× UCB Sticker Card
বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

নলছিটি (ঝালকাঠি) প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ডিসেম্বর ২৮, ২০২৫, ১০:০৫ এএম

শীতের সকালে শূন্য রসের হাঁড়ি!

নলছিটি (ঝালকাঠি) প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ডিসেম্বর ২৮, ২০২৫, ১০:০৫ এএম

ছবি : রূপালী বাংলাদেশ

ছবি : রূপালী বাংলাদেশ

শীতের কুয়াশাভেজা ভোর একসময় নলছিটির গ্রামগুলো জেগে উঠত খেজুর রসের মিষ্টি গন্ধে। উঠোনে ফুটতে থাকা রসের হাঁড়ি, মাটির চুলায় পিঠা-পুলির আয়োজন আর পরিবারের সবাইকে ঘিরে থাকা শীতের আনন্দ এসবই ছিল গ্রামবাংলার চিরচেনা ছবি। আজ সেই দৃশ্য ক্রমে হারিয়ে যাচ্ছে। টাকায় মিলছে না খেজুর রস। আর মিললেও মিলছে না সেই ঐতিহ্যের স্বাদ ও আবেগ।

একসময় শীত এলেই গ্রামের প্রতিটি বাড়িতে খেজুর রস দিয়ে পায়েস, পিঠা, নলেন গুড়, ঝোলা গুড় ও পাটালি গুড় তৈরির ধুম পড়ে যেত। গাছিরা গভীর রাত থেকে কুয়াশা ভেদ করে রস সংগ্রহে ব্যস্ত থাকতেন। সকাল হলেই গ্রামবাংলা ভরে উঠত মিষ্টি গন্ধে। এই রস ও গুড় শুধু খাদ্যই ছিল না; ছিল গ্রামীণ অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

কালের বিবর্তনে সেই দৃশ্য আজ অনেকটাই হারিয়ে গেছে। নলছিটিতে খেজুর গাছের সংখ্যা দ্রুত কমে যাওয়ায় গাছি ও রসের সঙ্গে জড়িত বহু মানুষ অন্য পেশায় চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন। বর্তমানে কোথাও কোথাও হাতে গোনা কিছু খেজুর গাছ কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

উপজেলার কিছু এলাকা, যেমন—কুশঙ্গল, রানাপাশা, কুলকাঠি ও মগর এলাকায় কয়েকজন গাছি রস আহরণ করছেন, যা চাহিদার তুলনায় খুবই সীমিত। ফলে ছোট একটি হাঁড়ির রসের দাম ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকায় পৌঁছেছে। তা ছাড়া বাজারে যেসব পাটালির নামে বিক্রি হচ্ছে, সেগুলো ভেজালে ভরা, নামমাত্র ফ্লেভার ও ক্ষতিকর রং মিশ্রিত পাটালি।

স্থানীয় বাসিন্দা মো. সোহেল রানা বলেন, শীত এলেই আগে নিজের বাড়ির খেজুর রস দিয়ে পিঠা-পায়েস বানাতাম। এখন খুঁজেও রস পাওয়া যায় না। আর যেটুকু পাওয়া যায়, তার দাম এত বেশি যে সাধারণ মানুষের পক্ষে কেনা কঠিন হয়ে গেছে।

শুনেছি কুশঙ্গল এলাকায় কিছু রস পাওয়া যায়, তাও সিরিয়াল লম্বা এবং এক কলসি রসের দাম এক হাজার টাকা। এটা আমাদের মতো পরিবারের জন্য অনেক। ফলে বাধ্য হয়ে দোকানের চিনি বা গুড় দিয়েই পিঠা বানাতে হচ্ছে। এতে আগের সেই স্বাদও নেই, আনন্দটাও আর আগের মতো লাগে না।

আরেক বাসিন্দা মো. সৈকত আলী বলেন, একসময় শীতের রাতে বন্ধুরা মিলে খেজুর গাছের হাঁড়ি খুলে রস সংগ্রহ করতাম। সেই রস দিয়ে শিরনি ও পায়েস রান্না করে খোলা মাঠে বসে মিলেমিশে খাওয়ার ছিল এক অনন্য আনন্দঘন সময়। কিন্তু এখন সেই দিনগুলো কেবল স্মৃতিতে রয়ে গেছে।

তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, বর্তমান প্রজন্মের অনেক সন্তানই হয়তো আর জানতেই পারবে না খেজুর গাছে রসও হয়।

নলছিটির দীর্ঘদিনের গাছি মো. রফিক হাওলাদার বলেন, খেজুর গাছ না থাকায় এখন আর আগের মতো রস কাটার সুযোগ নেই। আগে এক মৌসুমে ৩০-৪০টি গাছ কাটতাম, এখন হাতে গোনা দু একটি গাছ পাওয়া যায়। অনেক জায়গায় গাছ কেটে ফেলা হয়েছে ইটভাটার জন্য। রস কাটতে না পারায় বাধ্য হয়ে অন্য কাজ করতে হচ্ছে। এতে শুধু আমাদের পেশাই নয়, গ্রামবাংলার একটি পুরোনো ঐতিহ্যও ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে।

খেজুর গাছ কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে ইটভাটায় জ্বালানি হিসেবে এসব গাছের ব্যবহার। বাড়িঘর নির্মাণ বৃদ্ধি এবং ইটভাটার চাহিদা মেটাতে নির্বিচারে খেজুর গাছ কেটে ফেলা হচ্ছে। খেজুর গাছ পোড়ালে ইটের রং গাঢ় হওয়ায় ভাটায় এর চাহিদা তুলনামূলক বেশি। সস্তা দামে সহজলভ্য হওয়ায় এসব গাছ দ্রুত উজাড় হয়ে যাচ্ছে।

একই সঙ্গে সঠিক পদ্ধতিতে রস আহরণের অভাবেও অনেক খেজুর গাছ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এতে একদিকে যেমন গাছ মারা যাচ্ছে, অন্যদিকে হারিয়ে যাচ্ছে একটি প্রাচীন মৌসুমি পেশা। এর প্রভাব পড়ছে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী খাদ্যসংস্কৃতি ও লোকাচারের ওপর।

এ বিষয়ে কৃষিবিদ মো. মাহবুবুর রহমান জানান, খেজুর গাছ একটি দীর্ঘমেয়াদি ও পরিবেশবান্ধব সম্পদ। এটি শুধু রস ও গুড়ের জন্য নয়, গ্রামীণ জীবিকায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু নির্বিচারে গাছ কাটার ফলে খেজুর গাছের স্বাভাবিক পুনর্জন্ম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

পরিকল্পিতভাবে খেজুর গাছ রোপণ, ইটভাটায় জ্বালানি হিসেবে খেজুর গাছ ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ এবং আধুনিক ও নিরাপদ পদ্ধতিতে রস আহরণে গাছিদের প্রশিক্ষণ দেওয়া গেলে খেজুর রসের ঐতিহ্য আবার ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, পরিকল্পিতভাবে খেজুর গাছ রোপণ, ইটভাটায় খেজুর গাছের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ এবং গাছিদের প্রশিক্ষণের উদ্যোগ না নিলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই খেজুর রস ও গুড় গ্রামবাংলার বাস্তব জীবন থেকে প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে।

শীত আসছে, কিন্তু খেজুর রসের সেই পুরোনো উৎসবের আমেজ আর আগের মতো নেই। ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে এক সময়ের প্রাণের ঐতিহ্য।

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!