ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

বগুড়া-৫ আসনে নির্বাচনি উত্তাপ, নারী ভোটাররা কি গেম চেঞ্জার?

নাজমুল হুদা নয়ন, শেরপুর (বগুড়া)
প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ৯, ২০২৬, ০৫:১৬ পিএম
বগুড়া-৫ আসনের পাঁচজন প্রার্থী। ছবি : রূপালী বাংলাদেশ গ্রাফিক্স

আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে উত্তরাঞ্চলের রাজনীতি ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। বগুড়া জেলার সাতটি সংসদীয় আসনের মধ্যে বগুড়া-৫ (শেরপুর ও ধুনট উপজেলা) রাজনৈতিকভাবে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আসন হিসেবে বিবেচিত। দীর্ঘদিন ধরে এই আসনটি জাতীয়তাবাদী ও ইসলামপন্থী রাজনীতির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। দেড় দশক পর ভোটাররা তাদের ভোটাধিকার ফিরে পেয়ে উৎসবমুখর পরিবেশে নির্বাচনে অংশ নেবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করছেন স্থানীয়রা।

বিএনপির প্রার্থী গোলাম মোহাম্মদ সিরাজ (ধানের শীষ) তিনবারের সাবেক সংসদ সদস্য। দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, এলাকায় ব্যক্তিগত পরিচিতি এবং নিয়মিত সভা-সমাবেশ, মিছিল-মিটিংয়ের মাধ্যমে তিনি ভোটারদের কাছে পৌঁছাচ্ছেন। উন্নয়নবঞ্চিত এলাকায় অবকাঠামো উন্নয়ন, বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোটারদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা চালাচ্ছেন তিনি। বিএনপি এই আসনকে নিজেদের প্রাচীন দুর্গ হিসেবে ধরে রাখতে মরিয়া হয়ে মাঠে নেমেছে।

তবে তার সামনে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলেছেন জামায়াতে ইসলামীর প্রভাবশালী নেতা ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান দবিবুর রহমান (দাঁড়িপাল্লা)। তিনি শেরপুর ও ধুনট উপজেলার প্রতিটি বাজার, মাঠ, ঘাট এবং বাড়ি বাড়ি গিয়ে ব্যাপক প্রচার চালাচ্ছেন। ২০১৪ সালের উপজেলা নির্বাচনে তার বিশাল বিজয় এ অঞ্চলে জামায়াতের জনপ্রিয়তা ও জনআস্থার প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরছেন দলীয় নেতারা। জামায়াতে ইসলামী ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতিমুক্ত বগুড়া-৫ গড়ার অঙ্গীকার করে ভোট চাইছে।

এ ছাড়া নির্বাচনি মাঠে সক্রিয় রয়েছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মীর মোহাম্মদ মাহমুদুর রহমান (হাতপাখা), বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) শিপন কুমার রবিদাস (কাস্তে) এবং লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) খান কুদরত-ই-সাকালায়েন (ছাতা)। পাঁচ প্রার্থীর প্রতিদ্বন্দ্বিতায় মূল লড়াইটি বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।

নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, বগুড়া-৫ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৫ লাখ ৭২ হাজার ৩৪০ জন। এর মধ্যে নারী ভোটার ২ লাখ ৯১ হাজার ৪৭ জন এবং পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৮১ হাজার ২৮৭ জন। তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন ৬ জন। অর্থাৎ, পুরুষ ভোটারের তুলনায় নারী ভোটার প্রায় ১০ হাজার বেশি। এই বিপুল নারী ভোটারের অংশগ্রহণ ও ভোটের সিদ্ধান্তই এবারের জয়-পরাজয়ের মূল চাবিকাঠি হয়ে উঠতে পারে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নারী ভোটাররা এবার শুধু দলীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়; বরং উন্নয়ন, ন্যায়বিচার, দুর্নীতিমুক্ত সমাজ, নারী ও শিশু অধিকার এবং স্থানীয় সমস্যা সমাধানের প্রতিশ্রুতির বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করছেন।

ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্রের বিষয়টি এবার বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জেলা প্রশাসন ও পুলিশের যৌথ বিশ্লেষণে বগুড়ার সাতটি আসনের মোট ৯৮৩টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ৫০০টিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৯০টি অধিক ঝুঁকিপূর্ণ এবং ৩১০টি সাধারণ ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র।

বগুড়া-৫ আসনের শেরপুর উপজেলায় মোট ৯৯টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ৩০টি অধিক ঝুঁকিপূর্ণ এবং ১৬টি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। ধুনট উপজেলায় ৮৯টি কেন্দ্রের মধ্যে ১২টি অধিক ঝুঁকিপূর্ণ এবং ৬৩টি ঝুঁকিপূর্ণ। এসব কেন্দ্রে সম্ভাব্য সংঘর্ষ, যোগাযোগব্যবস্থার দুর্বলতা ও অতীতের অভিজ্ঞতার কারণে বিশেষ নজরদারি রাখা হয়েছে। প্রশাসন বাড়তি টহল, নিরাপত্তা জোরদার এবং কিছু কেন্দ্রে অতিরিক্ত সিসিটিভি স্থাপনের পরিকল্পনা করেছে।

ইতোমধ্যে ১৮৮টি ভোটকেন্দ্রের ১,০২৩টি বুথে ভোটগ্রহণের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী শান্তিপূর্ণ, সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন নিশ্চিত করার আশ্বাস দিয়েছে।

সব মিলিয়ে বগুড়া-৫ আসনে রাজনৈতিক উত্তেজনা এখন তুঙ্গে। ৫ লাখেরও বেশি ভোটার আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি নির্ধারণ করবেন তাদের ভবিষ্যৎ প্রতিনিধি। বিশেষ করে নারী ভোটারদের বিপুল সংখ্যা ও সম্ভাব্য উচ্চ উপস্থিতি এবারের নির্বাচনী সমীকরণ পাল্টে দিতে পারে। তবে ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে শান্তিপূর্ণ ভোটগ্রহণ নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।