× UCB Sticker Card
সোমবার, ০৮ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

রূপালী ডেস্ক

প্রকাশিত: জুন ৮, ২০২৬, ০৬:১৪ পিএম

দত্তক নেওয়ার ১৫ বছর পর মেয়েকে অস্বীকার!

রূপালী ডেস্ক

প্রকাশিত: জুন ৮, ২০২৬, ০৬:১৪ পিএম

ক্লাউডিয়া চৌধুরী। ছবি : সংগৃহীত

ক্লাউডিয়া চৌধুরী। ছবি : সংগৃহীত

শৈশব থেকেই যাদের মা-বাবা জেনে এক ছাদের নিচে বড় হয়েছেন, হঠাৎ একদিন জানতে পারেন তারা তার জৈবিক বাবা-মা নন। এরপর তার অজান্তেই বদলে ফেলা হয় জন্মনিবন্ধন, শিক্ষাগত সনদ ও সরকারি কাগজপত্রে থাকা দত্তক বাবা-মায়ের নাম। পরে একসময় তাকে বাসা থেকেও বের করে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ। নিজের শেকড় ও আত্মপরিচয়ের সন্ধানে বর্তমানে এক অনিশ্চিত জীবন পার করছেন ক্লাউডিয়া চৌধুরী। তার একটাই প্রশ্ন- ‘আমি আসলে কে?’

জন্মের পর থেকেই ডা. শিপ্রা চৌধুরীকে মা এবং ডা. ওবায়দুর রহমান চৌধুরীকে বাবা হিসেবে জেনে বড় হয়েছেন ক্লাউডিয়া। কিন্তু ২০২৩ সালের ৭ জুন হঠাৎই তার জীবনে নেমে আসে বড় ধাক্কা। তাকে জানানো হয়, তিনি শিপ্রা চৌধুরীর গর্ভজাত সন্তান নন। এরপর এক কাপড়ে তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

শুধু তাই নয়, কৌশলে ক্লাউডিয়ার একাডেমিক সনদসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্রে বাবা-মা হিসেবে থাকা ডা. শিপ্রা চৌধুরী ও ডা. ওবায়দুর রহমান চৌধুরীর নামও পরিবর্তন করা হয়। এমনকি মেয়ের নামে হেবা দলিলে দেওয়া পাঁচ কাঠা জমি ফেরত নিতেও মামলা করা হয়েছে।

রাজশাহীর আলোচিত এ ঘটনার নেপথ্যে পারিবারিক দ্বন্দ্ব ও উত্তরাধিকারসূত্রে সম্পত্তির বিষয় জড়িত থাকতে পারে বলে জানা গেছে।

পরিচয় সংকটে ক্লাউডিয়া

ছোটবেলা থেকেই ডা. শিপ্রা চৌধুরী ও প্রয়াত ডা. ওবায়দুর রহমান চৌধুরীকেই নিজের মা-বাবা হিসেবে জেনে বড় হয়েছেন ক্লাউডিয়া। তাদের পরিবারেই তার বেড়ে ওঠা, সেখানেই লেখাপড়া, সেখানেই জীবনের স্বপ্ন বোনা।

কিন্তু ২০২৩ সালে আচমকাই তার জীবনের ভিত্তিটাই যেন ভেঙে পড়ে। ক্লাউডিয়ার ভাষ্যমতে, একদিন তাকে জানানো হয়, তিনি এ পরিবারের জৈবিক সন্তান নন; দত্তক নেওয়া সন্তান। একই সঙ্গে তার অজান্তেই বদলে ফেলা হয় জন্মনিবন্ধন, জেএসসি, এসএসসিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নথিতে থাকা বাবা-মায়ের নাম।

সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, যাদের নাম নতুন করে তার পরিচয়ে যুক্ত করা হয়েছে, তাদের তিনি কখনো চিনতেনই না। এমনকি তাদের ছবি, জাতীয় পরিচয়পত্র কিংবা যোগাযোগের কোনো তথ্যও তাকে দেওয়া হয়নি।

ক্লাউডিয়া বলেন, আমি যখন জানতে চাইলাম আমার আসল পরিচয় কী, তখন আমাকে কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি। বরং বাসা থেকেই বের করে দেওয়া হয়। এখন আমি জানি না কাকে আমার বাবা-মা হিসেবে পরিচয় দেব।

