হামের উপসর্গে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা প্রতিদিনই বাড়ছে। এতে সন্তান নিয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় রয়েছেন অভিভাবকরা। ময়মনসিংহে অবহেলার কারণে হামের টিকা না পাওয়া শিশুরাই বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। অনেক শিশু শারীরিকভাবে দুর্বল থাকায় দ্বিতীয়বারও এ রোগে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছে। এদিকে, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হামে আক্রান্ত হয়ে শিশু মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে ৪৮ হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তারা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি শিশুকে টিকা প্রদান করেছেন।
হামের প্রাদুর্ভাব বেড়ে যাওয়ায় গত ২০ এপ্রিল থেকে দেশজুড়ে ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়। ময়মনসিংহ জেলায় টিকার ডোজের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় ৫ লাখ ৯৯ হাজার ৮৪০ এবং সিটি করপোরেশনে ৫৮ হাজার ৬৬৮ ডোজ। এর মধ্যে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে জেলায় ১০১ দশমিক ৬৬ শতাংশ এবং সিটি করপোরেশনে ১০৬ শতাংশ শিশুকে টিকা প্রদানের কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
ঘটা করে টিকাদান কর্মসূচি বাস্তবায়নের দেড় মাস পেরিয়ে গেলেও হামে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা কোনোভাবেই কমছে না।
প্রতিদিন গড়ে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে হামের উপসর্গ নিয়ে ২৫ থেকে ৩০ জন শিশু ভর্তি হচ্ছে। ভর্তি হওয়া শিশুদের ৯৫ শতাংশই হামের টিকা নেয়নি। এ জন্য অভিভাবকদের অবহেলার পাশাপাশি কর্তৃপক্ষকেও দায়ী করছেন নাগরিক নেতারা।
ময়মনসিংহের ১৩ উপজেলার মধ্যে হামের হটস্পট হিসেবে পরিচিত সদর, ত্রিশাল, ফুলপুর ও মুক্তাগাছা। গত তিন মাসে সদরে হামের উপসর্গে আক্রান্ত হয়েছে ৪১৬ শিশু, মৃত্যু হয়েছে ৬ শিশুর। ত্রিশালে আক্রান্ত হয়েছে ১৩৯ শিশু, মৃত্যু হয়েছে ৩ শিশুর। ফুলপুরে আক্রান্ত হয়েছে ৭৩ শিশু, মৃত্যু হয়েছে ৪ শিশুর এবং মুক্তাগাছায় আক্রান্ত হয়েছে ৮৩ শিশু, মৃত্যু হয়েছে ৩ শিশুর। বাকি উপজেলা ও সিটি করপোরেশন এলাকার চিত্রও প্রায় একই।
সোমবার (৮ জুন) সকালে হাসপাতাল থেকে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, হামের উপসর্গে গত ২৪ ঘণ্টায় ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আরও এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে হাসপাতালটিতে হামের উপসর্গে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৮ জনে।
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সিনিয়র স্টোর অফিসার ডা. ঝন্টু সরকার বলেন, মৃত ৬ বছর বয়সী শিশুটি গতকাল ৭ জুন দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হয়েছিল। ওই দিন দুপুর ২টার দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। সে শেরপুর জেলার শ্রীবরদী উপজেলার বাসিন্দা।
গত ১৭ মার্চ থেকে গত শনিবার সকাল পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ১ হাজার ৯৬০ শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ১ হাজার ৮০০ শিশু। গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হয়েছে ২৯ শিশু। এ সময়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ১৭ শিশু। বর্তমানে হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে ভর্তি রয়েছে ১১২ শিশু।
হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, ৬৪ শয্যার ওয়ার্ডে ১১০ জন শিশু ও বেশ কয়েকজন বয়স্ক রোগী হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি রয়েছেন। গাদাগাদি করে চিকিৎসা নিচ্ছেন তারা। ওষুধের সংকটের পাশাপাশি নানা দুর্ভোগের কথাও জানান তারা।
হামের উপসর্গে আক্রান্ত চার বছরের নির্বাককে নিয়ে ভর্তি রয়েছেন রীতা ভৌমিক। সদর উপজেলার চরভবানীপুর গ্রামের বাসিন্দা রীতা বলেন, ‘হামের টিকা দেওয়ার বিষয়টি আমরা বুঝতে পারিনি। তাই ছেলেকে টিকা দেওয়া হয়নি। হামে আক্রান্ত হওয়ায় গত চারদিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছি। টিকা দিতে পারলে হয়তো সে আক্রান্ত হতো না।’
হামে আক্রান্ত সদর উপজেলার দাপুনিয়া গ্রামের দেড় বছরের শিশু আব্দুল্লাহ ঈদের সময় সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলেও ১ জুন পুনরায় হামে আক্রান্ত হয়। পরে তাকে আইসোলেশন ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়। তার বড় চাচা সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘টিকা দেওয়ার পরও সে বারবার আক্রান্ত হচ্ছে। তবে এখন কিছুটা সুস্থ রয়েছে। সেবা নিতে এসে ভোগান্তি কমছে না। এখান থেকে কিছু ওষুধ দেওয়া হলেও বাকি ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে।’
৫ মাস বয়সী শিশুকে নিয়ে গত চারদিন ধরে হাসপাতালের হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে ভর্তি রয়েছেন শেরপুরের সাজিদা আক্তার। তিনি বলেন, ‘৬ মাস পূর্ণ না হওয়ায় শিশুকে টিকা দিতে গিয়ে ফিরে আসতে হয়েছে। এখন সে হামে আক্রান্ত হওয়ায় আমাদের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।’
শিশু বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. গোলাম মাওলা বলেন, ‘টিকা না নেওয়া শিশুরাই বেশি আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। অভিভাবকদের উদাসীনতার কারণেই এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। গুরুত্ব সহকারে শিশুদের টিকা দেওয়া হলে এমন চিত্র দেখা যেত না।’
তিনি আরও বলেন, ‘টিকা নেওয়ার পরও যারা আক্রান্ত হচ্ছে, তারা শারীরিকভাবে খুবই দুর্বল। এসব শিশু মায়ের দুধ ঠিকমতো খায়নি। তাই শিশুদের প্রতি আরও যত্নশীল হতে হবে।’
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) ময়মনসিংহ মহানগর শাখার সম্পাদক আলী ইউসুফ বলেন, ‘শুধু শতাংশের হিসাবে টিকা বেশি দেওয়া হয়েছে বলে এগিয়ে থাকলেই হবে না। প্রকৃতপক্ষে টিকাদান কর্মসূচির প্রচারণা খুবই কম হয়েছে। গ্রামাঞ্চলে জোরালো প্রচারণা চালানো দরকার ছিল। তা না হওয়ায় অনেকে টিকা দিতে পারেনি। এ ক্ষেত্রে সিটি করপোরেশন ও সিভিল সার্জন অফিসের যেমন দায় রয়েছে, তেমনি অভিভাবকরাও দায়ী।’
জেলা ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন ডা. ফয়সাল আহমেদ বলেন, ‘হামের টিকাদানে আমরা শতভাগ সফল। সাধারণ মানুষের ব্যাপক সাড়া ছিল। এখনও মানুষ তাদের সন্তানকে টিকা দিচ্ছে। তবে যারা কিছুটা অসচেতন, তাদের ক্ষেত্রেই সমস্যা হয়েছে। এ দায় আমাদের ওপর দেওয়া ঠিক হবে না।’
সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. এইচ. কে. দেবনাথ বলেন, ‘নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই হামের টিকার লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে। তবে মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের মধ্যে টিকা নেওয়ার ক্ষেত্রে কিছুটা অনীহা ছিল। সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী এখনও টিকাদান কার্যক্রম চলমান রয়েছে। আমাদের প্রচারণায় কোনো ঘাটতি ছিল না।’

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন