ঢাকা সোমবার, ২০ জুলাই, ২০২৬

কুমিল্লার মনোহরগঞ্জ

লিবিয়ায় বন্দি ইতালির স্বপ্ন

আনোয়ার চৌধুরী রিপন, মনোহরগঞ্জ (কুমিল্লা)
প্রকাশিত: জুলাই ২০, ২০২৬, ০২:৪০ এএম

উন্নত জীবনের আশায় ইউরোপ পাড়ি জমানোর স্বপ্ন নিয়ে লিবিয়ায় গিয়ে এখন মৃত্যুফাঁদে আটকা পড়েছেন কুমিল্লার মনোহরগঞ্জের ছয় যুবক। দালাল চক্রের প্রলোভনে পড়ে এখন তারা অমানবিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। মুক্তিপণ হিসেবে দালালরা দাবি করছে প্রায় দেড় কোটি টাকা। টাকা দিতে না পারায় ভুক্তভোগীদের ওপর চালানো হচ্ছে পাশবিক নির্যাতন, যা ভিডিওর মাধ্যমে পরিবারের কাছে পাঠিয়ে শুরু হয়েছে ভয়াবহ অমানষিক অত্যাচার।

ভুক্তভোগীরা হলেনÑ মনোহরগঞ্জের খিলা ইউনিয়নের দিশাবন্দ গ্রামের শাহাদাত হোসেন (২০), মানিকুল ইসলাম (২০), মো. সোহেল (২৭), তাজ মোহাম্মদ (২৫), ফয়সাল (২০) এবং লক্ষণপুর ইউনিয়নের বেতিয়াপাড়া গ্রামের মেহেদী হাসান (২১)।

ভুক্তভোগী মানিক মিয়ার বাবা মাহবুবুর রহমান জানান, গ্রামের বেলাল হোসেনের ছেলে মানিকের মাধ্যমে ইতালি যাওয়ার চুক্তিতে তার ভাই সামছুল আলমকে প্রায় ২০ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছিল। প্রতিশ্রুতি ছিল দ্রুত ইতালি পৌঁছানোর। কিন্তু বাস্তবে তাদের লিবিয়ায় নিয়ে অন্য একটি জিম্মি চক্রের কাছে মোটা অঙ্কের বিনিময়ে বিক্রি করে দেওয়া হয়।

মেহেদী হাসানের বাবা শাহআলম জানান, গত ৮ মাস আগে ১৮ লাখ টাকা জমা দিয়ে ছেলেকে পাঠানোর পর এখন জানতে পারছেন দালালরা তার ছেলেকে লিবিয়ার মরুভূমিতে জিম্মি করে রেখেছে। গত ১৫-২০ দিন ধরে দালাল চক্র ভুক্তভোগী প্রতিজনের জন্য ২৭ লাখ টাকা করে মুক্তিপণ দাবি করছে। টাকা না দিতে পারলে তাদের প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। ইমু ও হোয়াটসঅ্যাপে আসা নির্যাতনের ভিডিওচিত্র দেখে এখন দিশাহারা প্রতিটি ভুক্তভোগী পরিবার। মানিক শেষবার ফোনে জানিয়েছিলেন, দালালরা তাদের দিনের পর দিন না খাইয়ে রেখে অমানুষিক প্রহার করছে, যার ফলে তাদের শারীরিক অবস্থা সংকটাপন্ন।

ঘটনার খবর এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে এলাকাবাসী ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। তারা দালাল চক্রের কঠোর শাস্তি দাবি করেছেন এবং এ ধরনের পাচার রোধে প্রশাসনের নজরদারি বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন।

ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর অভিযোগ, দালালদের নামসহ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে লিখিত আবেদন করেও এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায়নি। এমতাবস্থায় দালালদের ভয় আর সন্তানদের মৃত্যুভয়ে স্বজনরা নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন। ইতোমধ্যে ভিডিওচিত্রটি এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে এলাকাবাসী বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী দালাল চক্রের সদস্যদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে সোচ্চার হয়েছেন।

এদিকে, নির্যাতনের ঘটনা ফাঁস হয়ে যাওয়ায় গত ১০-১২ দিন ধরে মূল দালাল সামছুল আলম ও তার পরিবারের সদস্যরা গা-ঢাকা দিয়েছেন। বর্তমানে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো তাদের সন্তানদের ফিরে পেতে প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করছেন। ভুক্তভোগী পরিবারগুলো বলছেন, প্রশাসনের দ্রুত পদক্ষেপই কেবল পারে তাদের সন্তানদের এই বিভীষিকা থেকে মুক্ত করে ফিরিয়ে আনতে।

এ বিষয়ে মনোহরগঞ্জ থানার ওসি মাকসুদ আহমেদ বলেন, অবৈধ পথে বিদেশ গমন বা দালাল চক্রের মাধ্যমে ভুক্তভোগীরা বর্তমানে কোথায় এবং কোন পরিস্থিতিতে আছেন, সে বিষয়ে আমাদের কাছে এখন পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই। তবে আমরা ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি এবং অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত সাপেক্ষে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।