প্রায় ৬০০ বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কুমিরশূন্য হয়েছে বাগেরহাটের ঐতিহাসিক খান জাহান আলী (রহ.) মাজার সংলগ্ন ঠাকুরদীঘি। সম্প্রতি জননিরাপত্তার স্বার্থে দিঘিতে থাকা কুমিরটিকে উদ্ধার করে খুলনার বয়রা রেসকিউ সেন্টারে স্থানান্তরের পর স্বস্তি প্রকাশ করেছেন মাজারে আগত দর্শনার্থী ও স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের দাবি, মানুষের জীবন ও নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে মাজারের দিঘিতে আর কোনো কুমির ফিরিয়ে আনা উচিত নয়।
দর্শনার্থী ও এলাকাবাসীর অভিযোগ, মাজারকেন্দ্রিক কিছু ব্যবসায়ী দীর্ঘদিন ধরে কুমিরকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ধরনের ব্যবসা পরিচালনা করে আসছেন। সেই ব্যাবসায়িক স্বার্থে একটি মহল আবারও দিঘিতে কুমির ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. মাসুমসহ অনেকে বলেন, খান জাহান আলীর (রহ.) সময়ের ঐতিহ্যবাহী ‘ধলা পাহাড়’ ও ‘কালা পাহাড়ে’র মৃত্যুর পর আনা কুমিরটি প্রকৃত অর্থে সেই ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতার অংশ নয়। বরং সম্প্রতি এটি জননিরাপত্তার জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তাই ঐতিহ্য রক্ষার চেয়ে মানুষের জীবন ও নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি জানান তারা।
উল্লেখ্য, অতীতেও কুমিরের আক্রমণে প্রাণীহানির ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া বিভিন্ন সময়ে লোকদের হামলাও করেছে। সর্বশেষ বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী এক নারীর ৮ বছর বয়সি কন্যা ফাতেমা কুমিরের আক্রমণে নিহত হওয়ার ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক ক্ষোভ ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়। ওই ঘটনার পর প্রশাসন ও বন বিভাগের উদ্যোগে কুমিরটিকে উদ্ধার করে খুলনার বয়রা রেসকিউ সেন্টারে স্থানান্তর করা হয়।
মাজারে ঘুরতে আসা দর্শনার্থী নাজমুল হোসেনসহ অনেকে বলেন, কুমির সরিয়ে নেওয়ার পর তারা এখন অনেক বেশি নিরাপদ বোধ করছেন। দিঘির পাড়ে চলাফেরা কিংবা পানির ধারে যেতে আর আগের মতো ভয় কাজ করছে না। তাদের ভাষায়, বন্যপ্রাণীর স্থান বন-জঙ্গলে, মানুষের বসতির মধ্যে নয়।
মো. আরিন নামে এক শিশু দর্শনার্থী বলেন, আমি এখানে এসে গোসল করি। এখন আর ভয় লাগে না। কুমির থাকলে ভয় করতাম।
স্থানীয় বাসিন্দারা জননিরাপত্তার স্বার্থে কুমিরটিকে পুনরায় দিঘিতে না আনার দাবি জানিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর সিদ্ধান্ত কামনা করেন।
এ বিষয়ে খান জাহান আলী (রহ.) মাজারের প্রধান খাদেম ফকির তরিকুল ইসলাম বলেন, একটি শিশুর প্রাণহানির ঘটনা অত্যন্ত অনাকাঙ্ক্ষিত। দীর্ঘদিন ধরে কুমিরটি মাজারের দিঘিতে রয়েছে এবং এটি এ অঞ্চলের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের একটি অংশ। তাই আমরা আবারও মাজারে কুমির দেখতে চাই।
বাগেরহাট সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোসা. আতিয়া খাতুন বলেন, জননিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বন বিভাগের সহায়তায় কুমিরটিকে উদ্ধার করে তাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। বর্তমানে কুমিরটি খুলনার বয়রা রেসকিউ সেন্টারে রয়েছে। তবে এই মুহূর্তে মাজারে নতুন করে কুমির আনার কোনো পরিকল্পনা নেই।
দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ও জননিরাপত্তার প্রশ্নে মাজারের কুমির নিয়ে ভিন্নমত থাকলেও সাম্প্রতিক প্রাণহানির ঘটনার পর অধিকাংশ দর্শনার্থী ও স্থানীয় বাসিন্দা দিঘিকে কুমিরশূন্য রাখার পক্ষেই মত দিয়েছেন। তাদের ভাষায়, ঐতিহ্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও মানুষের জীবনের মূল্য তার চেয়ে অনেক বেশি।

