বরিশাল নগরীতে আকাশ হাওলাদার ওরফে কালা মাসুদ নামের এক ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসীর উত্থান ঘটেছে। খুন, মাদকসহ একাধিক মামলার আসামি ত্রিশোর্ধ্ব এই যুবক রাত গভীর হলেই বাহিনী সঙ্গে নিয়ে কোতয়ালি থানাধীন পোর্টরোড টু লঞ্চঘাটসহ আশপাশের এলাকাগুলোতে অস্ত্রের মহড়া দিতে শুরু করে। পাশাপাশি সমান্তরালভাবে চালিয়ে যাচ্ছেন মাদক বাণিজ্য। মাঝেমধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এই সন্ত্রাসীকে আটক করলেও কিছুদিন পরেই জামিনে মুক্ত হয়ে ফের পূর্বের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন।
শুক্রবার গভীর রাতে আকাশ হাওলাদার ওরফে কালা মাসুদ তার বাহিনী নিয়ে শহরের পোর্টরোড এলাকায় অস্ত্রের মহড়া দিয়ে ত্রাস সৃষ্টি করেন। তাদের অস্ত্রের ঝনঝনানিতে গভীর রাতে পোর্টরোড ও এর আশপাশ এলাকার বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
পুলিশ ও বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, বরিশাল সদর উপজেলার চরমোনাই ইউনিয়নের গিলাতলী গ্রামের এনায়েত হাওলাদারের ছেলে আকাশ ওরফে কালা মাসুদ ডাকাতি, চাঁদাবাজি, মাদক, ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত। এসব ঘটনায় তার বিরুদ্ধে অন্তত ২৬টি মামলা বরিশালের আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। ২০২৪ সালের শেষের দিকে বরিশাল মেট্রোপলিটন গোয়েন্দা পুলিশের একটি চৌকস দল তাকে গ্রেপ্তার করে। পরবর্তীতে আদালত মাসুদকে কারাগারে পাঠালেও কিছুদিন না যেতেই জামিনে মুক্ত হয়ে ফের আগের মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ে।
গোয়েন্দা পুলিশ সূত্র জানায়, কালা মাসুদ বিভিন্ন সময়ে টাকার বিনিময়ে টার্গেট করা ব্যক্তিকে কুপিয়ে আহত ও হত্যার ঘটনা ঘটিয়েছে। বরিশাল নগরীর ছিনতাইকারীদের গডফাদার ও ভাড়াটে খুনি নামে পরিচিত তিনি। তার বিরুদ্ধে হত্যা ছাড়াও ডাকাতি, চাঁদাবাজি, মাদক ও ছিনতাইসহ বিভিন্ন মামলা রয়েছে। এছাড়াও কালা মাসুদের অধীনে রয়েছে একাধিক ছিনতাইকারী চক্র।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শহরের ধোপাবাড়ির মোড়, কলেজ অ্যাভিনিউ, বৈদ্যপাড়াসহ কয়েকটি স্থানে কালা মাসুদের সন্ত্রাসী গ্রুপের সদস্যরা সক্রিয় রয়েছে। তারা টাকার বিনিময়ে বিভিন্ন অপরাধ করে থাকে।
বরিশাল শহরের এই চিহ্নিত সন্ত্রাসী শুক্রবার রাতে লঞ্চঘাট এলাকায় প্রকাশ্যে অস্ত্রের মহড়া দিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করেন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, পোর্টরোডে মাদক বিক্রি ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে কালা মাসুদ শুক্রবার গভীর রাতে সংঘাতে লিপ্ত হয়। এ নিয়ে দুই গ্রুপের লোকজন অস্ত্রসহ রাতভর মহড়া দিতে থাকে এবং একপর্যায়ে কালা মাসুদের নেতৃত্বে মহশিন মার্কেটসংলগ্ন একটি আবাসিক হোটেলে হামলা চালিয়ে ভাঙচুরসহ প্রতিপক্ষের লোকজনকে মারধর করা হয়। এই সংঘর্ষের ঘটনায় আশপাশ এলাকায় ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
বিস্ময়কর বিষয় হলো, ঘটনাস্থলের পাশেই রয়েছে স্টিমারঘাট ফাঁড়ি এবং আনুমানিক পৌনে এক কিলোমিটার দূরত্বে কোতয়ালি থানা। পুলিশ প্রশাসনের এত কাছাকাছি অবস্থান থেকে সশস্ত্র সন্ত্রাস চালানোর বিষয়টি স্থানীয় বাসিন্দাদের হতবাক করেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কালা মাসুদ আওয়ামী লীগের পুরো শাসনামলে বরিশাল শহরে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল। বিভিন্ন ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাকে গ্রেপ্তার করে কারাগারেও পাঠিয়েছে। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী সরকার পতনের পর তার যেন নতুন করে উত্থান ঘটেছে। সময়বিশেষে এই চিহ্নিত অপরাধীকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও পুলিশকে নিয়েও ‘খিস্তিখেউর’ করতে শোনা যায়।
শুক্রবার রাতের ঘটনা জানতে ফোন করলে সন্ত্রাসী কালা মাসুদ দম্ভোক্তি করে বলেন, ‘পুলিশ করার টাইম নাই! আপনি ফোন করছেন—আপনার বিষয়টিও দেখতে হবে। আমি ‘দাও মাসুদ, সিটি কিং’- সুতরাং এই যুবক যে কোন মাত্রার সন্ত্রাসী, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। যদিও এই নব্য সন্ত্রাসী সম্পর্কে বরিশাল পুলিশ প্রশাসন অবগত এবং তাকে আইনের আওতায় আনার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
ঘটনাস্থলসংলগ্ন স্টিমারঘাট ফাঁড়ির ইনচার্জ গোলাম মো. নাসিম রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘শুক্রবার রাতে ঘটনাটি শোনার পর পুলিশ পাঠানো হয়েছিল। তবে এর আগেই সন্ত্রাসী মাসুদ সাঙ্গপাঙ্গদের নিয়ে পালিয়ে যায়। বরিশাল শহরে সন্ত্রাসের কোনো স্থান হবে না। তাকে যে কোনো মূল্যে আইনের আওতায় আনতে হবে। এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষেরও নির্দেশনা রয়েছে।’
শুক্রবার রাতে কালা মাসুদের সশস্ত্র সন্ত্রাসের ঘটনা শুনে বিস্মিত হয়েছেন বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম। তিনি রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘এ ধরনের সন্ত্রাস বা সন্ত্রাসীদের ছাড় দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। যেহেতু সে তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী এবং নতুন করে অপরাধ করেছে, তাকে অবশ্যই আইনের আওতায় আনা হবে। মাঠপর্যায়ের পুলিশকে সে অনুযায়ী নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’
সন্ত্রাসী মাসুদের কার্যকলাপে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যে চরম চাপে রয়েছে, শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তাদের বক্তব্যেই তা স্পষ্ট। ফলে ধারণা করা হচ্ছে, সন্ত্রাসী আকাশ ওরফে কালা মাসুদকে খুব শিগগিরই আইনের আওতায় আনতে যাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। শেষ পর্যন্ত পুলিশ প্রশাসন তাকে আটক করতে পারবে কি না, সেটিই এখন দেখার অপেক্ষা।



সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন