। কিন্তু লাভের তুলনায় লোকসান বেশি হওয়ায় এখন অনেকেই কলাসহ অন্যান্য ফসলের দিকে ঝুঁকেছেন। বর্তমানে মাঠের পর মাঠজুড়ে কলা চাষ হচ্ছে। এক বিঘা জমিতে খরচ বাদ দিয়ে ৮০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত লাভ হয় বলে জানান তিনি।
ফড়িয়া ব্যবসায়ী সিরাজগঞ্জের জামাল হোসেন বলেন, তারা সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে কলা সংগ্রহ করেন। এতে ভালো মানের কলা পাওয়া যায় এবং ব্যবসায় লাভও বাড়ে। সিরাজগঞ্জের আরও অনেক ব্যবসায়ী গাংনীর হেমায়েতপুর হাট থেকে পাইকারি দরে কলা কিনে নিয়ে যান।
বরিশালের আড়ত ব্যবসায়ী ফুরকান মিয়া বলেন, মেহেরপুরের কলা বিষমুক্ত, নিরাপদ এবং স্বাদ ও গন্ধে ভালো হওয়ায় দেশের বাজারে এর চাহিদা রয়েছে।
মেহেরপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ সঞ্জীব মৃধা বলেন, কৃষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। মেহেরপুরের মেহেরসাগর কলা ইতোমধ্যে জিআই পণ্যের স্বীকৃতি পেয়েছে এবং জিআই ট্যাগ ব্যবহারের অনুমতিও পাওয়া গেছে। জিআই ব্র্যান্ডিং কাজে লাগিয়ে দেশের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও এ কলার মূল্য বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সঠিক বিপণন ব্যবস্থা ও রপ্তানির সুযোগ তৈরি হলে মেহেরপুরের মেহেরসাগর কলা দেশের অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।

