লালমনিরহাটের হাতীবান্ধায় প্রায় ১৩ কোটি টাকা ব্যয়ে চলমান একটি সড়ক সংস্কার ও চারটি সেতু নির্মাণ প্রকল্পে নজিরবিহীন অনিয়ম, দুর্নীতি ও হরিলুটের অভিযোগ উঠেছে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর গত শনিবার বিকেলে একটি সেতু যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়ার মাত্র এক ঘণ্টার মাথায় সেটিতে ভয়াবহ ফাটল দেখা দিয়েছে। এই ঘটনায় জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে এবং উঠেছে সরকারি অর্থের অপচয়ের অভিযোগ।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্র জানায়, হাতীবান্ধা উপজেলার দইখাওয়া কলেজ হতে ভেলাগুড়ি ইউনিয়নের বুড়িরবাজার পর্যন্ত ৯ কিলোমিটার ৩০০ মিটার সড়ক সংস্কার ও চারটি ছোট সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেয় এলজিইডি। এই মেগা প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব পায় পাটগ্রামের ‘গোলাম মওলা’ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। প্রকল্পের শুরু থেকেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে চরম খামখেয়ালিপনা ও অনিয়মের অভিযোগ থাকলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বরাবরই ছিল নীরব। প্রকল্পের মেয়াদ বারবার বাড়ানো পরেও কাজ শেষ করতে ব্যর্থ হয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, এলজিইডির হাতীবান্ধা উপজেলা প্রকৌশলী আখতার হোসেনের প্রত্যক্ষ যোগসাজশে ও প্রশ্রয়ে ঠিকাদার কাজ চালিয়ে গেছেন। সেতু ও সড়ক নির্মাণে নি¤œমানের ইট ব্যবহার করা হয়েছে। এমনকি ঢালাই ও সড়ক সংস্কারকাজে বালুর পরিবর্তে সরাসরি মাটি ব্যবহারের মতো ভয়াবহ অনিয়মের নজিরও রয়েছে। এলাকাবাসী একাধিকবার নি¤œমানের কাজের প্রতিবাদ জানালেও এলজিইডি কর্মকর্তারা তাতে কোনো কর্ণপাত করেননি। বরং স্থানীয়দের অভিযোগ, দুর্নীতির প্রতিবাদ করায় অনেককে ঠিকাদারের পক্ষ থেকে ‘চাঁদাবাজি মামলা’ দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছে।
গত শনিবার বিকেলে ওই সড়কের ভেলাগুড়ি বোর্ডেরহাটের পাশের নবনির্মিত সেতুটি যান চলাচলের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে খুলে দেওয়া হয়। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, চালুর মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যেই সেতুর দুই অংশে বড় ধরনের ফাটল দেখা দেয়। পরের দিন গতকাল রোববার সকালে ফাটলগুলো আরও প্রকট হয়ে ওঠে। এতে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা করছেন পথচারীরা।
এ বিষয়ে স্থানীয় পথচারী সফিকুল ইসলাম বলেন, এই সড়ক ও সেতু নির্মাণের নামে বছরের পর বছর ধরে আমাদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। এত কষ্টের পর যে সেতু আমরা পেলাম, তা উদ্বোধনের এক ঘণ্টার মধ্যেই ফেটে চৌচির হয়ে গেল! এটা উন্নয়ন নয়, জনগণের করের টাকায় প্রকাশ্য ডাকাতি।’
আব্দুল মজিদ নামে অপর বাসিন্দা বলেন, ‘আমরা বারবার এলজিইডি অফিসে অভিযোগ জানিয়েছি, কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। তাদের অবহেলার কারণেই আজ সেতুর এই অবস্থা।’
সচেতন মহলের দাবি, ১৩ কোটির এই প্রকল্পের এমন বেহাল দশা ও উদ্বোধনের আগেই ফাটল ধরার ঘটনাটি কেবল একটি নির্মাণ ত্রুটি নয়, বরং এটি সরকারি তদারকির অভাব ও দুর্নীতির এক প্রকট বহিঃপ্রকাশ। প্রকল্পের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত যে অনিয়ম ও অবহেলার নজির স্থাপন করা হয়েছে, তাতে প্রকৌশলী ও ঠিকাদারের সিন্ডিকেট স্পষ্ট। স্থানীয়দের দাবি, অবিলম্বে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করে এই প্রকাশ্য দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ঠিকাদার ও এলজিইডির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কঠোর আইনি শাস্তির আওতায় আনতে হবে। অন্যথায় ভবিষ্যতে জননিরাপত্তা আরও হুমকির মুখে পড়বে।
প্রকল্পের ঠিকাদার গোলাম মওলার সঙ্গে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার ফোন বন্ধ থাকায় কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে এ বিষয়ে হাতীবান্ধা উপজেলা প্রকৌশলী আখতার হোসেন অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘কাজ করলে ভুল হতেই পারে।’ এ সময় তিনি সরেজমিনে পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দেন।
অন্যদিকে লালমনিরহাট এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী কাওছার আলম জানান, নি¤œমানের কাজ করার কোনো সুযোগ নেই। বিষয়টির খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। যদি অনিয়মের সত্যতা প্রমাণ হয়, তবে অবশ্যই আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

