চাঁদপুরের হাইমচর উপজেলার আলগী দুর্গাপুর উত্তর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আতিকুর রহমান ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে আত্মগোপনে রয়েছেন। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় হামলার ঘটনায় তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে। এসব মামলায় তিনি ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি।
অভিযোগ রয়েছে, আত্মগোপনে থেকেও তিনি ইউনিয়ন পরিষদের দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনা করছেন এবং রাতে গোপনে পরিষদের বিভিন্ন কাগজপত্রে স্বাক্ষর দিচ্ছেন।
এ কাজে ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. আজহারুল ইসলামসহ একটি চক্র জড়িত রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি হওয়া সত্ত্বেও তাকে গ্রেপ্তার করতে গিয়ে পুলিশ বারবার ব্যর্থ হচ্ছে।
সরেজমিনে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আতিকুর রহমান হাইমচর উপজেলা যুবলীগের সাবেক সভাপতি এবং পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের অনুসারী। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ায় তার বিরুদ্ধে হাইমচর ও চাঁদপুরে একাধিক মামলা দায়ের হয়। এ কারণে স্থানীয়দের মধ্যে তার বিরুদ্ধে ক্ষোভ বিরাজ করছে।
সম্প্রতি ইউনিয়ন পরিষদে গিয়ে দেখা যায়, হিসাব সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর জন্মসনদসহ বিভিন্ন কাগজে প্রশাসনিক কর্মকর্তার স্বাক্ষর দিয়েছেন। প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. আজহারুল ইসলাম অসুস্থতার কথা বলে ছুটি না নিয়েই অফিসে অনুপস্থিত রয়েছেন।
অভিযোগ রয়েছে, চেয়ারম্যানের স্বাক্ষর রাতের আঁধারে গ্রাম পুলিশ সদস্যদের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয়। এভাবেই সেবা নিতে এসে ইউনিয়নের বাসিন্দারা নানা বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, আতিকুর রহমান স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে আত্মগোপনে থেকে পরিষদের অর্থ ভাগাভাগি করছেন। মামলার আসামি হয়েও অর্থের ভাগ দেওয়ার মাধ্যমে এলাকায় অবস্থান নিশ্চিত করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
ইউনিয়নের কমলাপুর গ্রামের বাসিন্দা জাহাঙ্গীর বলেন, আমি নিজে কয়েকবার পরিষদে এসেছি। চেয়ারম্যান আত্মগোপনে রয়েছেন, পুলিশ তাকে খুঁজছে। ৫ আগস্টের পর থেকে তিনি পরিষদে আসেন না।
সম্প্রতি ঢাকা থেকে জন্মসনদ অনলাইনে করার জন্য ইউনিয়নের বাসিন্দা কামরুন নাহার পরিষদে এসে চেয়ারম্যান ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে পাননি। একইভাবে বিউটি আক্তার নামের আরেক নারী তার শিশুর জন্মসনদ নিতে এসে বিড়ম্বনার শিকার হন।
এ বিষয়ে ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. আজহারুল ইসলামের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, চেয়ারম্যান মাঝে মাঝে অফিসে আসেন। তবে কখন বা সর্বশেষ কবে এসেছেন এমন প্রশ্নে তিনি অসংলগ্ন কথা বলেন।
তিনি ছুটি নিয়ে অফিসের বাইরে রয়েছেন বলে দাবি করলেও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জানান, আজহারুল ইসলাম কোনো ছুটি নেননি। এমনকি ইউএনও তাৎক্ষণিকভাবে ফোন করেও তাকে পাননি।
ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মো. আতিকুর রহমানের ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ না করায় তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
হাইমচর থানার ওসি নাজমুল হোসেন বলেন, আমি এক মাস আগে এই থানায় যোগদান করেছি। এ পর্যন্ত দুইবার তাকে গ্রেপ্তার করতে তার বাড়িতে গিয়েছি, কিন্তু তাকে পাইনি। তিনি বাড়িতে অবস্থান করেন না।
থানা পুলিশের সূত্র জানায়, আগের ওসিও একাধিকবার তাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা করেছেন। চেয়ারম্যান নিয়মিত পরিষদে আসেন এমন তথ্য সঠিক নয়। সিসিটিভি ক্যামেরা পরীক্ষা করলেই বিষয়টি স্পষ্ট হবে। তাকে গ্রেপ্তার করতে বিভিন্ন কৌশলে অভিযান চালানো হলেও একটি সংঘবদ্ধ চক্র পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে তাকে সরিয়ে নেয়।
চেয়ারম্যান আতিকুর রহমান পাটওয়ারী আত্মগোপনে থেকে কীভাবে দাপ্তরিক কাজ পরিচালনা করছেন এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অমিত রায়ের সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, আমি প্রায় ছয় মাস আগে এখানে যোগদান করেছি। চেয়ারম্যান আত্মগোপনে আছেন এ তথ্য আমার জানা ছিল না। এখন যেহেতু বিষয়টি জেনেছি, যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
উল্লেখ্য, গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে চেয়ারম্যানের আত্মগোপনের বিষয়টি ইউএনওকে জানানো হয়েছিল। তখন তিনি নতুন যোগদানের কথা বলে খোঁজখবর নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে চার মাস পার হলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন