সিরাজগঞ্জের তাড়াশে বিদ্যার দেবী সরস্বতী পূজা উপলক্ষে শুক্রবার দিনব্যাপী উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে প্রায় ৩০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী দই মেলা।
বৃহস্পতিবার বিকেল থেকেই উপজেলার ঐতিহাসিক জমিদারবাড়ির সামনে রসিক রায় মন্দিরসংলগ্ন পৌর বাজার ঈদগাহ মাঠে মেলার প্রস্তুতি শুরু হয়। দোকানিরা দইয়ের পসরা সাজিয়ে বসেন। দই কিনতে ভিড় করেন হিন্দু-মুসলমানসহ বিভিন্ন ধর্মের মানুষ।
শুক্রবার (২৩ জানুয়ারি) সকাল থেকে বিভিন্ন এলাকার নামকরা ঘোষদের দই আগমনের মাধ্যমে প্রতিবছরের মতো শুরু হয় তাড়াশের ঐতিহ্যবাহী দই মেলা। মেলায় দইয়ের পাশাপাশি ঝুড়ি, মুড়ি-মুড়কি, চিড়া, বাতাসা, কদমসহ নানা ধরনের রসনাবিলাসী খাবারের দোকান বসে।
দইয়ের স্বাদের কারণে এ অঞ্চলের দইয়ের রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন নাম ও খ্যাতি। মেলায় ক্ষীরসা দই, শাহি দই, টক দই, ডায়াবেটিক দইসহ বগুড়ার শেরপুর, রায়গঞ্জের চান্দাইকোনা, নাটোরের গুরুদাসপুরের শ্রীপুর, উল্লাপাড়ার ধরইল, পাবনার চাটমোহরের হান্ডিয়াল ও তাড়াশের দই—এমন হরেক নামের শত শত মণ দই বিক্রি হয়। বিশেষ করে বগুড়া ও চান্দাইকোনার দইয়ের চাহিদা চোখে পড়ার মতো ছিল।
জানা যায়, চলনবিল অধ্যুষিত তাড়াশের তৎকালীন জমিদার পরম বৈষ্ণব বনোয়ারী লাল রায় বাহাদুর প্রথম এই দই মেলার প্রচলন করেন। জনশ্রুতি আছে, জমিদার রায় বাহাদুর নিজে দই ও মিষ্টান্ন খুব পছন্দ করতেন।

জমিদারবাড়িতে আগত অতিথিদের আপ্যায়নে স্থানীয় ঘোষদের তৈরি দই পরিবেশন করা হতো। সেই ধারাবাহিকতা থেকেই জমিদারবাড়ির সামনে রসিক রায় মন্দিরের মাঠে সরস্বতী পূজা উপলক্ষে দই মেলার সূচনা হয়, যা যুগ যুগ ধরে চলে আসছে।
মেলায় দই বিক্রি করতে আসা উজ্জ্বল ঘোষ বলেন, আজ মেলায় দই নিয়ে এসেছি। চাহিদা ভালো থাকায় দুপুরের মধ্যেই দই শেষ হয়ে যাবে বলে আশা করছি। তবে দুধের দাম, জ্বালানি, শ্রমিক খরচ ও দইয়ের পাত্রের মূল্য বৃদ্ধির কারণে দইয়ের দাম কিছুটা বেড়েছে।
দই কিনতে আসা রাজিব খান বলেন, সাধারণ সময়েও দই কেনা হয়, তবে মেলায় এসে দই কেনার আনন্দটাই আলাদা। আমি প্রতিবছরই এই মেলা থেকে দই কিনি।
আরেক ক্রেতা আতাহার আহমেদ আবির বলেন, সরস্বতী পূজা উপলক্ষে এই দই মেলা আমাদের পরিবারের জন্য আনন্দের অংশ। দই, মুড়ি, চিড়া ও মুড়কি কিনতে এসেছি। এখানকার দইগুলো খুবই সুস্বাদু।
সিরাজগঞ্জ জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের যুগ্ম সম্পাদক ও তাড়াশ উপজেলা সনাতন সংস্থার সভাপতি তপন কুমার গোস্বামী বলেন, আমরা পূর্বপুরুষদের সময় থেকেই এই ঐতিহাসিক দই মেলা উদযাপন করে আসছি। মেলা উপলক্ষে আত্মীয়স্বজনদের আমন্ত্রণ জানানো হয়। সকল ধর্মের মানুষের অংশগ্রহণে মিলনমেলায় পরিণত হয় এই আয়োজন।
ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় শতাব্দীপ্রাচীন এই দই মেলা আগামী দিনে আরও প্রসারিত হবে—এমনটাই প্রত্যাশা দইপ্রেমী ও স্থানীয়দের।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন