দিনাজপুরের লিচুর স্বাদ, ঘ্রাণ ও গুণমান বিশ্বজুড়ে অনন্য। প্রায় আড়াইশ বছরের ঐতিহ্যের ধারক এই লিচু বর্তমানে শুধু এই অঞ্চলের অর্থনীতিই নয়, বরং জাতীয় অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। চলতি মৌসুমে জেলায় ৫ হাজার ৮৯০ হেক্টর জমিতে লিচু চাষ করা হয়েছে, যেখানে ৩৬ হাজার টন লিচু উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে কৃষি বিভাগ। এর বাজারমূল্য প্রায় সাড়ে ৮০০ কোটি টাকা। বিপুল সম্ভাবনাময় এই ‘লিচুর রাজ্য’খ্যাত জেলায় লিচু নিয়ে এত বড় কর্মকা- চললেও আশ্চর্যের বিষয় হলোÑ দিনাজপুরসহ দেশের কোথাও লিচু নিয়ে গবেষণার জন্য নেই কোনো পূর্ণাঙ্গ গবেষণা কেন্দ্র বা বিশেষায়িত ইনস্টিটিউট।
স্থানীয় কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, দিনাজপুরে মূলত বেদানা, হারিয়ানা বেদানা, বোম্বাই, মাদ্রাজি, কাঁঠালি, মোজাফরি, গোলাপ খাস, কদমি, চায়না-২ ও ৩সহ ১১টি উন্নত জাতের লিচু চাষ হয়ে থাকে। এখানকার মাটি ও আবহাওয়ার অনন্য বৈশিষ্ট্যের কারণেই লিচু এত সুস্বাদু ও রসালো হয়। এখানকার মাটিতে মাইক্রোবিয়াল অণুজীবের উপস্থিতি নাইট্রোজেন সংবন্ধনে সহায়তা করে, যা লিচুর মিষ্টতা ও ঘ্রাণে বিশেষ প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে ‘বেদানা লিচু’ সম্প্রতি ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ায় আন্তর্জাতিক পরিম-লেও এর কদর বেড়েছে। কিন্তু দুঃখজনক হলো, স্বীকৃতির পরও এই মূল্যবান সম্পদ নিয়ে কোনো বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণা কার্যক্রম নেই।
দিনাজপুরের লিচুচাষি মো. রহিম উদ্দিনের কণ্ঠে ফুটে উঠেছে দীর্ঘদিনের বঞ্চনার চিত্র। তিনি দীর্ঘ ২০ বছর ধরে প্রায় ৫ একর জমিতে লিচুর চাষ করছেন। নিজের বাগানের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, প্রতি বছর আমরা নতুন নতুন সমস্যার সম্মুখীন হই। কখনো মুকুল ঝরে পড়ে, কখনো পোকার আক্রমণে লিচু নষ্ট হয়। আমরা কোনো বিজ্ঞানী বা গবেষককে আমাদের বাগানে আসতে দেখি না। ইউটিউব বা লোকমুখে শুনে যা শিখি, তা দিয়েই গাছ বাঁচানোর চেষ্টা করি। সরকার যদি একটা গবেষণাগার দিত, তবে আমরা মাটি পরীক্ষা করে সঠিক সার ও ওষুধের ব্যবহার জানতে পারতাম। এতে আমাদের খরচও কমত, লাভও বেশি হতো।
রহিম উদ্দিনের মতো শত শত চাষি আজ আধুনিক প্রযুক্তি ও গবেষণার অভাবে অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। তারা মনে করেন, কৃষি কর্মকর্তারা সময়মতো পরামর্শ দিলেও হাতে-কলমে গবেষণালব্ধ সমাধান পাওয়ার সুযোগ এখানে নেই।
বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে লিচু চাষ ঝুঁকির মুখে পড়ছে। দিনাজপুর হর্টিকালচার সেন্টারের উপপরিচালক কৃষিবিদ মো. এজামুল হক জানান, আবহাওয়াসহিষ্ণু নতুন জাত উদ্ভাবনের জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো গবেষণা নেই। হর্টিকালচার সেন্টার মূলত চারা উৎপাদন ও বিপণনের কাজ করে, সেখানে গবেষণার সুযোগ নেই।
দিনাজপুর কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মুহম্মদ শামসুল হুদা জানান, জেলা পর্যায়ে ফল নিয়ে গবেষণার কোনো অবকাঠামো নেই। বারির (বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট) হেড অফিসে কিছু কাজ হলেও, মাঠ পর্যায়ে এর প্রতিফলন অত্যন্ত সীমিত।
সীমাবদ্ধতার মধ্যেও আশার আলো দেখাচ্ছে হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (হাবিপ্রবি)। বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. আব্দুল আলিমের নেতৃত্বে একদল গবেষক সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব ও কীটনাশকমুক্ত ‘ব্যাগিং পদ্ধতি’ ব্যবহার করে লিচু উৎপাদনে সফলতা পেয়েছেন। তিন বছরের এই গবেষণায় দেখা গেছে, ব্যাগিং পদ্ধতির মাধ্যমে উৎপাদিত লিচু অধিকতর নিরাপদ ও রপ্তানিযোগ্য।
অধ্যাপক ড. আব্দুল আলিম বলেন, ‘চাষিরা পোকার আক্রমণ থেকে লিচু বাঁচাতে প্রচুর কীটনাশক ব্যবহার করেন, যা মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর ও ব্যয়বহুল। আমাদের উদ্ভাবিত পদ্ধতিতে রাসায়নিক ব্যবহার ছাড়াই নিরাপদ লিচু উৎপাদন সম্ভব, যা আন্তর্জাতিক বাজারে আমাদের লিচুর গ্রহণযোগ্যতা বাড়াবে।’ তবে এই প্রযুক্তি সাধারণ কৃষকদের কাছে পৌঁছে দিতে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও বড় প্রকল্পের প্রয়োজন।
দিনাজপুরের লিচু নিয়ে আরেকটি বড় সংকট হলো এর স্বল্প স্থায়িত্বকাল। এই সংকট কাটাতে এগিয়ে এসেছেন তরুণ গবেষক মোসাদ্দেক হোসেন। ২০১৭ সালে লিচু সংরক্ষণ পদ্ধতি নিয়ে জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত এই উদ্যোক্তা জানান, উপযুক্ত সংরক্ষণের অভাবে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার লিচু নষ্ট হয়। তিনি পরীক্ষামূলকভাবে ছয় মাস পর্যন্ত লিচুর গুণগত মান ও রং ঠিক রাখতে সক্ষম হয়েছেন। তিনি বলেন, ‘দিনাজপুরে একটি লিচু গবেষণা কেন্দ্র স্থাপনের মাধ্যমে যদি সংরক্ষণ প্রযুক্তি কৃষকদের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায় এবং কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা গড়ে তোলা হয়, তবে মধুমাসে পুষ্টির জোগান দেওয়ার পাশাপাশি বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব।’
দিনাজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. আফজাল হোসেন বলেন, লিচুর উন্নত জাত উদ্ভাবন এবং দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণে একটি সুনির্দিষ্ট ও পূর্ণাঙ্গ গবেষণা কেন্দ্রের কোনো বিকল্প নেই। গবেষক ও কৃষিবিদদের মতে, শুধু জিআই স্বীকৃতি অর্জন করলেই হবে না, সেই ঐতিহ্যের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে আধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োগ ঘটাতে হবে। দ্রুত দিনাজপুরে একটি লিচু গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন করা না হলে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রতিকূলতায় ঐতিহ্যবাহী এই লিচু চাষ ভবিষ্যতে বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়তে পারে।

