তীব্র জনবল সংকট ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার মধ্যেও সরকারি স্বাস্থ্যসেবায় ইতিবাচক পরিবর্তনের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর পুনরায় চালু হয়েছে অপারেশন থিয়েটার (ওটি)। ফলে হার্নিয়া, অ্যাপেন্ডিসাইটিস, টিউমারসহ বিভিন্ন জটিল অস্ত্রোপচার এখন উপজেলা হাসপাতালেই সফলভাবে সম্পন্ন হচ্ছে। এতে রোগীদের জেলা বা বিভাগীয় হাসপাতালে ছুটতে হচ্ছে না, কমেছে ভোগান্তি ও চিকিৎসা ব্যয়।
জেলার বৃহত্তম উপজেলা মোরেলগঞ্জের প্রায় ৫ লাখ মানুষের চিকিৎসার অন্যতম ভরসা ৫০ শয্যাবিশিষ্ট এ হাসপাতালটি। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ৫১ জন চিকিৎসকের অনুমোদিত পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত ১৫ জন। তাদের মধ্যে ডেপুটেশন ও ছুটিসহ বিভিন্ন কারণে নিয়মিত সেবা দিচ্ছেন মাত্র ছয়জন চিকিৎসক। এ ছাড়া প্রয়োজনের তুলনায় নার্স, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ও অন্যান্য জনবলও কম রয়েছে। তারপরও চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের আন্তরিক প্রচেষ্টায় চিকিৎসাসেবা স্বাভাবিক রাখা হয়েছে।
হাসপাতালে বর্তমানে প্রতিদিন বহির্বিভাগে ২০০ থেকে ৩০০ জন এবং অন্তর্বিভাগে ৪০ থেকে ৫০ জন রোগী চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করছেন। পাশাপাশি প্যাথোলজি বিভাগ, আল্ট্রাসনোগ্রাফি, ইসিজিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা-নিরীক্ষার সেবাও নিয়মিত চালু রয়েছে। সরকারিভাবে বিনা মূল্যে বিভিন্ন ধরনের ওষুধও সরবরাহ করা হচ্ছে।
সেবা নিতে আসা মীনা বিশ্বাস বলেন, হাসপাতালে এসে ভালো চিকিৎসাসেবা পেয়েছি। চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা আন্তরিকতার সঙ্গে রোগীদের সেবা দিচ্ছেন। আগে অনেক ছোটখাটো অপারেশনের জন্য বাইরে যেতে হতো, এখন এখানেই চিকিৎসা পাওয়া যাচ্ছে। তবে চিকিৎসক ও জনবল আরও বাড়ানো হলে রোগীদের অপেক্ষার সময় কমবে এবং সেবার মান আরও উন্নত হবে।
হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা একাধিক রোগীরা জানান, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের আন্তরিকতায় তারা সন্তুষ্ট। তবে জনবল সংকটের কারণে কিছুটা সময় অপেক্ষা করতে হলেও কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসাসেবা পাচ্ছেন। প্রয়োজনীয় জনবল বাড়ানো হলে সেবার মান আরও উন্নত হবে বলে তারা মনে করেন।
আনসার সদস্য মো. বাদশা বলেন, হাসপাতালে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক রোগী ও স্বজনের সমাগম হয়। আমরা নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি রোগীদের প্রয়োজনীয় তথ্য ও দিকনির্দেশনা দিয়ে সহযোগিতা করি। চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীদের সঙ্গে সমন্বয় করে শৃঙ্খলাপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখার চেষ্টা করি, যাতে রোগীরা নির্বিঘ্নে চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করতে পারেন।
সিনিয়র স্টাফ নার্স নুর নাহার বলেন, জনবল সংকট থাকা সত্ত্বেও আমরা রোগীদের সর্বোচ্চ আন্তরিকতার সঙ্গে সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছি। প্রতিদিন বহির্বিভাগ, অন্তর্বিভাগ ও জরুরি বিভাগে প্রচুর রোগীর চাপ থাকে। প্রতিদিন প্রায় ৭০ থেকে ৮০ জন রোগী ভর্তি হয়। চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীরা সমন্বিতভাবে দায়িত্ব পালন করায় সেবার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা সম্ভব হচ্ছে। প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন হলে রোগীদের আরও দ্রুত এবং মানসম্মত সেবা দেওয়া সম্ভব হবে।
হাসপাতালের কর্মরতরা আরও জানান, সীমিত জনবল ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার মধ্যেও রোগীদের সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। দ্রুত শূন্য পদে চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ এবং দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা নতুন ৩১ শয্যাবিশিষ্ট ভবনের নির্মাণকাজ পুনরায় শুরু হলে এ অঞ্চলের প্রায় ৫ লাখ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা আরও বিস্তৃত ও কার্যকর হবে।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. কামাল হোসেন মুফতি বলেন, মোরেলগঞ্জের মতো বৃহৎ জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে চিকিৎসকসহ শূন্য পদগুলো দ্রুত পূরণ এবং চলমান উন্নয়নকাজ শেষ করা জরুরি। বর্তমান জনবল দিয়ে সর্বোচ্চ আন্তরিকতা নিয়ে সেবা দেওয়া হচ্ছে। প্রয়োজনীয় জনবল ও অবকাঠামোগত সুবিধা নিশ্চিত হলে হাসপাতালের সেবার পরিধি ও মান আরও অনেকগুণ বৃদ্ধি পাবে এবং উপজেলার প্রায় ৫ লাখ মানুষ আরও উন্নত চিকিৎসাসেবা পাবেন।
জনবল সংকট থাকলেও চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের আন্তরিকতা, বন্ধ থাকা গুরুত্বপূর্ণ সেবা পুনরায় চালু এবং নিয়মিত অস্ত্রোপচার কার্যক্রমের মাধ্যমে মোরেলগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স উপজেলা পর্যায়ের সরকারি স্বাস্থ্যসেবায় একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের নজির তৈরি করছে। তবে এই অগ্রযাত্রা ধরে রাখতে দ্রুত জনবল নিয়োগ ও অসমাপ্ত উন্নয়নকাজ সম্পন্ন করা প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন