ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

প্রথম পর্বের পর

একটি বিয়ে বাড়ি ও দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম মহিলা নওয়াবের পদচিহ্নে

ইয়াছিন ইবনে ফিরোজ 
প্রকাশিত: এপ্রিল ২৫, ২০২৬, ০১:০৬ এএম

১৯০৩ মসজিদটি সালে নির্মাণ করেছিলেন স্বয়ং নওয়াব ফয়জুন্নেসা। তার জীবনের শেষ বছরেই তিনি এটি তৈরি করিয়েছিলেন। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে প্রথমবার যখন তাকালাম, বুকের ভেতরটা যেন এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। বাইরের গম্বুজ আকাশের দিকে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে, ঠিক যেন পরম করুণাময়ের দরবারে তোলা প্রার্থনারত হাত। মোগল স্থাপত্যের নিখুঁত আদলে নির্মিত এই মসজিদের দেয়ালে আরবেস্ক কারুকাজ, খিলানের ভেতরে আলোর নরম বিচ্ছুরণ।

ভেতরে ঢুকলে মানুষের কণ্ঠস্বর আপনাতেই নেমে আসে, কারণ এই গাম্ভীর্যপূর্ণ পরিবেশ তেমনটাই দাবি করে। ১২২ বছর আগে যখন এই মসজিদ নির্মিত হয়েছিল, তখন বাংলার মুসলিম সমাজ ছিল প্রান্তিক ও অবহেলিত। সেই কঠিন সময়ে একজন নারী জমিদার এমন একটি স্থাপত্যকীর্তি রেখে গেছেন, যা শুধু আল্লাহর ঘর নির্মাণেই সীমাবদ্ধ নয়, সৌন্দর্যের প্রতি তার যে গভীর শ্রদ্ধা ছিল তারই এক অপূর্ব প্রকাশ এই মসজিদ। আমরা নামাজ পড়লাম। সেই নামাজে ভিন্ন এক আবেগ আর আত্মশুদ্ধি ছিল। নামাজ শেষে দেখলাম, মসজিদের পাশেই নওয়াব ফয়জুন্নেসার কবর। সেখানে কোনো ফুল নেই, বাড়তি আলো নেই, আছে শুধু পিনপতন নীরবতা আর ইতিহাসের ভার। আমরা কবর জিয়ারত করলাম, দোয়া পড়লাম। সেখানে দাঁড়িয়ে আমার মনে হলো, এই মাটির নিচে শুয়ে আছেন এমন একজন মানুষ, যিনি তার কাজ আর কর্ম দিয়ে মৃত্যুকে চিরতরে হারিয়ে দিয়েছেন। মসজিদের পাশেই নওয়াব ফয়জুন্নেসা জাদুঘর। প্রবেশমূল্য মাত্র বিশ টাকা। টিকিট কেটে গেটের ভেতরে পা দিলাম। দুতলা বাড়িটির প্রথম তলায় জাদুঘর। দ্বিতীয় তলায় চোখ যেতেই আশ্চর্য হয়ে লক্ষ করলাম, সেখানে কিছু কাপড় শুকাতে দেওয়া হয়েছে! কৌতূহল সামলাতে না পেরে টিকিট কাউন্টারের আঙ্কেলকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘ওপরে কেউ থাকেন নাকি?’ তিনি নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বললেন, ‘হ্যাঁ। নওয়াব পরিবারের সপ্তম বংশধর এখনো এখানে বসবাস করেন।’

কথাটা শুনে ভেতরটা একটু কেঁপে উঠল। ইতিহাসের পাতায় যিনি এমন জীবন্ত, তার উত্তরসূরিরা আজও একই বাড়িতে থাকেন! প্রতিদিন শত শত মানুষ আসেন, দেখেন, ছবি তোলেন আর পরিবারটি নিঃশব্দে তাদের জীবন যাপন করে যায় ঠিক ওপরের তলায়। জিজ্ঞেস করলাম, ‘তারা কি মানুষের এই ভিড়ে বিরক্ত হন না?’ আঙ্কেল হাসলেন। বললেন, না। তারা তেমন নজর দেন না এদিকে, তারা বরং খুশি হন।’

