ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

কীর্তনখোলার তীরে একদিন

ঘুড়িফিরি প্রতিবেদক
প্রকাশিত: এপ্রিল ৪, ২০২৬, ১২:৫১ এএম

বাংলার ভেনিসখ্যাত বরিশাল কেবল একটি জেলা নয়, এটি নদী-নালা, খাল-বিল আর জীবনানন্দ দাশের কবিতার এক জীবন্ত পা-ুলিপি। কীর্তনখোলার রুপালি জলরাশি আর সবুজের নিবিড় আলিঙ্গনে ঘেরা এই জনপদ পর্যটকদের জন্য এক চিরন্তন বিস্ময়। ইট-পাথরের যান্ত্রিকতা পেছনে ফেলে যদি হাতে থাকে মাত্র একটি দিন, তবে বরিশালের আভিজাত্য আর ঐতিহ্যের স্বাদ নিতে পারেন।

ভ্রমণের শুরুটা সাধারণত হয় ঢাকা থেকে রাতের বিলাসবহুল লঞ্চে। যখন ভোরের কুয়াশাভেজা আলোয় লঞ্চটি বরিশাল ঘাটে নোঙর করে, তখন নদীর শীতল বাতাস আপনার নাকে এসে লাগবে। লঞ্চঘাট থেকে নেমে গরম গরম চা আর বাকরখানি দিয়ে প্রাতঃরাশ সেরে নিয়ে আপনি প্রস্তুত হতে পারেন এক দীর্ঘ ও রোমাঞ্চকর দিনের জন্য।

অক্সফোর্ড মিশনের লাল স্থাপত্য

শহরের ব্যস্ততা পুরোদমে শুরু হওয়ার আগেই আপনার প্রথম গন্তব্য হওয়া উচিত বগুড়া রোডের অক্সফোর্ড মিশন চার্চ। ১৯০৩ সালে নির্মিত এই গির্জাটি কেবল বরিশালের নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সেরা স্থাপত্য নিদর্শন। স্থানীয়রা একে ‘লাল গির্জা’ বলে চেনেন। গ্রিক স্থাপত্যশৈলীতে লাল ইটের এই গির্জাটি এতটাই সুনিপুণভাবে তৈরি যে, এর ভেতরে কোনো পিলারের সাহায্য ছাড়াই বিশাল কাঠের বিমের ওপর ছাদ দাঁড়িয়ে আছে।

সকালবেলার শান্ত পরিবেশে গির্জা চত্বরে প্রবেশ করলে আপনি এক অদ্ভুত আধ্যাত্মিক প্রশান্তি অনুভব করবেন। এর চারপাশের বিশাল দীঘি আর সারিবদ্ধ পাম গাছগুলো আয়নার মতো স্থির জলে যখন প্রতিবিম্ব ফেলে, তখন মনে হয় আপনি ইউরোপের কোনো প্রাচীন শহরে দাঁড়িয়ে আছেন। এখানকার এশিয়ার বৃহত্তম ঘণ্টাটি যখন সাতবার বেজে ওঠে, তখন সেই গম্ভীর ধ্বনি যেন সময়ের ইতিহাস ঘোষণা করে। প্রার্থনা কক্ষের ভেতরের মার্বেল টাইলস আর টেরাকোটার নকশাগুলো আপনাকে বিমুগ্ধ করবে।

জীবনানন্দের ছায়ায় ব্রজমোহন কলেজ আঙিনা

লাল গির্জার মায়াবী পরিবেশ থেকে রিকশায় চড়ে মাত্র কয়েক মিনিটের পথ পেরোলেই আপনি পৌঁছাবেন দক্ষিণ বাংলার অক্সফোর্ড খ্যাত ব্রজমোহন বা বিএম কলেজে। ১৮৮৯ সালে অশ্বিনী কুমার দত্তের হাতে গড়া এই বিদ্যাপীঠ কেবল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, এটি বাঙালির সাংস্কৃতিক চেতনার কেন্দ্রবিন্দু। এই ক্যাম্পাসের প্রতিটি ধূলিকণায় মিশে আছে কবি জীবনানন্দ দাশের পদচিহ্ন।

লাল-সাদা রঙে রাঙানো কলেজের মূল ভবনটি ব্রিটিশ আমলের আভিজাত্য বহন করে। কলেজের প্রধান ফটকে খোদাই করা ‘সত্য প্রেম পবিত্রতা’ বাণীটি আজও দর্শনার্থীদের স্বাগত জানায়। ক্যাম্পাসের ভেতরে হাঁটতে হাঁটতে আপনি দেখা পাবেন জীবনানন্দ দাশ চত্বরের। কবির আবক্ষ ভাস্কর্যের সামনে দাঁড়িয়ে হয়তো অজান্তেই আপনার মনে পড়বে তার সেই বিখ্যাত পঙক্তিÑ ‘আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরেÑ এই বাংলায়...’। কলেজের ক্যাফে জীবনানন্দ কিংবা প্রাচীন হোস্টেলগুলোর দেয়ালগুলো আজও কবির স্মৃতি বয়ে বেড়াচ্ছে। ক্যাম্পাসের বুনো লতাগুল্ম আর বিশাল খেলার মাঠের এক কোণে দাঁড়ালে আপনি সেই রূপসী বাংলার ঘ্রাণ পাবেন, যা জীবনানন্দকে অমর করে রেখেছে।

লাকুটিয়া জমিদার বাড়ির আভিজাত্য

শহর থেকে কিছুটা দূরত্বে ইজি বাইক বা অটোরিকশায় চড়ে আপনি রওনা হবেনÑ লাকুটিয়া জমিদার বাড়ির উদ্দেশ্যে। বরিশাল সদর উপজেলার লাকুটিয়া গ্রামে অবস্থিত এই বাড়িটি প্রায় ৩০০ বছরের পুরনো। জমিদার রাজচন্দ্র রায়ের এই কীর্তি আজ হয়তো লোনা ধরা দেয়াল আর পরগাছায় ঢাকা, কিন্তু এর জৌলুস এখনো ম্লান হয়নি।

বাড়িটির মূল কাঠামোটি দোতলা এবং এর চারপাশের নকশা করা জানালা ও বিস্তৃত বারান্দা এক চমৎকার স্থাপত্যশৈলীর নিদর্শন। বাড়ির আঙিনায় সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকা বিশালাকার মঠ বা সমাধিসৌধগুলো আপনাকে বিস্মিত করবে। লতাপাতা জড়িয়ে থাকা এই ধ্বংসস্তূপের মাঝেও যে এক ধরনের রাজকীয় বিষণœতা লুকিয়ে আছে, তা আপনাকে মুগ্ধ করবে। বাড়ির সামনে বিশাল দীঘি আর উদ্যানের ধ্বংসাবশেষ দেখলে বোঝা যায় একসময় এখানে কতটা জৌলুস ছিল। ইতিহাসপ্রেমী আর আলোকচিত্রীদের জন্য লাকুটিয়া জমিদার বাড়ি এক অনন্য স্বর্গরাজ্য। এখানে আসলে কেউই ছবি তুলতে ভোলেন না।

দুপুরের রসনা বিলাস ও বরিশালের দধি

ঘুরতে ঘুরতে দুপুর হলে আপনি ফিরে আসতে পারেন শহরে। বরিশালের দেশি হোটেলগুলোতে মধ্যাহ্নভোজ সেরে নেওয়াটা হবে এক অনন্য অভিজ্ঞতা। এই অঞ্চলের রান্নায় নারিকেলের দুধ আর সরিষার ব্যবহার খাবারে ভিন্ন মাত্রা যোগ করে। দুপুরের খাবারের পর বরিশালের বিখ্যাত মিষ্টি বা দই চেখে দেখতে ভুলবেন না। বিশেষ করে গৌরনদী বা মলিদার দইয়ের স্বাদ মুখে লেগে থাকার মতো। এর ঘন সর আর পরিমিত মিষ্টির স্বাদ আপনার ক্লান্ত শরীরে মুহূর্তেই প্রশান্তি এনে দেবে। স্থানীয় বাজারের ছোট ছোট দোকানে এই দইয়ের যে ঐতিহ্যবাহী পরিবেশনা দেখা যায়, তা আধুনিক শহরের রেস্তোরাঁয় মেলা ভার।

বারো আউলিয়ার দরবার ও আধ্যাত্মিক রহস্য

বিকেলের আলো যখন কিছুটা নরম হয়ে আসে, তখন আপনি রওনা দিতে পারেন বাকেরগঞ্জের বারো আউলিয়ার দরবারের দিকে। শহর থেকে প্রায় ২১ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই দরবারটি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মানুষের মিলনমেলা। অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক প্রকৃষ্ট উদাহরণ এই স্থানটি।

এখানকার প্রধান আকর্ষণ হলো মাটির নিচে দিয়ে যাওয়া এক রহস্যময় সুড়ঙ্গ পথ। কথিত আছে, ইসলাম প্রচারের জন্য আসা ১২ জন আউলিয়া এই সুড়ঙ্গ পথেই এক অলৌকিক উপায়ে অদৃশ্য হয়েছিলেন। এই সুড়ঙ্গটি দিয়ে যখন আপনি মাজারে প্রবেশ করবেন, তখন এক ধরনের রোমাঞ্চ আর আধ্যাত্মিক গাম্ভীর্য অনুভব করবেন। দরবারের ভেতরের প্রাচীন পাকুড় গাছ আর কালো পাথরের বেদীটি এক শান্ত গম্ভীর পরিবেশ তৈরি করে। লোকমুখে প্রচলিত অলৌকিক গল্পগুলো শুনতে শুনতে আপনি এখানে এক অন্যরকম সময় কাটাতে পারবেন।

কীর্তনখোলার তীরে গোধূলি বিলাস

একদিনের সংক্ষিপ্ত কিন্তু সমৃদ্ধ এই ভ্রমণের সমাপ্তিটা হওয়া চাই একদম নদীর কোলে। সন্ধ্যার আগমুহূর্তে আপনি চলে আসুন কীর্তনখোলা নদীর তীরে, যা স্থানীয়দের কাছে ‘ত্রিশ গোডাউন’ বা রিভারভিউ পার্ক নামে পরিচিত। নদীর শান্ত ও শীতল জলরাশি যখন আপনার গায়ের বাতাস ছুঁয়ে যাবে, তখন মনে হবে আপনার সমস্ত ক্লান্তি নদীর স্রোতে ধুয়ে যাচ্ছে।

নদীর পাড়ে বসে সূর্যাস্তের লাল আভা দেখা আর পারাপার হওয়া ছোট ছোট নৌকার দৃশ্য মনের কোণে এক গভীর প্রশান্তি এনে দেয়। সন্ধ্যার দিকে এখানে নানান পদের মুখরোচক স্ট্রিট ফুড যেমনÑ চটপটি, ফুচকা কিংবা ঝালমুড়ির পসরা বসে। নদীর ওপার থেকে আসা কোনো মাঝির গান কিংবা ছোট ছোট লঞ্চের ভেঁপুর শব্দ আপনাকে এক অদ্ভুত মায়ায় আচ্ছন্ন করবে। নদীর পাড়েই রয়েছে বধ্যভূমি স্মৃতিস্তম্ভ, যা আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের বীরত্বগাথা মনে করিয়ে দেয়।

ফেরার পালা

রাতের লঞ্চ ছাড়ার সময় হলে আপনি ঘাটে ফিরে আসতে পারেন। ফেরার পথে লঞ্চঘাটের আশপাশ থেকে বরিশালের বিখ্যাত আমড়া কিংবা বালাম চাল কিনে নিতে পারেন প্রিয়জনদের জন্য। কীর্তনখোলার জলে যখন চাঁদের প্রতিবিম্ব পড়বে আর লঞ্চটি ধীর গতিতে ঘাট ছেড়ে যাবে, তখন আপনার মনে হবে আপনি কেবল একটি শহর ঘোরেননি, বরং বাংলার এক সুপ্রাচীন ঐতিহ্যের গভীরে অবগাহন করেছেন। একদিনের এই বরিশাল ভ্রমণ আপনার স্মৃতিতে এক অমলিন দীর্ঘশ্বাস আর প্রশান্তি হয়ে বেঁচে থাকবে চিরকাল।