তার অভিযোগ, বিভিন্ন সময় চাপ প্রয়োগ করে তাকে কাগজপত্র ও এফিডেভিটে স্বাক্ষর করানো হয়েছে। এমনকি তার নামে থাকা জমি নিয়েও পরে বিরোধ সৃষ্টি হয়।

পরিচয় পরিবর্তনের পর কলেজে ভর্তি ও জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরি করতে গিয়ে একের পর এক জটিলতায় পড়তে হয় ক্লাউডিয়াকে। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র না পাওয়ায় তার শিক্ষাজীবনের একটি বছরও নষ্ট হয়েছে বলে তিনি জানান।

বর্তমানে নিজেকে অসহায়, নিপীড়িত ও পরিচয় সংকটে ভুগছেন উল্লেখ করে ক্লাউডিয়া বলেন, আমি শুধু জানতে চাই কেন আমার পরিচয় বদলে দেওয়া হলো? কেন আমাকে এতদিনের পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করা হলো?

যেভাবে বদলানো হয় পরিচয়

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০২৩ সালের ৮ জানুয়ারি ডা. শিপ্রা চৌধুরী ক্লাউডিয়ার বাবা-মায়ের নাম সংশোধন বা পরিবর্তনের জন্য রাজশাহী সিটি করপোরেশনের ৮ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর কার্যালয়ে আবেদন করেন। ওইদিনই তৎকালীন ওয়ার্ড কাউন্সিলর এস. এম. মাহবুবুল হক পাভেল সেটির অনুমোদন দিয়ে প্রত্যয়ন দেন।

এর তিন দিন আগে, ৪ জানুয়ারি, শিপ্রা চৌধুরী ক্লাউডিয়ার বাবা মো. বাবুল এবং মা মোসা. টগরী বেগমের নাম উল্লেখ করে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার মোবারকপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের স্বাক্ষরযুক্ত একটি নাগরিক ও চারিত্রিক সনদপত্র জমা দেন।

এরপর দ্রুত সময়ের মধ্যে জন্মনিবন্ধন থেকে ডা. শিপ্রা চৌধুরী ও তার স্বামীর নাম বাদ দেওয়া হয়। পরে ধাপে ধাপে ক্লাউডিয়ার সব একাডেমিক কাগজপত্রেও বাবা-মায়ের নাম পরিবর্তন করা হয়।

তবে পরিবর্তিত জন্মসনদে ক্লাউডিয়ার মায়ের নাম হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে মোসা. টগরী বেগমের নাম। কিন্তু অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, এই টগরী বেগমও ক্লাউডিয়ার জৈবিক মা নন।

গত ২১ মে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার মোবারকপুর ইউনিয়নের গঙ্গারামপুর গ্রামে গিয়ে টগরী বেগমের সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, “ক্লাউডিয়া আমার গর্ভের সন্তান নয়। আমার নাম ব্যবহার করে ডা. শিপ্রা চৌধুরী প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছেন।”

জৈবিক পরিবারের দাবি

ক্লাউডিয়ার ফুফা মো. আরশাদ আলী জানান, ছোটবেলায় শিশুটিকে এমন শর্তে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল যে, তার জৈবিক পরিবার আর কখনো তার পরিচয় প্রকাশ করতে পারবে না কিংবা যোগাযোগও রাখতে পারবে না।

তিনি বলেন, গরিব পরিবার হওয়ায় মেয়েটিকে ভালোভাবে মানুষ করার আশ্বাস দিয়েই নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। এরপর আর কোনো যোগাযোগ হয়নি।

ক্লাউডিয়ার জৈবিক বাবা হিসেবে পরিচিত মো. বাবুল বলেন, ২০০৮ সালে মেয়েকে নিয়ে যাওয়ার সময় তাদের দিয়ে একটি কাগজে স্বাক্ষর করানো হয়েছিল, যেখানে উল্লেখ ছিল তারা ভবিষ্যতে মেয়ের ওপর কোনো দাবি করতে পারবেন না।

তিনি বলেন, আমরা গরিব মানুষ, লেখাপড়া জানি না। পরে শুনলাম মেয়ের সব কাগজপত্রে আমাদের নাম ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু মেয়ে তো আমাকে চেনেই না, বাবা হিসেবেও মানতে পারবে না।

তিনি আরও বলেন, আমার মেয়ের বয়স যখন ১১ মাস, তখন তাকে আমার কাছ থেকে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর অনেক বছর ধরে তার সঙ্গে আমার কোনো যোগাযোগ ছিল না। আমি তাকে দেখিনি, সে-ও আমাকে কখনো দেখেনি। এখন হঠাৎ করে বলা হচ্ছে, ‘তুমি এসে তোমার মেয়েকে নিয়ে যাও।’

মেয়ের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও সাড়া পাননি বলে জানান বাবুল। তিনি বলেন, আমার বর্তমান সংসারে ছেলেমেয়েরা বড় হয়ে গেছে। এই পরিস্থিতিতে তারা আমার মেয়েকে কীভাবে গ্রহণ করবে, সেটি নিয়ে আমি গভীর উদ্বেগে আছি। একই সঙ্গে আশঙ্কা করছি, আমার মেয়েও হয়তো কোনোদিন আমাকে তার বাবা হিসেবে মেনে নিতে পারবে না।

সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য

এ বিষয়ে জানতে চাইলে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার মোবারকপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাহামুদুল হক হায়দারী বলেন, ‘অনেক বছর আগেই তৎকালীন চেয়ারম্যানের মাধ্যমে শিশুটিকে দত্তক নেওয়া হয়েছিল। এরপর থেকে শিশুটি তাদের কাছেই লালিত-পালিত হয়েছে। পরে বিষয়টি নিশ্চিত করার জন্য তারা আমার কাছে একটি প্রত্যয়নপত্র চেয়েছিলেন। যাচাই-বাছাই করে আমরা সেটি দিয়েছিলাম। এরপর সেই প্রত্যয়ন ব্যবহার করে তারা কী করেছেন, সে বিষয়ে আমি অবগত নই।’

তিনি আরও বলেন, শুনেছি জন্মনিবন্ধনের নাম পরিবর্তন করা হয়েছে। কেন এই পরিবর্তন করা হয়েছে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাছ থেকেই সঠিক তথ্য জানা যাবে।

রাজশাহী সিটি করপোরেশনের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সচিব মো. আবুল কালাম আজাদ জানান, ২০০৮ সালে ক্লাউডিয়া চৌধুরী পায়েলের জন্মনিবন্ধনের জন্য ডা. ওবায়দুর রহমান চৌধুরী ও ডা. শিপ্রা চৌধুরী নিজেদের বাবা-মা পরিচয়ে আবেদন করেছিলেন। তাদের স্বাক্ষরের ভিত্তিতেই জন্মনিবন্ধন করা হয়।

তবে ২০২৩ সালে ডা. শিপ্রা চৌধুরী আবার এসে জানান, ক্লাউডিয়া তাদের জৈবিক সন্তান নন; তিনি দত্তক সন্তান ছিলেন। এরপর জন্মনিবন্ধনে বাবা-মায়ের নাম পরিবর্তনের আবেদন করা হয়।

তিনি বলেন, আমি আপত্তি জানিয়েছিলাম। কারণ একজন মানুষের বাবা-মা তো একজনই হয়। কিন্তু পরে তৎকালীন ওয়ার্ড কাউন্সিলরের অনুমোদনের পর নতুন নাম সংযুক্ত করে জন্মনিবন্ধন ইস্যু করা হয়।

রাজশাহী মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট আলী আশরাফ মাসুম বলেন, জন্মনিবন্ধন ও জাতীয় পরিচয়পত্র পরিবর্তনের নির্দিষ্ট আইনগত প্রক্রিয়া রয়েছে। সেগুলো সঠিকভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা তদন্তের বিষয়। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আদালতের মাধ্যমেই হবে। তবে মানবিকভাবে বিষয়টির সমাধান হওয়া জরুরি।

মুখ খুললেন না শিপ্রা চৌধুরী

ঘটনার বিষয়ে জানতে গত ২০ মে নগরীর পদ্মা ক্লিনিকে ডা. শিপ্রা চৌধুরীর সঙ্গে কথা বলতে যান এই প্রতিবেদক। তবে তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি এবং প্রতিবেদককে ‘স্টপ’ বলে কথা বলা থেকে বিরত থাকতে বলেন।

পরে অস্ট্রেলিয়া থেকে ডা. শিপ্রা চৌধুরীর পুত্রবধূ শাম্মি আক্তার চৌধুরী মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করে জানতে চান, কেন ডা. শিপ্রা চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল।

ক্লাউডিয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার শাশুড়ির একটি মাত্র ছেলে দেশের বাইরে থাকেন। তার বয়স এখন ৬০ বছরের বেশি। স্বাভাবিকভাবেই তিনি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। এ কারণেই তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে রাজি হননি।

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!