তিনি আরও জানালেন, পরিবারের অনেকে ঢাকায় থাকেন, কেউ বিদেশে। বিশেষ উপলক্ষে পূর্বপুরুষের ভিটায় আসেন। আমি মনে মনে ভাবলাম, কী অদ্ভুত এই ভাগ্যের ভাঁজ! একজন মানুষ সারা জীবন মানুষের জন্য কাজ করে গেলেন, আর মৃত্যুর শত বছর পরেও তার বাড়ির দরজা সবার জন্য অবারিত থাকল। জাদুঘরের ভেতরে সাজানো আছে নওয়াবের ব্যবহৃত জিনিসপত্র ও পারিবারিক চিত্র। প্রতিটি প্রদর্শনী বস্তুর পেছনে লুকিয়ে আছে একটি জীবন, একটি সুদীর্ঘ সংগ্রামের গল্প।

নওয়াব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানীর কথা আমি আগে বইয়ে পড়েছিলাম, জেনেছিলাম। কিন্তু আজ ঠিক এই মাটিতে দাঁড়িয়ে তার সম্পর্কে জানতে জানতে আমার মুগ্ধতা একটা ভিন্ন মাত্রা পেল। ১৮৩৪ সালে কুমিল্লা জেলার হোমনাবাদ পরগনার (বর্তমান লাকসাম উপজেলা) পশ্চিমগাঁ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন ফয়জুন্নেসা চৌধুরানী। বাবা জমিদার আহমেদ আলী চৌধুরী, মা আরাফান্নেসা চৌধুরানী। মোগল রাজত্বের উত্তরসূরী এই প্রতাপশালী পরিবারে বড় হয়েছেন তিনি। কিন্তু আরাম-আয়েশ তার মনকে কখনো চার দেয়ালের মাঝে বন্দি করে রাখতে পারেনি। ছোটবেলা থেকেই বইয়ের প্রতি তাঁর টান ছিল অপ্রতিরোধ্য। বাবা গৃহশিক্ষক নিযুক্ত করলেন। সেই শিক্ষক তাজউদ্দিনের সাহায্যে ফয়জুন্নেসা দ্রুতই বাংলা, আরবি, ফার্সি ও সংস্কৃত, এই চারটি ভাষায় গভীর পা-িত্য অর্জন করলেন। সেই যুগে, সেই অবরুদ্ধ সমাজে, একজন মেয়ের এই পথ চলা কতটা কণ্টকাকীর্ণ ছিল, তা আজকের প্রজন্মের পক্ষে সহজে অনুমান করাও কঠিন। ১৮৬০ সালে আরেক জমিদার সৈয়দ মোহাম্মদ গাজীর সঙ্গে তার বিয়ে হয়। কিন্তু দাম্পত্যজীবন সুখের হলো না। ১৮৭১ সালে, বিয়ের সতেরো বছর পর, তিনি জানতে পারলেন, তার স্বামীর আগে থেকেই আরেকটি স্ত্রী আছে। সেই প্রচ- আঘাতেও ফয়জুন্নেসা ভেঙে পড়েননি। বরং সিদ্ধান্ত নিলেন নিজের পায়ে মজবুত হয়ে দাঁড়াবেন। বিয়ের দেনমোহরের এক লাখ এক টাকা দিয়ে এই পশ্চিমগাঁয়ে সাড়ে তিন একর জমিতে তিনি নিজের বাড়ি নির্মাণ শুরু করলেন। নির্মাণকাজ শেষ হতে সময় লাগল পুরো তিন বছর। এই বাড়িটাই আজকের সেই জাদুঘর, যেখানে আজ আমি বিস্ময় নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম। ১৮৭৩ সালে বাবার মৃত্যুর পর হোমনাবাদ পরগনার জমিদারি পেলেন। ১৮৮৫ সালে মায়ের মৃত্যুর পর মাতৃকূলের বিশাল সম্পত্তিও তার হাতে এলো। আর তিনি সেই অগাধ সম্পদ নিজের ভোগে না লাগিয়ে, দুই হাতে ঢেলে দিলেন মানুষের কল্যাণে।

১৮৭৩ সালে কুমিল্লায় প্রতিষ্ঠা করলেন উপমহাদেশের অন্যতম প্রাচীন বেসরকারি বালিকা বিদ্যালয়। পশ্চিমগাঁয়ে প্রতিষ্ঠা করলেন অবৈতনিক মাদ্রাসা, সঙ্গে বিশাল ছাত্রাবাস। মেয়েদের থাকার জন্য হোস্টেল তৈরি করলেন, মাসিক বৃত্তির ব্যবস্থা করলেন। ১৮৯৩ সালে কুমিল্লায় প্রতিষ্ঠা করলেন ‘ফয়জুন্নেসা জানানা হাসপাতাল’, যা ছিল কেবল নারীদের চিকিৎসার জন্য। ১৪টি প্রাথমিক বিদ্যালয়, অনেকগুলো দাতব্য প্রতিষ্ঠান, এতিমখানা, সড়ক নির্মাণ করলেন। ১৮৯৪ সালে হজ পালনকালে মক্কায় হাজিদের কষ্ট লাঘবে মুসাফিরখানা প্রতিষ্ঠা করলেন। হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সকল নারীর জন্য তিনি অবিরাম কাজ করে গেছেন। এমনকি জেলার তৎকালীন ম্যাজিস্ট্রেট ডগলাস যখন জমিদারদের কাছে উন্নয়নের জন্য ঋণ চাইলেন, ফয়জুন্নেসা তাকে ঋণ দেননি; বরং থলেভর্তি টাকা পাঠালেন স্রেফ ‘দান’ হিসেবে। এই নারী শুধু জমিদার ছিলেন না। তিনি ছিলেন একজন অনন্য স্বপ্নদ্রষ্টা। তার এই অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৮৮৯ সালে মহারানি ভিক্টোরিয়ার নির্দেশক্রমে এক আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানে তাকে ‘নওয়াব’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। তিনি হলেন দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম ও একমাত্র মহিলা নওয়াব।

জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তিনি ওয়ারিশদের প্রাপ্য বুঝিয়ে দিলেন, আর নিজের বাকি বিশাল জমিদারিকে পরিণত করলেন ওয়াকফ সম্পত্তিতে, চিরতরে সাধারণ মানুষের কল্যাণে উৎসর্গ করে। ১৯০৩ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর এই মহীয়সী নারীর জীবনাবসান ঘটে। তাকে দাফন করা হয় তারই প্রতিষ্ঠিত দশগম্বুজ মসজিদের পাশে, পারিবারিক কবরস্থানে। মৃত্যুর এক’শ বছর পর, ২০০৪ সালে, বাংলাদেশ সরকার তাকে মরণোত্তর ‘একুশে পদক’-এ ভূষিত করে। আজ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে তার নামে ছাত্রীনিবাস আছে।

জাদুঘর থেকে বের হওয়ার সময় বারবার মনে হলো, এই মানুষটি কি সত্যিই কখনো মরেছেন? না, মরেননি। তার বিদ্যালয়গুলোয় আজও প্রতিদিন মেয়েরা পড়তে যায়। তার হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে বেঁচে ফিরে আসা পরিবারগুলো আজও আছে। তার নামের ছাত্রীনিবাসে নিশ্চিন্তে রাত কাটায় হাজারো স্বপ্নবাজ মেয়ে। অমরত্ব তো একেই বলে!

