একসময় চট্টগ্রাম নগরে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার প্রবেশ নিষিদ্ধ করার ঘোষণা দিয়েছিলেন তৎকালীন মেয়র ও আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতা এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী। তার মৃত্যুর পর সেই হুঙ্কার অব্যাহত রেখেছিলেন ছেলে, সাবেক মন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলও। পথসভা কিংবা জনসভা—যেখানেই বক্তৃতা দিতেন, বাবার সেই বক্তব্য স্মরণ করিয়ে দিতে ভুলতেন না তিনি।
যে নগরীতে খালেদা জিয়ার প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল, যে নগরীতে ঢুকলে ‘ছাল তুলে নেওয়ার’ স্লোগান উঠত। আজ সেই নগরীই অপেক্ষায় রয়েছে তার পুত্র তারেক রহমানকে বরণ করে নিতে। দুই দশক পর দলীয় রাজনৈতিক সফরে আজ রোববার (২৫ জানুয়ারি) সকালে চট্টগ্রাম আসছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
নগরজুড়ে সাঁটানো হয়েছে লাখো পোস্টার ও ব্যানার। পথে পথে নির্মাণ করা হয়েছে তোড়ন। তারেক রহমানের আগমন উপলক্ষে ঢাকঢোল সাজানো হয়েছে নানা রঙে। যে নগরীতে মহিউদ্দিন চৌধুরী ও নওফেল খালেদা জিয়ার প্রবেশে হুঙ্কার দিয়েছিলেন, আজ সেখানে নেই তাদের কেউই। মহিউদ্দিন চৌধুরী বহু বছর আগে মারা গেছেন, আর মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল ফ্যাসিবাদের তকমা মাথায় নিয়ে দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন।
তারেক রহমানের আগমন প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘যে নগরীতে খালেদা জিয়াকে ঢুকতে না দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন মহিউদ্দিন চৌধুরী, সেই নগরীতেই আজ তার পুত্র তারেক রহমান বীরের বেশে জনসভা করতে আসছেন। ম্যাডাম বেঁচে থাকলে হয়তো ম্যাডামই আসতেন।’
তারেক রহমানের আগমন ঘিরে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি)। সিএমপির একটি সূত্র জানায়, তারেক রহমানের সফর ও সমাবেশস্থলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দুই থেকে আড়াই হাজার পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হতে পারে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সিএমপি কমিশনার হাসিব আজিজ বলেন, তারেক রহমানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তিন স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। মাঠ পর্যায়ে সোয়াট সদস্যদের পাশাপাশি সাদা পোশাকে গোয়েন্দা পুলিশ দায়িত্ব পালন করবে।
এর আগে সমাবেশ উপলক্ষে গণবিজ্ঞপ্তি জারি করে সিএমপি। কমিশনার হাসিব আজিজ স্বাক্ষরিত ওই বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বিএনপির জনসমাবেশ উপলক্ষে মহানগর এলাকায় জনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা রক্ষায় অস্ত্রশস্ত্র, তলোয়ার, বর্শা, বন্দুক, ছোরা, লাঠি, বিস্ফোরক দ্রব্য, ইট-পাথর বহন ও ব্যবহার, রাষ্ট্রবিরোধী কোনো কিছু প্রদর্শন, প্ল্যাকার্ড বহন এবং অনুমোদন ছাড়া ড্রোন ওড়ানো নিষিদ্ধ থাকবে।
পুলিশের পাশাপাশি র্যাব ও সেনাবাহিনীও মাঠে থেকে নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ২০ বছর পর চট্টগ্রাম সফরে আসছেন তারেক রহমান। নগরীর পলোগ্রাউন্ড মাঠে আয়োজিত সমাবেশে তিনি প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেবেন। সমাবেশ ঘিরে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যে উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। সমাবেশ সফল করতে নগর ও জেলার বিভিন্ন উপজেলায় একাধিক প্রস্তুতি সভা করেছে দলটি।
বিএনপি চট্টগ্রাম মহানগরের নেতাদের দাবি, রোববার পলোগ্রাউন্ড মাঠে সাধারণ মানুষসহ ১০ থেকে ১৫ লাখ নেতাকর্মীর সমাগম হতে পারে।
সমাবেশ উপলক্ষে পলোগ্রাউন্ডে ১০০ ফুট দীর্ঘ ও ৬০ ফুট প্রশস্ত একটি মঞ্চ নির্মাণ করা হয়েছে। শনিবার রাতে চট্টগ্রামে পৌঁছানোর কথা রয়েছে তারেক রহমানের। তিনি চট্টগ্রামে এসে পুরাতন সার্কিট হাউজে অবস্থিত জিয়া স্মৃতি জাদুঘর পরিদর্শন করবেন। রোববার সকালে সমাবেশে যোগ দেওয়ার আগে র্যাডিসন ব্লু হোটেলে একটি অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে তাঁর।
বিএনপি নেতা আবু সুফিয়ান বলেন, ‘আজ সকাল ১১টার দিকে পলোগ্রাউন্ডের জনসভায় তারেক রহমান যোগ দেবেন। তার আগমন সফল করতে আমাদের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এ সফর শুধু রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়, এটি চট্টগ্রামের মানুষের সঙ্গে বিএনপির রাজনীতির একটি সেতুবন্ধন তৈরি করবে।’
দলীয় তথ্য অনুযায়ী, তারেক রহমান সর্বশেষ চট্টগ্রাম সফরে এসেছিলেন ৬ মে ২০০৫ সালে, বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময়। আর ২০১২ সালের ৯ জানুয়ারি পলোগ্রাউন্ড মাঠে সর্বশেষ জনসভায় বক্তব্য দিয়েছিলেন বিএনপির প্রয়াত চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া।
সমাবেশ শেষে তারেক রহমান সড়কপথে ফেনী ও কুমিল্লা হয়ে নারায়ণগঞ্জ যাবেন। বিকেল ৪টায় ফেনী পাইলট স্কুল মাঠে, সাড়ে ৫টায় কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম হাইস্কুল মাঠে, সন্ধ্যা ৭টায় কুমিল্লা সায়াগাজী হাইস্কুল মাঠে, সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় দাউদকান্দি কেন্দ্রীয় ঈদগাহ মাঠে এবং রাত সাড়ে ১১টায় নারায়ণগঞ্জের কাঁচপুর বালুর মাঠে নির্বাচনী সমাবেশে যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে।

