উত্তরাঞ্চলে জেঁকে বসেছে শীত। সীমান্তবর্তী জেলা জয়পুরহাটে খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহ করছেন গাছিরা। সেই রস থেকে তৈরি করা হচ্ছে সুস্বাদু ও মুখরোচক গুড়। শীতের কুয়াশাভেজা ভোরের আগেই রসভর্তি মাটির কলসি গাছ থেকে নামানোর পর টিনের বড় তাওয়ায় জ্বাল দিয়ে পাটালি ও লালি গুড় তৈরি করা হচ্ছে।
জয়পুরহাটের কুটিবাড়ী, চল্লিশীম পীরের দরগাহ, হানাইল, বম্বু, আক্কেলপুর, পাঁচবিবিসহ বিভিন্ন গ্রামে গাছিরা গাছ ভাড়া করে রস সংগ্রহ করে খাঁটি গুড় তৈরি করছেন। এসব গুড়ের চাহিদা ব্যাপক। কারণ দেখেশুনে খাঁটি গুড় ক্রয় করছেন ক্রেতারা। পিঠা-পুলি, সন্দেশসহ নানা রকম পিঠার সঙ্গে এই গুড় খাওয়ার প্রচলন এ এলাকার মানুষের বহুদিনের।
মান ভালো হওয়ায় দূরদূরান্ত থেকে গুড় কিনতে আসছেন সাধারণ ক্রেতা ও ব্যবসায়ীরা। আবার অনেকেই আসছেন খেজুরের রস পান করতে। তবে নিপাহ ভাইরাসের কারণে কাঁচা রস না খেয়ে ফুটিয়ে বা গুড় করে খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন জেলা সিভিল সার্জন।
উত্তরের সীমান্তবর্তী ছোট জেলা জয়পুরহাটে এক সপ্তাহ ধরে তীব্র শীত পড়েছে। ঘন কুয়াশা আর হালকা হিমেল বাতাস শীতের প্রকোপ বাড়িয়ে দিয়েছে।

এদিকে শীতের আমেজে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে প্রায় ৫০০ গাছি জয়পুরহাটে এসেছেন খেজুরের রস সংগ্রহে। তারা জেলার প্রায় ১৫ হাজার খেজুর গাছ ভাড়া নিয়ে রস সংগ্রহ করছেন। গভীর রাত থেকে দিন পর্যন্ত যেন দম ফেলার সময় নেই তাদের। সেই রস থেকেই তৈরি করা হচ্ছে সুস্বাদু খেজুরের পাটালি ও লালি গুড়।
গাছিরা তীব্র শীত উপেক্ষা করে ভোররাতের মধ্যেই গাছ থেকে রস সংগ্রহ করে আনেন। এরপর টিনের বড় তাওয়ায় রেখে তিন থেকে চার ঘণ্টা জ্বাল দেন। এরপর আরও কয়েকটি প্রক্রিয়া শেষে তৈরি করা হয় সুস্বাদু গুড়। ভেজালমুক্ত এই গুড় কিনতে আসছেন সাধারণ ক্রেতারা। আবার অনেকে খেজুরের রস পান করতেও আসেন। চার মাস ধরে চলবে এই রস সংগ্রহ। চলতি মৌসুমে জেলায় ২০০ টন গুড় উৎপাদনের আশা কৃষি বিভাগের।
রাজশাহী থেকে জয়পুরহাট সদর উপজেলার কুঠিবাড়ী ব্রিজ এলাকায় এসেছেন গাছি আনসার আলী। তিনি বলেন, কার্তিক মাসে আমরা জয়পুরহাটে এসে বিভিন্ন এলাকায় খেজুর গাছে হাঁড়ি লাগিয়েছি। আমরা ছয়জন মিলে ৩৫০টি খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহ করি। প্রতিদিন ৩০ থেকে ৩৫ মণ রস সংগ্রহ হয়। এই রস থেকে প্রতিদিন দুই থেকে তিন মণ গুড় উৎপাদন হয়। মাসে হয় ১২০ থেকে ১২৫ মণ। পুরো মৌসুমে হবে প্রায় ৫০০ মণ।
একই জেলার আবদুল আলীম নামে এক গাছি বলেন, বিভিন্ন জেলা থেকে গাছিরা এসে জয়পুরহাটের বিভিন্ন এলাকায় অস্থায়ী ঘর করে সেখানে গুড় তৈরি করেন। রাত ৩টার দিকে বের হয়ে খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহ করি। এরপর ভোরে সেই রস তাওয়ায় রেখে জ্বাল দেওয়া শুরু করি। তিন থেকে চার ঘণ্টা পর গুড় তৈরি হয়। প্রতি কেজি ভালো মানের গুড় বিক্রি হচ্ছে ৪০০ টাকা আর সাধারণ মানের গুড় ২০০ টাকা কেজি দরে। পাশাপাশি খেজুরের রস বিক্রি হচ্ছে ৬০ টাকা কেজিতে।
মাজেদুল নামে এক গাছি বলেন, আমরা সাতজন বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে খেজুরের রস সংগ্রহ করি। এরপর তিন থেকে চার ঘণ্টা জ্বাল দেওয়ার পর রস থেকে গুড় তৈরি হয়। পরে ব্যবসায়ী ও সাধারণ ক্রেতারা গুড় কিনে নিয়ে যান। অনেকে রস খেতেও আসেন। আমরা ভেজাল ছাড়াই গুড় উৎপাদন করি। সরকার থেকে যদি প্রশিক্ষণসহ অন্যান্য সহযোগিতা পাওয়া যেত, তাহলে আরও ভালোভাবে গুড় উৎপাদন ও বাজারজাত করা সম্ভব হতো।
জয়পুরহাট সদর উপজেলার ভাদসা গ্রামের আবদুল মতিন নামে এক ক্রেতা বলেন, গুড় কেনা ও রস খাওয়ার জন্য এখানে এসেছিলাম। কুঠিবাড়ী ব্রিজ এলাকায় মানসম্মত গুড় ও খেজুরের রস পাওয়া যায়। এখানে এসে রস খেয়েছি এবং এক কেজি গুড় কিনেছি।

ধলাহার গ্রামের আবুল কাশেম নামে আরেক ক্রেতা বলেন, শীতের দিনে আমার বাড়িতে আত্মীয়স্বজন এসেছে। এ জন্য পিঠা তৈরির জন্য গুড় কিনতে এসেছি। এখানকার গুড় অনেক ভালো। তাই দুই কেজি কিনেছি।
একই গ্রামের আনিছুর রহমান বলেন, দুই দিন আগে বাড়িতে মেয়েজামাই এসেছে। এ জন্য চাল থেকে আটা করে এনেছি। এখন পিঠা-পুলি করার জন্য এখান থেকে দেড় কেজি গুড় কিনলাম।
জয়পুরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সাদিকুল ইসলাম বলেন, জেলায় এবার প্রায় ১৫ হাজার খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহ করছেন গাছিরা। শীতের সময় গুড়ের চাহিদা থাকায় বিগত বছরের তুলনায় এবার গাছির সংখ্যা বেড়েছে। এ মৌসুমে জেলায় ২০০টন গুড় উৎপাদন হবে বলে আশা করছি। গুড় উৎপাদনের ক্ষেত্রে বাদুড় বা এ ধরনের প্রাণী যেন রসের সংস্পর্শে না আসে, সে বিষয়ে গাছিদের পরামর্শ ও নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে।
এ বিষয়ে জয়পুরহাটের সিভিল সার্জন ডা. আল মামুন বলেন, রাতে খেজুর গাছের রস বাদুড় খায়। তাই এই রস কাঁচা খেলে নিপাহ ভাইরাসের ঝুঁকি থাকে। কাঁচা খেজুরের রস কোনোভাবেই খাওয়া যাবে না। রস ফুটিয়ে বা গুড় করে খেতে হবে। কাঁচা রস যেন কেউ না খায়, সে জন্য গাছি ও যেসব এলাকায় গাছে রস সংগ্রহ করা হচ্ছে, সেসব এলাকার মানুষকে সতর্ক করা হচ্ছে।


সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন