মসজিদের কোণে একটি ছোট একচালার ছাউনি ঘর। সেখানেই দিনের পর দিন আগুন জ্বেলে, হাতুড়ির আঘাতে লোহাকে জীবন দিচ্ছেন স্বপন চন্দ্র ভূমিক। বয়সের ভার, কমে যাওয়া কাজ—কিছুই তাকে থামাতে পারেনি। ৪৬ বছর ধরে একই জায়গায় বসে আছেন তিনি। তার চোখের কোণে ক্লান্তি নেই, আছে শুধুই জীবনের সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকার দৃঢ়তা। যেন ‘লোহা’ই জীবন।
৬৫ বছর বয়সি স্বপনের বাড়ি মুন্সিগঞ্জের গজারিয়া উপজেলার পুরান বাউশিয়ায়। তিনি বাউশিয়া ইউনিয়নের ভবেরচর স্ট্যান্ডের সমিতি মার্কেটের পূর্বপাশে মসজিদের দোকনঘরে কাজ করছেন। তিনি পেশায় কামার। ১৯ বছর বয়সেই তিনি এ কাজেই নিয়োজিত হন।
তার এই পেশা একসময় ছিল অপরিহার্য ও সম্মানের। সেই সময় প্রতিদিনের আয় হতো পনেরোশত থেকে দুই হাজার টাকা। ঈদ এলেই বাড়তি কাজের মাধ্যমে দু’হাজার টাকার মতো রোজগারও হতো। কিন্তু সময়ের বদলে যাওয়া স্রোতে আজ তার দোকানের চুল্লিতে আগুন যেমন কম জ্বলে, তেমনি কমে গেছে তার কাজও।
আগে প্রতিদিন কাজ হতো। এখন সারা দিন বসে থাকতে হয় অনেক সময়। হতাশ গলায় বললেও তার মুখে আশ্চর্য এক তৃপ্তির হাসি। কারণ সেই ছোট্ট কামারের দোকান থেকেই তিনি চার মেয়েকে এসএসসি পাশ করিয়েছেন, তিন মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। ছেলে না থাকা নিয়ে কোনো অভাববোধও নেই তার। তিনি গর্ব করে বলেন, ‘মেয়েরাই আমার ছেলের অভাব পূরণ করেছে। ওরাই আমার শক্তি।’ ছোট মেয়ে এখনো পড়াশোনা করছে, বদনূরনেছায়।
কিন্তু স্বপন চন্দ্র ভূমিকের জীবনের সবচেয়ে বড় বেদনাটা লুকিয়ে আছে তার দোকানের জায়গাকে কেন্দ্র করে। যে জায়গায় তিনি ৪৬ বছর ধরে কাজ করে আসছেন সেটি সরকারি জমি। অথচ প্রথম থেকেই তাকে ভাড়া দিতে হয়েছে স্থানীয় কয়েকজন কথিত প্রভাবশালী ব্যক্তিকে। একসময় মাসিক ভাড়া ছিল মাত্র ২০ টাকা। এখন সেই ভাড়া দাঁড়িয়েছে ১৫০০ টাকা, সঙ্গে ৫০০ টাকা বিদ্যুৎ বিল, মোট দুই হাজার টাকা।
১৯৭৯ সালের শুরুতে এ স্থানে লোহার কাজ শুরু করেছিলেন স্বপন চন্দ্র ভূমিক, যেখানে একই স্থানে ৪৬ বছরের দোকান থাকলে স্বপনেরই স্থায়ী অধিকার থাকার কথা, সেখানে উল্টো নিয়মিত ভাড়া-মাশুল গুনতে হচ্ছে তাকে। কাজ নেই, আয়ের উৎস কম, তারপরও মাস শেষে ভাড়ার টাকা মেলাতে হিমশিম খেতে হয়।
তবুও তিনি আক্ষেপ করেন না। তবুও তিনি হার মানেন না। তার চোখের ভাষা বলছে, ‘পরিশ্রমই আমার একমাত্র ভরসা। ভগবানের কৃপায় এ কাজ করেই আমি বেঁছে আছি, পরিবার চালাচ্ছি।’
স্বপন চন্দ্র ভূমিকের গল্প শুধু একজন কামারের গল্প নয়। এ গল্প সংগ্রামের, সৎ পরিশ্রমের, নিঃস্বার্থ বাবার অবিরাম ত্যাগের। আধুনিক যন্ত্র আর বিদেশি লেদ-ওয়ার্কশপের ভিড়ে যেখানে তার পেশা প্রায় হারিয়ে গেছে, সেখানে তিনি এখনো লোহাকে হাতুড়ির আঘাতে জীবনের রূপ দিতে চান।



সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন
আপনার ফেসবুক প্রোফাইল থেকে মতামত লিখুন