নাটোরের লালপুর উপজেলার কদিমচিলান ইউনিয়নের ধলা গ্রামের মানুষের জন্য বর্ষা মানেই কাদা-পানির দুঃস্বপ্ন। মাত্র ২ কিলোমিটার কাঁচা রাস্তার কারণে শিক্ষাসেবা, চিকিৎসা ও কৃষি বিপর্যস্ত হওয়ার পাশাপাশি ভেঙে যাচ্ছে বিয়ের সম্বন্ধ। পাত্র বা পাত্রীপক্ষ কাদা মাড়িয়ে গ্রামে আসতে রাজি না হওয়ায় ভালো সম্বন্ধও নষ্ট হচ্ছে। অনেক দিন ধরে অভিযোগ করেও সমাধান না পেয়ে হতাশ স্থানীয়রা বলছেন, ভোট এলে আসে আশ্বাস, আর বৃষ্টি এলে আসে কাদা আর দুর্ভোগ।
উপজেলার দাঁইড়পাড়া হাইওয়ে রোড থেকে ধলা শেখচিলান পর্যন্ত কাঁচা রাস্তার অবস্থা এতটাই করুণ, বর্ষা মৌসুমে কাদা-পানিতে একাকার হয়ে যায়। যানবাহন তো দূরের কথা, স্বাভাবিকভাবে হাঁটাও যায় না। সামান্য বৃষ্টিতে সৃষ্টি হয় চরম দুর্ভোগ।
স্থানীয়রা জানান, ছেলের ভালো চাকরি থাকলেও কিংবা মেয়েরা গুণে গুণান্বিত হলেও বিয়ে হচ্ছে না, কারণ পাত্র বা পাত্রীপক্ষ রাজি হচ্ছে না, এ রাস্তায় আসতে। এ কারণে বিয়ের আগেই ভেঙে যাচ্ছে সম্বন্ধ।
শুধু বিয়ে নয়, রাস্তার কারণে শিক্ষা ও চিকিৎসাসেবাও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। কোনো রোগী অসুস্থ হলে অ্যাম্বুলেন্স তো দূরের কথা, রিকশা-ভ্যানও পৌঁছায় না গ্রামে। রোগীকে খাটিয়ায় করে বহন করতে হয়। বৃষ্টির দিনে দুর্ভোগ আরও চরমে ওঠে। মৃত্যুঝুঁকি নিয়েই মানুষকে চলাচল করতে হয়।
শিক্ষার্থীদের স্কুলে যাওয়া-আসা হয়ে উঠেছে দুঃস্বপ্নের মতো। সকালে স্কুলে রওনা হলেই পিচ্ছিল কাদায় পড়ে গিয়ে ভিজে যায় বই-খাতা ও ইউনিফর্ম। এতে অনেকেই সময়মতো ক্লাসে পৌঁছাতে পারে না, পড়ালেখা ব্যাহত হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অভিভাবকেরা।
কৃষকরাও কাঁচা রাস্তার কারণে সময়মতো ফসল বাজারজাত করতে না পারায় ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। স্থানীয়রা বলছেন, ভোট এলে আসে আশ্বাস, আর বৃষ্টি এলে আসে কাদা আর হতাশা।
স্থানীয় নুর আহাম্মদ বলেন, ‘বর্ষা মৌসুমে কাদা-পানি মাড়িয়ে রাস্তা দিয়ে চলাচল করা আমাদের জন্য চরম কষ্টের। পানি সরে গেলেও রাস্তা কাদা হয়ে যায়। ছেলে-মেয়েদের স্কুল-কলেজে যেতে কষ্ট হয়, অসুস্থ রোগীকে হাসপাতালে নিতে হলে কোলে বা খাটিয়ায় করে নিতে হয়। রাস্তার বিষয়ে অনেকবার চেয়ারম্যান, মেম্বারদের কাছে অভিযোগ দিয়েছি কিন্তু কোনো কাজ হয়নি।’
মর্জিনা খাতুন নামের এক গৃহবধূ বলেন, ‘দুই কিলোমিটার রাস্তার জন্য আমাদের সীমাহীন কষ্ট হয়। এ রাস্তা পাকা না হওয়ায় গ্রামের বিবাহযোগ্য ছেলে-মেয়েদের বিয়ের সম্বন্ধ পর্যন্ত ভেঙে যাচ্ছে। কারণ, পাত্র বা পাত্রীপক্ষ রাজি হচ্ছে না, এ রাস্তায় আসতে। এ কারণে বিয়ের আগেই ভেঙে যাচ্ছে সম্বন্ধ।’
শিক্ষার্থী সাহাব উদ্দিন বলেন, ‘আমাদের এই এলাকা থেকে ১০০ ছাত্রছাত্রী প্রতিদিন স্কুল ও মাদ্রাসায় যায়। বর্ষাকালে এ কাঁচা রাস্তা দিয়ে কাদা-পানি মাড়িয়ে স্কুলে যেতে আমাদের কষ্ট হয়। অনেক সময় পিচ্ছিল কাদায় পড়ে গিয়ে বই-খাতা ও ইউনিফর্ম ভিজে নষ্ট হয়ে যায়। রাস্তাটি দ্রুত পাকা করে দিলে এলাকাবাসীসহ সবার উপকার হবে।’
এ বিষয়ে ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য মো. জাহাঙ্গীর আলম জানান, বহুবার এমপি, ইউএনও থেকে শুরু করে উপজেলা ও ইউনিয়ন চেয়ারম্যানকে এ রাস্তার বিষয়টি জানানো হয়েছে। কিন্তু আজও বাস্তব কোনো উন্নয়ন হয়নি। তার মতে, রাস্তাটি পাকা হলে মানুষের জীবনযাত্রা স্বাভাবিক হবে।
লালপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মেহেদী হাসান বলেন, ‘ধলা গ্রামের রাস্তার বিষয়টি আমি উপজেলা প্রকৌশলীকে জানিয়েছি। রাস্তার আইডি অন্তর্ভুক্ত করে প্রস্তাব পাঠানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আশা করছি, খুব দ্রুত সমস্যার সমাধান হবে।’
আপনার ফেসবুক প্রোফাইল থেকে মতামত লিখুন