জাদুঘর থেকে যখন বের হয়ে এলাম, গন্তব্য লাকসাম জংশন লেক। ততক্ষণে মসজিদ থেকে মাগরিবের আজান ভেসে আসছে, সেই সুমধুর ধ্বনি সন্ধ্যার লালচে আকাশে ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে। লেকের পাড়ের এক মসজিদে আমরা নামাজ পড়লাম। লেকের ধারে প্রচুর মানুষের ভিড়। শুক্রবারের ছুটির দিন হওয়ায় সবাই বেরিয়েছে, পরিবার নিয়ে, বন্ধু নিয়ে। ফুচকাওয়ালা, আচারওয়ালা, বেলপুরিওয়ালা, সবার ব্যবসাই বেশ জমজমাট। নামাজ শেষে আমরাও যোগ দিলাম এই আনন্দ মেলায়। প্রথমে খেলাম টাটকা আনারস, রসালো মিষ্টি। তারপর নানারকম আচার, টক-ঝাল-মিষ্টির সেই অপূর্ব সমন্বয়, যেটা শুধু এই বাংলার পথের ধারেই এমন নিখুঁতভাবে পাওয়া যায়। আর সবশেষে বেলপুরি। সারাদিনের ঘোরাঘুরির একটা ক্লান্তি শরীরে ভর করেছে ঠিকই, কিন্তু মনে তখন একরাশ প্রশান্তি। এই দুটো বিপরীত জিনিস কীভাবে একসঙ্গে থাকে, পৃথিবীর কোনো দার্শনিক হয়তো তার সঠিক ব্যাখ্যা দিতে পারবেন না।

রাত তখন সাতটা পঞ্চাশ। লাকসাম জংশন থেকে পদুয়ার বাজারের উদ্দেশ্যে সিএনজিতে উঠলাম। রাতের পথ দিনের চেয়ে একেবারেই ভিন্ন রকম। আলো কম, আকাশের তারা বেশি। সিএনজির ঝাঁকুনিতে বাইরে অন্ধকারের দিকে তাকাই। অন্ধকারের মাঝে মাঝে উঁকি দিচ্ছে ছোট্ট আলোর বিন্দু কোনো গ্রামের সাধারণ ঘরের জানালা। সেই নিভু নিভু আলোর পেছনে একটা জ্যান্ত জীবন আছে, একটা পরিবার আছে, একটা না বলা গল্প আছে। আমার কাছে পথ চলার সবচেয়ে বড় আনন্দ এটাই অজানা মানুষের অজানা জীবনের সঙ্গে একটা ছোট্ট মুহূর্তের জন্য অদৃশ্য স্পর্শ লাগা। পদুয়ার বাজার থেকে ছোট বাসে করে কোটবাড়ি। কোটবাড়িতে নামতেই দেখি, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের নীল বাস আসছে। কতটা সময়মতো! কতটা যেন আপনাআপনি মিলে গেল সবকিছু আজকের দিনে। বাসে উঠলাম। ক্যাম্পাসের সেই পরিচিত চেনা পথে ফিরলাম। নিজের নীড়ে। ক্যাম্পাসে ফিরে রাজীব ভাই আমাদের চা খাওয়ালেন। অনেকক্ষণ ধরে কথা হলো আমাদের মাঝে। জীবনে এমন কিছু দিন আসে, যেগুলো মানুষ ভুলতে চাইলেও আর ভুলতে পারে না। আজকের এই দশই এপ্রিল দিনটা ঠিক সেরকমই একটা দিন।

এপ্রিলের দশ তারিখের এই দিনটির কথা স্মরণ করতে গিয়ে গভীরভাবে বুঝেছি, কিছু অনুভূতি কাগজে-কলমে পুরোপুরি লেখা যায় না। মুখ হয়তো অনেক কথা বলতে পারে, কিন্তু বুকের ভেতরের খাঁটি অনুভূতিগুলো সবসময় কথা বলতে পারে না। তবু আমি লিখলাম। কারণ লেখা হলো সেই দ্বিতীয় সেরা জিনিস, যা না থাকলে সময় নামক স্রোত একদিন সব স্মৃতি ধুয়ে নিয়ে যায়। লেখা থাকলে অন্তত স্মৃতিটুকু বেঁচে থাকে।

লেখক : শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়