ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার জিনদপুর ইউনিয়নের কড়ইবাড়ি গ্রাম। নবীনগর থেকে মুরাদনগরে যাওয়ার পথে মূল সড়কসংলগ্ন বিস্তীর্ণ তিন ফসলি জমিগুলো একসময় কেবল ধান উৎপাদনের জন্যই পরিচিত ছিল। সময়ের পরিবর্তন ও লাভজনক কৃষির সম্ভাবনায় এখন সেই জমিগুলো ধীরে ধীরে রূপ নিচ্ছে সবুজ সবজি খেতে। এই পরিবর্তনের অন্যতম পথিকৃৎ জিনদপুর ইউনিয়নের ২২ বছর বয়সি তরুণ কৃষক অনিকুর রহমান অনিক।
গত দুই বছর ধরে অনিকুর রহমান প্রচলিত ধান চাষের বাইরে গিয়ে বাণিজ্যিক ও উচ্চমূল্যের সবজি উৎপাদনের সিদ্ধান্ত নেন। কৃষি বিভাগের পরামর্শ, প্রশিক্ষণ এবং নিজের আগ্রহকে কাজে লাগিয়ে তিনি ধীরে ধীরে ধানের জমিগুলোকে সবজি চাষের উপযোগী করে তুলেছেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, প্রায় পাঁচ বিঘা জমিতে তিনি শসা, বেগুন, মরিচ ও টমেটোর আবাদ করেছেন। বর্তমানে টমেটো উত্তোলন চলছে। গত বছরের তুলনায় এ বছর টমেটোর দাম বেশ ভালো— জমি থেকেই কেজিপ্রতি ৬০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। শীতের প্রকোপ কম থাকায় রোগবালাইও তুলনামূলক কম। শিগগিরই মরিচ উত্তোলন শুরু হবে এবং বেগুনের জমিতে নিয়মিত পরিচর্যা চলছে।
এ ছাড়া রমজানকে সামনে রেখে পাশের জমিতে শসার আবাদ প্রস্তুত করা হচ্ছে। লাভজনক কৃষিতে জমি নির্বাচনের গুরুত্ব সম্পর্কে অনিকের অভিজ্ঞতা এখন অনেক কৃষকের জন্য দিকনির্দেশনা হয়ে উঠেছে। তুলনামূলক উঁচু জমি, পর্যাপ্ত সেচ সুবিধা ও ভালো পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার কারণে তার সবজি খেতে ফলন হচ্ছে আশানুরূপ। এসব সবজি চাষ করে তিনি বছরে গড়ে ২ থেকে ৩ লাখ টাকা আয় করছেন, যা তার পরিবারের আর্থিক স্বচ্ছলতা এনে দিয়েছে।
এ বিষয়ে তরুণ কৃষক অনিক বলেন, ‘আগে এখানে শুধু ধান চাষ হতো। খরচের তুলনায় লাভ খুব একটা থাকত না। কৃষি অফিসের পরামর্শ ও প্রশিক্ষণ পেয়ে ধীরে ধীরে সবজি চাষের দিকে আগ্রহী হই। শুরুতে কিছুটা ঝুঁকি ছিল, কিন্তু এখন বুঝতে পারছি—সঠিক জমি নির্বাচন, সময়মতো সেচ ও পরিচর্যা করলে সবজি চাষ অনেক বেশি লাভজনক। ধানের জমিতেই শসা, লাউ, বেগুন, মরিচ ও টমেটো চাষ করে ভালো আয় হচ্ছে। ভবিষ্যতে আবাদ আরও বাড়ানোর পাশাপাশি অন্য তরুণদের কৃষিতে আগ্রহী করে তুলতে চাই। ধীরে ধীরে আরও জমি লিজ নেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।’
জিনদপুর ইউনিয়নের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা নূরনবী জানান, তরুণদের বাণিজ্যিক কৃষিতে উৎসাহিত করতে নিয়মিত অনিকুর রহমানের উদাহরণ তুলে ধরা হয়। তার সাফল্য দেখে এলাকার অনেক কৃষক ধানের পাশাপাশি সবজি চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন। চলতি মৌসুমে ধানের আবাদি জমি ও পতিত জমিতে প্রায় ২৫ বিঘা জমিতে সবজি চাষ হচ্ছে।
নবীনগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. জাহাঙ্গীর আলম লিটন বলেন, জিনদপুর ইউনিয়নে তরুণ কৃষকদের আধুনিক ও লাভজনক কৃষিতে সম্পৃক্ত করতে নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং প্রদর্শনী কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের মাধ্যমে ফ্লাড রিকনস্ট্রাকশন ইমারজেন্সি অ্যাসিস্ট্যান্স প্রজেক্ট এবং কুমিল্লা অঞ্চলে টেকসই কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণ প্রকল্পের আওতায় কৃষক প্রশিক্ষণ, উঠান বৈঠক, মাঠ দিবস এবং প্রয়োজনীয় প্রদর্শনী উপকরণ নিয়মিত সরবরাহ করা হচ্ছে। আমাদের লক্ষ্য তারুণ্যনির্ভর টেকসই বাণিজ্যিক কৃষি।
তিনি আরও বলেন, এসব প্রকল্পের মাধ্যমে কৃষকদের জমি নির্বাচন, আধুনিক উৎপাদন প্রযুক্তি, উচ্চমূল্যের ফসল চাষ ও বাজারমুখী কৃষি ব্যবস্থাপনা বিষয়ে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এর ফলেই অনিকুর রহমানের মতো তরুণ কৃষকরা ধানের প্রচলিত চাষ থেকে বেরিয়ে এসে সবজি উৎপাদনে সফল হচ্ছেন, যা এলাকায় টেকসই কৃষি সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
যখন অনেক তরুণ জীবিকার সন্ধানে শহরমুখী, তখন অনিকুর রহমান প্রমাণ করে দেখাচ্ছেন—সঠিক পরিকল্পনা, পরিশ্রম এবং কৃষি বিভাগের সহযোগিতা থাকলে গ্রামেই গড়ে তোলা সম্ভব লাভজনক ও টেকসই কৃষি উদ্যোগ। নবীনগরের মাঠে ধানের জমি থেকে সবজির এই রূপান্তর এখন নতুন সম্ভাবনার গল্প হয়ে উঠেছে।



সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন