ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে শুরুতে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর তীব্র নির্বাচনি উত্তাপে মুখর থাকলেও শেষ পর্যন্ত বান্দরবান ৩০০ নং আসনের রাজনীতি একপক্ষীয় রূপ নিয়েছে। জামায়াতে ইসলামী প্রার্থিতা প্রত্যাহার করায় বিএনপির জন্য মাঠ অনেকটাই ফাঁকা হলেও জোটসঙ্গী এনসিপি ব্যালট বিপ্লবের ঘোষণা রেখেছে।
গণঅভ্যুত্থানের পরপরই বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী বান্দরবান আসনে প্রার্থী হিসেবে অ্যাডভোকেট আবুল কালামের নাম ঘোষণা করে। বিএনপির প্রার্থী চূড়ান্ত হওয়ার আগে পর্যন্ত দীর্ঘ সময় একক প্রার্থী হিসেবে মাঠে সক্রিয় ছিলেন তিনি। এ সময়ে জামায়াতে ইসলামী পুরুষ ও নারীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সমর্থন গড়ে তুলেছেন, বিশেষ করে নাইক্ষ্যংছড়ি, লামা ও আলীকদম উপজেলায়।
অন্যদিকে, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) নির্বাচনে অংশ নিতে পারে এমন সম্ভাবনা থাকলেও গত বছরের শেষ ডিসেম্বর জেএসএস কেন্দ্রীয় কমিটির সভায় ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করেন দলটির তথ্য, প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক সজীব চাকমা। ফলে জেএসএস নির্বাচনি মাঠে না থাকায় পাহাড়ে বসবাসরত বিভিন্ন সম্প্রদায়ের ভোটের বড় অংশ বিএনপি প্রার্থীর দিকে ঝুঁকে পড়েছে।
স্থানীয় ভোটারদের মতে, শুরুতে বিএনপি, জামায়াত ও জেএসএসের ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস থাকলেও জেএসএস নির্বাচনে অংশ না নেওয়ায় এটি বিএনপির জন্য আশীর্বাদ স্বরূপ। এরপরও জামায়াতে ইসলামী মাঠে থাকায় জমজমাট লড়াইয়ের আভাস ছিল।
কিন্তু শেষ মুহূর্তে জোটগত সিদ্ধান্তে জামায়াত তাদের প্রার্থী প্রত্যাহার করে আসনটি এনসিপির জন্য ছেড়ে দেন। জামায়াতে ইসলামী প্রার্থী অ্যাডভোকেট আবুল কালামের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করায় বিএনপির বিজয়ের সম্ভাবনা আরও জোরালো হয়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
যদিও জামায়াত গত দেড় বছরে বান্দরবানে উল্লেখযোগ্য জনসমর্থন তৈরি করেছিল, তবু নিজেদের প্রার্থী না থাকায় দলটির নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে আগ্রহ ও উদ্দীপনায় ভাটা পড়েছে। স্থানীয় জামায়াত নেতারা জানিয়েছেন, অনেক ভোটারই এনসিপির নতুন প্রার্থীকে গ্রহণ করতে পারছেন না।
এদিকে, এনসিপির প্রার্থী আবু সাঈদ শাহ সুজাউদ্দিন বান্দরবানের জন্য নতুন মুখ হওয়ায় এবং বাইরের পরিচয় থাকায় নির্বাচনি মাঠে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছেন। তরুণদের মধ্যে এনসিপির পরিচিতি থাকলেও বান্দরবানে সংগঠনটির শক্ত অবস্থান এখনো গড়ে ওঠেনি।
অপর দিকে, বিএনপির প্রার্থী সাচিং প্রু জেরি প্রবীণ রাজনীতিবিদ ও রাজ পরিবারের সদস্য হিসেবে এলাকায় পরিচিত মুখ। দলীয় মনোনয়ন ও প্রতিদ্বন্দ্বী সংকটের কারণে তার জয় প্রায় নিশ্চিত বলেই মনে করছেন বিএনপি নেতাকর্মীরা।
বিগত ১৯৯৬ সালে প্রতিদ্বন্দ্বীহীন নির্বাচনে বিএনপি জয় পেয়েছিল। এরপর দীর্ঘদিন আসনটি আওয়ামী লীগ নেতা বীর বাহাদুরের দখলে ছিল। তবে এবার আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ থাকায় তারা নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না।
স্থানীয় চা দোকানদার মোহাম্মদ রশিদ বলেন, ‘আমি জামায়াতকে ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। কিন্তু প্রার্থী না থাকায় জোটসঙ্গীকেও ভোট দেব না।’
চৈক্ষ্যং ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য সচিব দ্বীন মোহাম্মদ বলেন, ‘আমরা শুধু জয়ের জন্য নয়, বিপুল ভোটে সাচিং প্রু জেরিকে বিজয়ী করার লক্ষ্যে কাজ করছি, যা বান্দরবানের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।’
জামায়াত প্রার্থী অ্যাডভোকেট আবুল কালাম বলেন, ‘দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেছি। সমর্থকদের কষ্ট আছে, আমরা তাদের সঙ্গে কথা বলব এবং এনসিপির পক্ষে মাঠে থাকব।’
এনসিপির প্রার্থী আবু সাঈদ শাহ সুজাউদ্দিন বলেন, ‘বান্দরবানের মানুষ পরিবর্তন চায়, বিশেষ করে তরুণরা। এই নির্বাচন বান্দরবানের ইতিহাসে নতুন অধ্যায় রচনা করবে।’
বিএনপির প্রার্থী সাচিং প্রু জেরি বলেন, ‘শুরু থেকেই ধানের শীষের পক্ষে সর্বত্র ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি। সবাইকে সঙ্গে নিয়ে একটি সমৃদ্ধ বান্দরবান গড়ে তুলব।’
উল্লেখ্য, এবারের নির্বাচনে বান্দরবান ৩০০ নং সংসদীয় আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী সাচিং প্রু জেরি, এনসিপির মনোনীত প্রার্থী আবু সাঈদ শাহ্ সুজাউদ্দিন ছাড়াও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ থেকে জেলা শাখার সভাপতি মাওলানা মো. আবুল কালাম আজাদ এবং জাতীয় পার্টি (কাদের) থেকে কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আবু জাফর মোহাম্মদ ওয়ালিউল্লাহ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।



সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন