বর্ষায় উত্তাল ঢেউ আর ভাঙনের তাণ্ডব, আর শীত আসতেই খাঁ খাঁ মরুভূমি—তিস্তার এই দুই রূপই এখন তীরের মানুষের খুব চেনা। তবে এবার ভাগ্যের চাকা ঘোরার নতুন স্বপ্ন দেখছেন নদীপাড়ের দুই কোটি মানুষ। উত্তরের মানুষের কাছে তিস্তা এখন শুধু একটি নদী নয়; এটি জীবন-জীবিকা, কৃষি ও টিকে থাকার লড়াইয়ের প্রতীক। বছরের পর বছর শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট আর বর্ষায় আকস্মিক বন্যায় চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে তিস্তাপারের মানুষকে। এমন বাস্তবতায় বহু আলোচিত ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’ নিয়ে আবারও আশার আলো দেখছেন উত্তরাঞ্চলের বাসিন্দারা।
সম্প্রতি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর চীন সফর এবং আগামী জুনে প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য চীন সফরকে ঘিরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন নিয়ে। তিস্তাপারের মানুষের প্রত্যাশা, এবার হয়তো দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান ঘটবে এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যাবে।
২০১৬ সালের পর টানা তিন বছর তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে সমীক্ষা চালায় চীনের প্রতিষ্ঠান ‘পাওয়ার চায়না কনস্ট্রাকশন’। শুরু থেকেই প্রকল্পে অর্থায়নের আগ্রহ দেখিয়ে আসছে চীন। তবে ভূরাজনৈতিক কারণে বিগত দিনে এ বিষয়ে নানা জটিলতা তৈরি হয়। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বর্তমান সরকার আবারও চীনের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ায়। চলতি বছরের জানুয়ারিতে তৎকালীন পানিসম্পদ উপদেষ্টা চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনকে সঙ্গে নিয়ে তিস্তা অববাহিকা পরিদর্শন করেন। পরবর্তীতে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের সঙ্গে সাক্ষাতে চীনের রাষ্ট্রদূত জানান, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে বেইজিং সবসময়ই প্রস্তুত রয়েছে।
এসব কূটনৈতিক তৎপরতায় সাধারণ মানুষ আশাবাদী হলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু বিদেশি অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি নয়, এখন প্রয়োজন বাস্তবায়নের সুস্পষ্ট রূপরেখা।
‘তিস্তা বাঁচাও, নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদ’-এর সাধারণ সম্পাদক শফিয়ার রহমান বলেন, ‘নির্বাচনের আগে বর্তমান সরকার তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করেছিল। তিস্তাপারের মানুষ এখন সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন দেখতে চায়। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর চীন সফর ঘিরে আমরা আশাবাদী, আমরা চাই দ্রুত প্রকল্পের কাজ শুরু হোক।’
অন্যদিকে, রিভারাইন পিপলের পরিচালক ও বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. তুহিন ওয়াদুদ বলেন, ‘প্রকল্প বাস্তবায়নে কেবল বিদেশি অর্থায়নের অপেক্ষায় বসে থাকা ঠিক হবে না। তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে লক্ষ কোটি টাকার প্রয়োজন নেই। সরকার চাইলে নিজস্ব অর্থায়নে প্রতি বছর নির্দিষ্ট বরাদ্দ দিয়েও কাজটি এগিয়ে নিতে পারে। এখন আর প্রতিশ্রুতি নয়, আমরা বাস্তব পদক্ষেপ দেখতে চাই।’
তিনি আরও যোগ করে বলেন, ‘দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত পানি বণ্টন চুক্তির কারণে উত্তরের কৃষি ও পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। যদি মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে কোনো আন্তর্জাতিক বাধা আসে, তবে প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার বিষয়টিও সরকারকে ভাবতে হবে।’
‘তিস্তা বাঁচাও, নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদ’-এর সভাপতি নজরুল ইসলাম হক্কানী বলেন, ‘আগামী জুনে প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে কোনো অর্থনৈতিক চুক্তি হবে কি না, সেটি এখন সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।’
তিস্তাপারের মানুষের দীর্ঘদিনের অভিযোগ, শুষ্ক মৌসুমে ভারত একতরফাভাবে পানি প্রত্যাহার করায় নদী মৃতপ্রায় হয়ে পড়ে, আবার বর্ষায় অতিরিক্ত পানি ছেড়ে দেওয়ায় বন্যায় ঘরবাড়ি ও ফসল বিলীন হয়। ফলে কৃষি, জীবিকা ও পরিবেশ—সব ক্ষেত্রেই দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
এমন বাস্তবতায় তিস্তা মহাপরিকল্পনাকে শুধু একটি উন্নয়ন প্রকল্প হিসেবে নয় বরং উত্তরাঞ্চলের মানুষের অস্তিত্ব রক্ষার উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। তাই রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও কূটনৈতিক আলোচনার বাইরে গিয়ে দ্রুত কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ দেখতে চায় নদীপারের কোটি মানুষ।



সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন