দেশের অন্যতম গ্যাস উৎপাদনকারী জেলা ব্রাহ্মণবাড়িয়া হলেও শহর ও আশপাশের এলাকায় দিনের পর দিন তীব্র গ্যাস সংকটে চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন বাসিন্দারা। বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (বিজিডিসিএল) আওতাধীন হাজারো আবাসিক গ্রাহক নিয়মিত গ্যাস না পাওয়ায় রান্নাসহ দৈনন্দিন জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
শহরের অধিকাংশ এলাকায় যেমন কান্দিপাড়া, কাজীপাড়া, সরকারপাড়া, দক্ষিণ ও উত্তর পৈরতলা, মধ্যপাড়া, বাগানবাড়ি, হালদারপাড়া, মুন্সেফপাড়া, ফুলবাড়িয়া, পশ্চিম পাইকপাড়া, পাইকপাড়া, কালাইশ্রীপাড়া, পাওয়ার হাউজ রোড, উত্তর ও দক্ষিণ মৌড়াইল, কলেজপাড়া, দাতিয়ারা, কাউতলী, ভাদুঘর ও শহরতলির বিরাসা—দৈনন্দিন গ্যাস সরবরাহ অনিয়মিত। মাঝেমধ্যে অল্প সময়ের জন্য গ্যাস এলেও তা স্থায়ী হয় না; কয়েক মিনিটের মধ্যেই আবার বন্ধ হয়ে যায়।
স্থানীয়দের ভাষায়, গ্যাস এখন ‘সোনার হরিণ’—চোখে দেখা যায়, কিন্তু ব্যবহার করা যায় না। শীত মৌসুমে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নেয়। কোনো কোনো এলাকায় মাসের পর মাস রান্নার চুলায় আগুন জ্বলে না। জেলা শহরের প্রাণকেন্দ্র কাউতলিতে এই সোনার হরিণ ধরার দাবিতে সাধারণ মানুষ এবার বিক্ষোভ মিছিলের ডাক দিয়েছে।
দীর্ঘদিনের গ্যাস সংকটে বাধ্য হয়ে অনেক পরিবার মাটির চুলা ও তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) সিলিন্ডারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। কিন্তু সেই বিকল্প ব্যবস্থাও এখন সাধারণ মানুষের জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে এলপিজির দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়ে গেছে। এক লাফে ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ১,২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ১,৫০০ থেকে ২,০০০ টাকা পর্যন্ত কেনা-বেচা হচ্ছে। কোথাও কোথাও পরিবহন ও সংকটের অজুহাতে মনগড়া দাম নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
এলপিজির লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধিতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো। একদিকে পাইপলাইনে গ্যাস নেই, অন্যদিকে এলপিজির দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাওয়ায় রান্নার খরচ কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। অনেক পরিবার দিনে এক বেলা রান্নায় সীমাবদ্ধ থাকতে বাধ্য হচ্ছেন, কেউ কেউ বাইরে থেকে খাবার কিনে আনছেন, যা সংসারের ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। গ্যাস সংকট ও এলপিজির অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাধারণ মানুষ চরম অনিশ্চয়তা, ক্ষোভ ও হতাশার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। দ্রুত কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী বাসিন্দারা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, গ্যাস সংকটের অন্যতম বড় কারণ অবৈধ গ্যাস সংযোগ। শহর ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় অনুমোদন ছাড়া অবৈধভাবে গ্যাস সংযোগ নেওয়া হয়েছে। এতে নির্ধারিত লাইনের চাপ কমে যাচ্ছে এবং বৈধ গ্রাহকরা প্রয়োজনীয় গ্যাস পাচ্ছেন না। অবৈধ সংযোগ উচ্ছেদে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদারকি দুর্বল। মাঝে মাঝে অভিযান চালানো হলেও তা নিয়মিত না হওয়ায় অবৈধ সংযোগ আবারও গড়ে উঠছে, ফলে সংকট আরও প্রকট হচ্ছে।
অন্যদিকে স্থানীয় সূত্র জানায়, শিল্পখাতে অগ্রাধিকার দেয়ায় আবাসিক গ্রাহকরা বঞ্চিত হচ্ছেন। কল-কারখানায় গ্যাস ব্যবহারের বিল বাসাবাড়ির চেয়ে বেশি হওয়ায় কর্তৃপক্ষ শিল্পখাতে গ্যাস সরবরাহে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। ফলে সাধারণ আবাসিক গ্রাহকরা দিনের পর দিন গ্যাস না পেয়ে দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন।
জেলা শহরের বাসিন্দা শামীম আহমেদ বলেন, ‘গ্যাস উৎপাদনের জেলা হওয়া সত্ত্বেও ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে দীর্ঘদিন ধরে অবহেলা করা হচ্ছে। অবৈধ গ্যাস সংযোগ চিহ্নিত করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া, আবাসিক ও শিল্পখাতে গ্যাসের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা এবং বিকল্প হিসেবে এলপিজির বাজার কঠোরভাবে মনিটরিং করা না হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে।’
বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের ব্রাহ্মণবাড়িয়ার উপমহাব্যবস্থাপক শফিকুল হক রূপালী বাংলাদেশকে জানান, শীতকালে পাইপলাইনে গ্যাসের চাপ কম থাকে। জেলায় ২২ হাজার বৈধ গ্যাস লাইনের চুলার বিপরীতে ৫২ হাজার চুলা রয়েছে। বিপুল সংখ্যক অবৈধ গ্যাস সংযোগ সাপ্তাহে ২-৩ দিন উচ্ছেদ অভিযান দিয়েও নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। পাইপলাইনে লিকেজ থাকায় গ্যাস বের হয়ে যাচ্ছে। শীত, পাইপলাইনে লিকেজ এবং অবৈধ সংযোগ মিলিতভাবে সংকটের মূল কারণ।
শিল্পখাতে অগ্রাধিকার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী নতুন গ্যাস সংযোগ শিল্পখাতেই দেওয়া যায়। অন্য খাতে সরকার নতুন সংযোগ দিচ্ছে না। তবে শীত মৌসুমে শিল্পখাতে গ্যাসের ব্যবহার কমে। ফার্টিলাইজারে কৃষি খাতে সারের উৎপাদনে গ্যাস ব্যবহার হচ্ছে। অবৈধ সংযোগের বিরুদ্ধে অভিযান ও লিকেজ শনাক্তে আমাদের টিম কাজ করছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে।’
-20260110190827.webp)


