আওয়ামী লীগ নেতাদের ধারাবাহিক জামিনে মুক্তি দেওয়ার প্রতিবাদে বিচারকের উপস্থিতিতে এজলাস কক্ষে সৃষ্ট বিশৃঙ্খলাকে কেন্দ্র করে বুধবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) বরিশালে উত্তেজনাকর একটি দিন পার হয়েছে। আগের দিন ঘটে যাওয়া ঘটনার জেরে এদিন সকাল ১০টার দিকে বরিশাল জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও বিএনপি নেতা সাদিকুর রহমান লিংকনকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়। পরে তাকে সংশ্লিষ্ট আদালতে সোপর্দ করলে বিচারক কারাগারে প্রেরণের আদেশ দেন। এতে আদালত চত্বরে উত্তেজনা আরও বেড়ে যায়। বিশেষ করে বিএনপি-সমর্থিত আইনজীবীদের ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা যায়। তবে শেষ পর্যন্ত বারের সভাপতিকে কারাগারে পাঠানো হয়।
ভাইরাল ভিডিও নিয়ে বিতর্ক
গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় বরিশাল অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন আদালতের এজলাস কক্ষে হট্টগোলের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। বিচারকের উপস্থিতিতে এমন বিশৃঙ্খলার ভিডিও ঘিরে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত এক সপ্তাহে বরিশাল অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন আদালত থেকে আওয়ামী লীগের অন্তত অর্ধডজন শীর্ষ নেতাকে জামিন অযোগ্য মামলায় জামিন দেওয়া হয়। গত সোমবার একই আদালত থেকে একটি আলোচিত মামলায় জামিন পান বরিশাল জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য তালুকদার মো. ইউনুস।
ইউনুসের জামিনের পর ক্ষোভ প্রকাশ করেন বিএনপি-সমর্থিত আইনজীবীরা। তারা মঙ্গলবার আদালত বর্জন করেন এবং অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন আদালতের এজলাস কক্ষে প্রবেশ করে হট্টগোল করেন। আদালতের সিসিটিভি ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি আরও আলোচনায় আসে। বিভিন্ন ফেসবুক পেজ থেকেও ভিডিওটি ছড়িয়ে দেওয়া হয় এবং সেখানে নানা মন্তব্য দেখা যায়।
সকাল থেকে উত্তেজনা
মঙ্গলবারের ঘটনার পর বুধবার সকাল থেকেই আদালত চত্বরে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। পাশাপাশি র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়।
সকাল ১০টার দিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি দল জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি সাদিকুর রহমান লিংকনকে আইনজীবী কক্ষ থেকে আটক করে। পরে তাকে আদালতে হাজির করা হলে বিচারক কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, তাকে কারাগারে পাঠানোর খবরে বিএনপি-সমর্থিত আইনজীবীরা বিক্ষোভে ফেটে পড়েন। তারা আদালত বর্জনের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট বিচারকের অপসারণ দাবি করেন। জেলা ও দায়রা জজ আদালতের মূল ফটকে অবস্থান নিয়ে বিভিন্ন স্লোগান দেন।
পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে সেনাবাহিনীর সদস্যরাও আদালত চত্বরে অবস্থান নেন। সেনাবাহিনী, পুলিশ ও র্যাব যৌথভাবে বিশেষ নিরাপত্তা বলয় তৈরি করে। দীর্ঘ সময় উত্তেজনা বিরাজ করলেও বিকেল ৫টার দিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কৌশলী পদক্ষেপে আসামিবাহী প্রিজন ভ্যানে করে সাদিকুর রহমান লিংকনকে কারাগারে নেওয়া হয়।
মামলা ও পরবর্তী কার্যক্রম
আদালত ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সূত্র জানায়, এজলাসে বিশৃঙ্খলার ঘটনায় বুধবার দ্রুত বিচার আইনে একটি মামলা দায়ের করা হয়। জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি লিংকনসহ ১২ জনকে নামীয় আসামি এবং আরও চারজনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়েছে।
বরিশাল মেট্রোপলিটন কোতয়ালি মডেল থানার ওসি আল মামুন উল ইসলাম জানান, আদালতের নির্দেশে মামলা গ্রহণ করা হয়েছে। লিংকনকে গ্রেপ্তার করে আদালতে সোপর্দ করা হলে বিচারক তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। পরে তার জামিন আবেদন করা হলেও তা নামঞ্জুর করা হয়। আগামী ২ মার্চ মামলার শুনানির দিন ধার্য রয়েছে।
বিএনপিপন্থি আইনজীবীদের অভিযোগ
বিএনপি-সমর্থিত আইনজীবীদের দাবি, সংশ্লিষ্ট বিচারক আওয়ামী লীগের পক্ষপাতিত্ব করছেন। এর আগে ১৭ ফেব্রুয়ারি বরিশাল-৫ (সদর) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য জেবুন্নেছা আফরোজসহ আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের আরও কয়েকজন নেতা জামিনে মুক্তি পান।
জামিনপ্রাপ্ত অন্যদের মধ্যে রয়েছেন বরিশাল মহানগর ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও সাবেক উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান জসিম উদ্দিন এবং বরিশাল মহানগর যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক মাহমুদুল হক খান।
এ প্রসঙ্গে বিএনপি-সমর্থিত আইনজীবী এইচ এম আনিসুর রহমান বলেন, “বিচারক স্বৈরাচারের পক্ষ নিয়ে বরিশাল আদালতে একটি কালো অধ্যায় সৃষ্টি করেছেন, যা একটি খারাপ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।” তিনি জানান, এ ঘটনায় পরবর্তী কর্মসূচি পরে ঘোষণা করা হবে।
সভাপতিকে কারাগারে পাঠানোর প্রতিবাদে বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা বৃহস্পতিবারও আদালত বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন।

