বগুড়ার ধুনট উপজেলার চৌকিবাড়ি ইউনিয়নের বিষ্ণপুর গ্রামের এক কোণে, ভাঙাচোরা একটি চৌচালা ঘরের ভেতর নিঃশব্দে কেটে যাচ্ছে বৃদ্ধ ছবদার আকন্দের জীবন। চারপাশে নিস্তব্ধতা, আর সেই নীরবতার ভেতরেই যেন লুকিয়ে আছে একজন বৃদ্ধ মানুষের দীর্ঘশ্বাস, যন্ত্রণার আর্তনাদ, যা কারও কানে পৌঁছায় না।
সত্তরোর্ধ্ব ছবদার আকন্দ ছিলেন পরিশ্রমী কৃষক ও পরিবারের একমাত্র ভরসা। আজ বার্ধক্য ও অসুস্থতায় জর্জরিত হয়ে জরাজীর্ণ ঘরে চিকিৎসাহীন অবস্থায় বিছানায় শুয়ে কাটাচ্ছেন মানবেতর জীবন।
ঘরের ভেতরে ঢুকলেই চোখে পড়ে তার অসহায়ত্বের চিত্র। বিছানায় শুয়ে থাকা ছবদার আকন্দের শরীর যেন কেবল হাড়ের কাঠামো। শুকনো শরীরে পাঁজরের হাড়ের স্পষ্টতা যেন কোনো দুর্ভিক্ষের চিত্র তুলে ধরে।
তীব্র গরমে ঘাম ঝরলেও নেই কোনো স্বস্তির ব্যবস্থা, নেই চিকিৎসার সামান্য সুযোগটাও। কেবলই অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা আর দীর্ঘশ্বাসই যেন তার নিত্যসঙ্গী। পাশে বসে আছেন তার অসুস্থ স্ত্রী জোবেদা বেগম। চোখে-মুখে ক্লান্তি আর অসহায়ত্বের ছাপ স্পষ্ট। বয়স তারও ষাটের কোঠা পেরিয়েছে।
একসময় এই ছবদার আকন্দই ছিলেন স্বাবলম্বী কৃষক ও সংসার চালানোর একমাত্র অবলম্বন। নিজের জমিতে ফসল ফলিয়ে সংসার চালাতেন স্বচ্ছলভাবে। পরিবার-পরিজন নিয়ে ছিল সুখের জীবন।
কিন্তু সময়ের নির্মম পরিহাসে নানা জটিলতায় একে একে বিক্রি হয়ে যায় তার সব জমিজমা। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কমতে থাকে কর্মক্ষমতা, আর সেই সঙ্গে নেমে আসে অভাব-অনটনের অন্ধকার।
ছবদার আকন্দের স্ত্রী জোবেদা বেগম বলেন, এক বছর আগে পেটে সমস্যার কারণে অনেক কষ্ট করে একটি অপারেশন করিয়েছিলাম। কিন্তু ভালো হওয়ার আগেই আবার অ্যাজমা ধরা পড়ে। এখন চার মাস ধরে বিছানায় পড়ে আছে।
ওষুধ কেনার টাকা নেই, ঠিকমতো খাওয়ারও ব্যবস্থা নেই। অনেক সময় একবেলা খেয়ে আরেক বেলা না খেয়ে থাকতে হয়। আমি নিজেও অসুস্থ। অন্যের সাহায্য ছাড়া একা কিছু করতে পারি না। এ অবস্থায় আল্লাহর ওপর ছেড়ে দেওয়া ছাড়া আমার কোনো উপায় নেই।
স্থানীয়রা জানান, দাম্পত্য জীবনে ছবদার আকন্দ দুই ছেলে ও এক মেয়ের জনক। দুই ছেলেই দিনমজুর। বিয়ে করে আলাদা সংসারে থাকেন। নিজেদের স্ত্রী-সন্তান নিয়ে চলতেই যেখানে হিমশিম খেতে হয়, সেখানে বাবার চিকিৎসার ব্যয় বহন করা তাদের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবুও যতটুকু পেরেছেন, শুরুতে চিকিৎসার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু দীর্ঘদিন চিকিৎসার খরচ জোগাতে গিয়ে এখন তারাও প্রায় নিঃস্ব।
ছোট মেয়ে, যার বিয়ে হয়েছে কাছাকাছি এলাকায়, মাঝেমধ্যে খাবার নিয়ে আসেন বৃদ্ধ বাবা-মায়ের জন্য। মেয়েটির নিজের সংসারও ছোট। তারপরও চেষ্টা করে কিছু নিয়ে আসতে। কিন্তু সব সময় হয়ে ওঠে না। এখন অবস্থা এমন হয়েছে, যেখানে ঠিকমতো খেতেই পারেন না। সেখানে চিকিৎসা করানো তো অনেক দূরের কথা।
প্রতিবেশীরাও সহানুভূতি দেখিয়ে মাঝে মধ্যে খাবার বা সামান্য সহায়তা দিয়ে থাকেন। তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। দীর্ঘমেয়াদে একজন গুরুতর অসুস্থ মানুষের চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার জন্য যে পরিমাণ সহায়তা দরকার, তা তাদের পক্ষে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। অর্থের অভাবে চিকিৎসার কোনো ব্যবস্থা না হওয়ায় ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকেই এগিয়ে যাচ্ছেন এই অসহায় বৃদ্ধ ছবদার আকন্দ।
এমন করুণ পরিস্থিতিতে ছবদার আকন্দের পরিবার সমাজের হৃদয়বান ও বিত্তবান মানুষের কাছে সহায়তার আবেদন জানিয়েছে। তারা আশা করছেন, কেউ যদি মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে এগিয়ে আসেন, তবে হয়তো শেষ বয়সে কিছুটা স্বস্তি পেতে পারেন এই বৃদ্ধ। মানবতার এই কঠিন পরীক্ষায় সমাজের সহানুভূতিশীল মানুষরাই পারে একটি অসহায় জীবনের কষ্ট কিছুটা লাঘব করতে।


সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন