জন্মগত শারীরিক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে পৃথিবীতে আসা নবজাতককে ঘিরে এক মর্মস্পর্শী ঘটনার সৃষ্টি হয়েছে পিরোজপুরে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে বিষয়টি প্রকাশ পেলেও সন্তানের প্রতি কোনো দায়িত্ব নিতে রাজি হননি বাবা। শেষ পর্যন্ত নিজের শিশুকে বুকে জড়িয়ে একাই হাসপাতাল থেকে বাড়ির পথে রওনা হন মা লিজা আক্তার।
মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) দুপুরে নেছারাবাদ উপজেলার মিয়ারহাট বন্দরের নিউ সততা প্রাইভেট হাসপাতাল থেকে সন্তানকে নিয়ে বের হন তিনি। লিজার বাড়ি নাজিরপুর উপজেলার কলারদোয়ানিয়া গ্রামে। জীবিকার তাগিদে তিনি ঢাকায় দিনমজুর হিসেবে কাজ করেন।
গত ২২ এপ্রিল রাতে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে একটি ছেলে সন্তানের জন্ম দেন লিজা। কিন্তু জন্মের পর দেখা যায়, শিশুটির দুই পা ও একটি হাত নেই। এ খবর শুনে বাবা আল আমিন নবজাতককে মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানান। এমনকি শিশুটিকে অন্যত্র দিয়ে দেওয়ার কথাও বলেন।
স্বামীর এমন সিদ্ধান্তে ভেঙে পড়লেও দৃঢ় অবস্থান নেন লিজা। মায়ের ভালোবাসায় তিনি সন্তানের পাশে থাকার সিদ্ধান্তে অটল থাকেন। তার আগে থেকেই একটি ছেলে ও একটি মেয়ে রয়েছে। তৃতীয় সন্তানের জন্মের পর স্বামীর আচরণ তাকে কষ্ট দিলেও সন্তানকে ত্যাগ করার প্রশ্নই আসে না বলে জানান তিনি।
হাসপাতালে বসে আবেগাপ্লুত কণ্ঠে লিজা বলেন, তার সন্তান স্বাভাবিকভাবে জন্মায়নি বলেই বাবা তাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। কিন্তু তিনি কখনোই সন্তানকে ফেলে দিতে পারবেন না। প্রয়োজনে স্বামীর সঙ্গ ছাড়লেও সন্তানকে আগলে রাখবেন এবং নিজেই মানুষ করে তুলবেন।
তিনি আরও বলেন, যতদিন বেঁচে থাকবেন, শ্রম দিয়ে সন্তানের ভরণপোষণ চালাতে পারবেন। তবে নিজের মৃত্যুর পর সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগই তাকে সবচেয়ে বেশি ভাবাচ্ছে। এ অবস্থায় সহৃদয় মানুষের সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।
এদিকে, মানবিকতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। লিজার আর্থিক অবস্থা বিবেচনায় সিজারিয়ান অপারেশনসহ সব চিকিৎসা ব্যয় মওকুফ করা হয়েছে। হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক গোলাম মোস্তফা এ সিদ্ধান্ত নেন। পাশাপাশি অপারেশন পরিচালনাকারী চিকিৎসক ডা. প্রীতিষ বিশ্বাসও কোনো ফি নেননি।
চিকিৎসক জানান, জিনগত কারণ কিংবা গর্ভকালীন সঠিক চিকিৎসার অভাবে এমন শারীরিক প্রতিবন্ধকতা দেখা দিতে পারে। ঝুঁকিপূর্ণ হলেও অপারেশনটি সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে।
এই ঘটনাটি একদিকে যেমন একজন পিতার কঠোর মনোভাবকে সামনে এনেছে, তেমনি অন্যদিকে এক মায়ের অটুট ভালোবাসা ও সাহসিকতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

