ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

নৌকার নিলামে মৎস্য কর্মকর্তার গোপন লুট

চরফ্যাশন (ভোলা) প্রতিনিধি
প্রকাশিত: জানুয়ারি ২৬, ২০২৬, ১১:৫৩ এএম
নিলাম হওয়া নৌকা। ছবি : রূপালী বাংলাদেশ

মাত্র ১৯টি মাছ ধরা নৌযানের নিলামের তথ্য দেখিয়েছেন ভোলার চরফ্যাশন উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা জয়ন্ত কুমার অপু। কাগজে-কলমে ১৯টি নৌযানের তথ্য লিপিবদ্ধ থাকলেও সরেজমিন অনুসন্ধানে ৬২টি নৌযান নিলামে বিক্রির তথ্য পাওয়া গেছে।

তবে তিনি ৪৩টি নৌযান নিলামের তথ্য গোপন করে মোটা অঙ্কের অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। গত তিন মাসের অনুসন্ধানে ২২ দিনের ‘মা’ ইলিশ সংরক্ষণ অভিযানের সময়ে এই গোপন দুর্নীতির তথ্য সামনে এসেছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, মৎস্য কর্মকর্তা জয়ন্ত কুমার অপু মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীতে অভিযান পরিচালনার জন্য দুলারহাট থানার বাংলাবাজার এলাকার সবুজ মাঝির ট্রলার ব্যবহার করে ৩০টি নৌযান ও পাঁচ কপাট মৎস্যঘাটের আঃ রহমান মাঝির ট্রলার ব্যবহার করে ২১টি নৌযান আটক করে নিলামে বিক্রি করেছেন। এ ছাড়াও নিলাম ফরমে ১১টি নৌযানের তথ্য থাকলেও ৮টি ফরমে কর্মকর্তার স্বাক্ষর পাওয়া যায়নি।

তেঁতুলিয়া নদী সংলগ্ন বাংলাবাজার এলাকার সবুজ মাঝি জানান, ‘২২ দিনের নিষেধাজ্ঞার মধ্যে আমার হাতে ব্যাপক নৌকা ছিল। বাংলাবাজার মৎস্যঘাটে ৩০টির মতো নৌকা প্রকাশ্যে নিলাম হয়েছে। আকারভেদে নৌকা প্রতি ৫ থেকে ১৫ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে। তবে যার যার নৌকা, সে সে নিয়েছে।’

পাঁচ কপাট মৎস্যঘাটের রহমান মাঝি বলেন, ‘মেঘনা নদীতে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞার সময় উপজেলা মৎস্য অফিসার ১৬টি নৌকা পাঁচ কপাট মৎস্যঘাটে ও পাঁচটি নৌকা ফিসারিজ মৎস্যঘাটে নিলামে দিয়েছিলেন। তবে নিলামে যার নৌকা, সে সে নিয়েছে।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ফিসারিজ মৎস্যঘাটের এক জেলে জানান, ‘আমি এই ঘাটের একজন জেলে। ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞার মধ্যে আমাদের ঘাটে আটককৃত পাঁচটি নৌকা মৎস্য কর্মকর্তার কাছ থেকে নিলাম ছাড়া সরাসরি নিয়ে এসেছি।’

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইকবাল হোসেনের স্বাক্ষরিত উপজেলাভিত্তিক চূড়ান্ত প্রতিবেদনে চরফ্যাশন উপজেলায় ১৪টি ট্রলার ও পাঁচটি নৌকা উল্লেখ রয়েছে, যার নিলামমূল্য দেখানো হয়েছে ১ লাখ ৫১ হাজার ৩০০ টাকা।

তবে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ৬২টি নৌকা যদি গড়ে ১০ হাজার টাকায় বিক্রি হয়ে থাকে, তাহলে মোট মূল্য দাঁড়ায় ৫ লাখ ১০ হাজার টাকা। জেলা মৎস্য কর্মকর্তার প্রতিবেদনে থাকা ১ লাখ ৫১ হাজার ৩০০ টাকা বাদ দিলে অবশিষ্ট ৩ লাখ ৫৮ হাজার ৭০০ টাকা নিলামে গোপন রাখা হয়েছে।

স্থানীয় জেলেদের অভিযোগ, নদীতে অভিযান চালানো হলেও প্রকৃতপক্ষে তা ধোঁয়াশার মধ্যে ছিল। মা ইলিশ রক্ষায় নামমাত্র অভিযান চালানো হলেও এই সময়ে মৎস্য কর্মকর্তা অর্থ উপার্জন করেছেন। পাঁচ কপাট, সামরাজ, নতুন স্লুইসগেট, বাংলাবাজার, গাছিরখাল, চৌকিদারখাল ও ফিসারিজ মৎস্যঘাটের কয়েকজন জেলে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

চরফ্যাশন উপজেলা মৎস্য কার্যালয়ের তথ্যমতে, উপজেলায় ১৩৫টি মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র, ২১৯টি মৎস্যঘাট ও ৫০৯টি আড়ত রয়েছে। বড় মৎস্য ঘাটগুলোর মধ্যে সামরাজ, নতুন স্লুইসগেট, খেজুরগাছিয়া, মাইনউদ্দি ঘাট, ঢালচর, বকসীরঘাট, ঘোষেরহাট, চরকচ্ছপিয়া ও কুকরি মুকরি অন্যতম।

উপজেলায় প্রায় ৯০ হাজার জেলে রয়েছেন, যার মধ্যে ৪৪ হাজার ২৮১ জন নিবন্ধিত। অনিবন্ধিত জেলে প্রায় ৪৬ হাজার। এ অঞ্চলে ১২ হাজার ট্রলার ও নৌকা রয়েছে। এ ছাড়া গভীর সমুদ্রগামী ৭ হাজার ট্রলার রয়েছে।

উল্লেখ্য, ইলিশের প্রজনন রক্ষায় ২০২৫ সালের ৩ অক্টোবর থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত ২২ দিনের জন্য দেশের সব নদী ও সাগরে ইলিশ ধরা, বিক্রি, পরিবহন ও মজুত নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। এ সময় চরফ্যাশন উপজেলার মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীতে মা ইলিশ সংরক্ষণ অভিযান পরিচালনা করেছিলেন উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা জয়ন্ত কুমার অপু।

৬২টি নৌকার মধ্যে ৪৩টি নৌকার নিলাম গোপন রাখার বিষয়ে জানতে রোববার বেলা আড়াইটায় মৎস্য কর্মকর্তার মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইকবাল হোসেন বলেন, ‘চরফ্যাশন উপজেলা মৎস্য অফিস যে তথ্য দিয়েছে, আমরা সেই তথ্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠিয়েছি। তবে অনিয়মের বিষয়ে কেউ লিখিত অভিযোগ দিলে তদন্তসাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’